somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: কুরবানি

১৫ ই জুলাই, ২০১৪ দুপুর ১:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঈদের দিনটা যেন কেমন কাটল রিদনের। কোন কিছুই ঈদের মত করে হল না এবার। এমনকি ঈদের নামাজটাও তাড়াহুড়ো করে হল। এটা নাই, ওটা নাই, এটা আন, ওটা আন এসব নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়েছে ওকে। ঈদের দিনে কেউ বিয়ে করে? ওর আব্বুটা আসলে একটা পাগল!

না না, বিয়েটা রিদনের আব্বুর না, রিপার। রিপা রিদনের বড় বোন। গতবছর এসএসসি পাশ করেছে। মনে প্রবল ইচ্ছে থাকলেও আর কলেজে ভর্তি হওয়া হয়নি রিপার। কান্নাকাটি, অনশন কিছুতেই কিছু হয়নি। মেয়ে মানুষ মেট্রিক পাশ করেছে এটাই অনেক। এত পড়ে হবেটা কি? এবার বিয়ে শাদি করে সংসার করুক। ছেলে পুলে মানুষ করতে হবে না? মেয়েকে মোতাহার মিয়া এভাবেই শাসায়। মেয়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদে, মোতাহার মিয়া ভাঙা বাইসাইকেলটা নিয়ে রাগে গড়গড় করতে করতে দোকানে চলে যায়। বাজারে একটা থান কাপড়ের দোকান আছে তার।

সেই গত বছর থেকে মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন মোতাহার মিয়া। মোতাহার মিয়ার পছন্দ করা পাত্র পছন্দ হয়না রিদনের মার। কোথাও না কোথাও ঘাটতি থেকেই যায়। ছেলের মা আছে তো বাবা নেই, বাড়ি ঘরের অবস্থা ভালো না, পরিবেশ খারাপ, বড় সংসার, ছেলে বয়স বেশী ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই এবার জেরিনা বেগমের ভেজালে না গিয়ে একাএকা বিয়ে ঠিক করে এসেছেন মোতাহার মিয়া। ছেলে গার্মেন্টসের বড় অফিসার। ঢাকায় থাকে। অনেক দিল দরিয়া ছেলে। মেয়েকে না দেখেই বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। এমন ছেলে লাখে একটাও পাওয়া যায় না। তিনদিনের ছুটিতে বাড়ি এসেছে। হাতে সময় নেই, তাই ঈদের দিন বিকেলেই বিয়ে! ছেলের কোয়ালিফিকেশন এভাবেই সবাইকে বলেন মোতাহার মিয়া। কথাগুলো কেন যেন বিশ্বাস হয়না জেরিনা বেগমের।

বরযাত্রী এল টেম্পুতে করে। আত্নীয় স্বজনরা সবাই হায় হায় করে উঠল। এসব কি? মান সম্মান বুঝি আর থাকে না! নাক ছিটকানোর শব্দে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল! বিষয়টাকে সূক্ষ্ম মাথায় সামলে নিলেন মোতাহার মিয়া। টেম্পু গুলো দ্রুত বিদায় করে তিনটা মাইক্রোবাস এনে দাড় করে রাখলেন বাড়ির সামনে। বিষয়টা পছন্দ হলনা বরের চাচার। এত বড় অপমান কেন করবেন মোতাহার মিয়া? তারা টেম্পু নিয়ে আসুক আর উড়োজাহাজ নিয়ে আসুক সেটা তাদের ব্যাপার। টাকার গরম দেখায় ইলিয়াস আলীকে? মোতাহার মিয়ার দৌড় জানা আছে ইলিয়াস আলীর। এদিকে টেম্পু থেকে কালো ভুঁড়িওয়ালা বরকে নামতে দেখে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন রিদনের ফুফু। পরীর মত একটা মেয়েকে কোথায় ভাসিয়ে দিল মোতাহার? মেয়ে কি বানের জলে ভেসে এসেছে নাকি? জেরিনা বেগম চুপচাপ। গতরাত থেকে পণ করে রেখেছেন জামাইকে বরণ করতে যাবেন না তিনি। মোতাহার মিয়া একাই নাচুক তার জামাইকে নিয়ে! আর রিপা? সে তো বউ সেজে জড় পুতলের মত বসে আছে। ভীতরে বাইরে কি ঘটছে কোন দিকেই যেন ভ্রুক্ষেপ নেই তার।

বরকে রিদনেরও পছন্দ হয়নি। দজ্জালের মত একটা লোক ওর দুলাভাই হয় কি করে? এর চেয়ে তারেক ভাই লাখো গুণে ভালো ছিল। লম্বা, ফর্সা আর কি স্মার্ট তারেক ভাই! হরহর করে ইংরেজি বলতে পারে। চাকরি ছিল না তাতে কি? চাকরি তো পেতই একদিন। আব্বুটা কিছুতেই বুঝল না। একে তো বেকার ছেলে তার উপর আত্নীয়! আত্নীয়ের সাথে কিছুতেই আত্নীয়তা করবেন না। এখন এই ভুঁড়িওয়ালা অনাত্নীয়কে নিয়েই তুষ্ঠ থাকুক আব্বু!

বাদ আসর বিয়ে হয়ে গেল। তবে সুষ্ঠুভাবে না। কবুল বলার আগ মুহুর্তে বরকে থামিয়ে দিলেন বরের মামা। মোটর সাইকেলটা কবে দেয়া হবে সেটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ভাগ্নেকে কবুল বলতে দিবেন না তিনি। মোতাহার মিয়া রেগে গেলেন। এটা কোন ধরনের ছোটলোকি? সামান্য একটা মোটর সাইকেলের জন্য বিয়ে থেমে থাকবে নাকি? আজকেই টাকা দিয়ে দিবেন তিনি। বউ বিদায়ের আগে তার থেকে যেন নিজ হাতে টাকা গুণে নিয়ে যায় বরের মামা। শ্বশুরের প্রতিশ্রুতি শুনে একটা মুচকি হাসি দিয়ে কবুল বলল বর। বরপক্ষ বিয়ের তবারক এনেছিল গুড়ের মুঠো! গুড়োর মুঠো দেখে রিদনের চাচা তো মহাগরম। জাত ছোটলোক! শালাদের আজ শুধু গুড়ের ডাল খাইয়েই বিদায় করবেন তিনি।

সব মিটে যেতে রাত বারোটা বেজে গেল। এবার বিদায়ের পালা। আসবেন না আসবেন না করেও মেয়েকে বিদায় দিতে এলেন রিদনের মা। এসেই মেয়ের গলা জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। সাথে যোগ দিলেন রিদনের চাচি-ফুফুরাও। মরার বাড়ির মত ননস্টপ কান্নাকাটি চলল কিছুক্ষণ। মোতাহার মিয়া চোখ মুছলেন। রিদনের চোখও ঝাপসা হয়ে এসেছিল। ঝাপসা চোখেই বোনের দিকে তাকাল রিদন। একি! রিপা মানুষ না অজগর? চোখে তো পানির ‘প’ ও নাই রিপার!

বাড়ি ভর্তি মানুষ, তবুও বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে রিদনের। আপুটাকে ধরে বেঁধে কুরবানির গরুর মত কুরবানি করে দিল আব্বু! আব্বুটা আসলেই একটা পাগল! রাত অনেক হয়েছে। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে রিদন। ঘুম আসছে না। সারাদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বারবার চোখের সামনে বিক্ষিপ্তভাবে ভেসে আসছে ওর। আচ্ছা তারেক ভাই বিয়েতে এলো না কেন? তারেক ভাই! তারেক ভাইয়ের কথা মনে হতেই চিঠিটার কথা মনে পড়ে গেল রিদনের। গতরাতে তারেক ভাইয়ের কাছে চিঠিটা পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল ওর। বিয়ের আনন্দে ভুলে গেছে রিদন। ধুর! এটা কিছু হল? এজন্যই বোধহয় তারেক ভাই আসেননি। দাওয়াত ছাড়া এমনি এমনি কি কেউ বিয়েতে আসে? চিঠিটা তো রিদনের পকেটেই ছিল। পকেট থেকে চিঠিটা বের মোবাইলের মৃদু আলোতে পড়তে থাকে রিদন-

‘তারেক,
নির্লজ্জ্বের মত তোমাকে চিঠি লিখছি। সব জেনে শুনেও স্বার্থপরের মত ফোনটা অফ করে রেখেছো কেন? একটুকুও অবাক হইনি। কিয়ামতের দিন মানুষ কেন ইয়া নফসি ইয়া নফসি করবে সেটা বুঝতে আর আমার বাকী নেই। বাবার সামনে না বলার মত সাহস আমার নেই। শুধু আমার কেন আমার পরিবারের কারুরই নেই। জীবনের চৌমাথায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার সামনে তিনটি রাস্তা। প্রথম রাস্তাটা খুব সরল। এ রাস্তায় চলতে কোন বাহন লাগেনা, কোন খরচও লাগে না। একটা ওড়না, সিলিং ফ্যান আর সময়মত সুযোগ পেলেই মই বেয়ে তরতর করে স্বর্গে চলে যাওয়া যায়। স্বর্গে কে না যেতে চায় বলো? ‘মায়া’ নামক দু’অক্ষরের শব্দটাই আমার সাথে শত্রুতা শুরু করে দিয়েছে, পথ আগলে ধরছে বারবার। সে কিছুতেই আমাকে এ নরক ছেড়ে স্বর্গে যেতে দেবে না। দ্বিতীয় রাস্তাটাও নির্ভেজাল। এ রাস্তার পথিককে কিছুই করতে হয় না। শুধু কুরবানির পশুর মত ধারালো ছুরির নিচে নিজেকে সঁপে দিতে হয়। কুরবানির গরুর কোন চাওয়া পাওয়া থাকতে নেই। মালিকের হাসিমুখ মানে তারই হাসিমুখ। বাকী থাকল তিন নাম্বার রাস্তা। এ রাস্তাটা অনেকটা দুর্গম, হিংস্র জন্তু জানোয়ারে গিজগিজ করছে। রাস্তাটা তোমার দিকে বাঁক নিয়েছে। এ রাস্তায় যেতে হলে আমাকে স্বয়ংবরা সাজতে হবে তারেক। তোমার হাত ধরে নির্লজ্জ্বের মত পালিয়ে যেতে হবে আমাকে। জানি একটা বেকার ছেলের জন্য এ পথ কতটা বন্ধুর! কিন্তু আমি যে নিরুপায় তারেক। বাবা বিয়েতে রাজি হলনা বলে তুমি আমাকে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে চেয়েছিলে। আমি রাজি হইনি। তোমার কি সে কথা মনে আছে? যদি মনে থাকে তবে আমি ভোর পর্যন্ত তোমার অপেক্ষায় থাকব। তুমি হাত বাড়ালে তোমার হাতটা শক্ত করে ধরে বেড়িয়ে পরব। আর যদি তোমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সকালের আলো ফুটে যায়, তাহলে হয় প্রথম রাস্তার পথিক হব অথবা স্বেচ্ছায় কুরবানি হয়ে যাব। তোমার রিপা কুরবানি হয়ে যাবে তারেক...’



সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০১৪ বিকাল ৩:০৯
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×