somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাজার জোনাকীর তারা

০৭ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৪:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নতুন জায়গায় আছি এক বছর। নতুন যেকোন জায়গার সাথে আমার মানিয়ে নেয়ার অভ্যাস আছে। কিন্তু এই জায়গার সাথে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিনা। কামরাটা ছোট। কোনমতে আমি থাকার মতই ছোট। তারচেয়ে বড় কথা, কামরাটা বেশ অন্ধকারও।.


এই জায়গায় থাকার আজকে এক বছর পূর্ণ হবে। সায়েম আর অনন্যাও আজকে এখানে এসেছিল বেড়াতে। আজ ওদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। আমি যেদিন এখনে এসেছিলাম, সেদিনই ওদের বিয়ে হয়েছিল। এই এক বছরে ওদের সাথে আর দেখা হয়নি। আজ ওদের দেখে বেশ ভাল লাগছে। অনন্যার পরনে ছিল নীল রঙের শাড়ী, হাতে ছিল কাঁচের চুড়ি। বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিল। কিন্তু আমার সামনে যতক্ষণ ছিল ততক্ষণই মুখ গোমড়া করে ছিল। সায়েমেরও একই অবস্থা। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ওরা এখনই কান্না করে ফেলবে। ওরা মিনিট বিশেক ছিল। সেই কাঁদোকাঁদো গোমড়া মুখেই পুরো সময় দাঁড়িয়ে ছিল। একটাও কথা বলেনি। কিন্তু আমার ওদের সাথে কথা বলতে অনেক ইচ্ছা করছিল, বলা হয়ে ওঠেনি। কথা বলতে পারছিলামনা আমি।


ওরা যাওয়ার পর রাত্রের দিকে বাইরে বের হয়ে আসি। রাত্রের সোডিয়াম ল্যাম্পের নীচে শহরের খালি রাস্তা অনেক ভাল লাগে। সেই খালি রাস্তায় হাটতে বের হয়েছি। ফুরফুরে বাতাস, নিজের শরীরের ওজনও গত এক বছর ধরে অনুভব করছিনা। সব মিলিয়ে এক অস্থির মাদকতা। এই শহরে অনেক জোনাকী। রাস্তার দু ধারে ইট পাথরের বাড়ীর চেয়ে গাছগাছালি বেশী, তাই হয়তো এত জোনাকী। জোনাকী দেখলে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। ছোটবেলায় একসাথে অনেক জোনাকী ধরে বোতলে ভরে রাখতাম। পরে বোতলটা রুমের সিলিঙয়ে ঝুলিয়ে রুমের লাইট বন্ধ করে দেখতাম। এই আলোটা পৃথিবীর যেকোন আলোর চেয়ে সুন্দর মনে হতো। আজও জোনাকী দেখে ছোটবেলার কথা ভীষণ মনে পড়ছে। মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছা করছে খুব। গত এক বছর ধরে মায়ের সাথেও দেখা হয়নি।


সবচেয়ে বেশী যার কথা মনে পড়ছে সে হচ্ছে অনন্যা। আমাকে খুব ভালবাসতো। প্রায় পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিল আমাদের। আমাদের মেয়ে হলে আমরা ঠিক করেছিলাম তার নাম দেব জোনাকী। আমার ফ্যামিলি আমার আর অনন্যার সম্পর্ক সহজেই মেনে নিলেও অনন্যার বাবা এই সম্পর্ক কোনমতেই মেনে নিতে চায়নি। কারণ একটাই, আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে তিনি তাঁর মেয়ের বিয়ে দেবেননা। আমেরিকা প্রবাসী ছেলেদের নাকি বিয়ে করে বউকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার বাতিক থাকে। তিনি তাঁর মেয়েকে এতদূর যেতে দিতে চাননা একমাত্র মেয়ে বলে। এই অজুহাত আমার ভাল লাগলোনা। আজব তো!!! আমেরিকা এসেছি পড়ালেখা করতে। পড়ালেখা শেষ করেই দেশে স্যাটেল হবো। বড়জোর আর একটা বছর, এরপরেই তো দেশে ফিরে আসছি।


যাই হোক, দেশে ফিরে আসার কথা শুনে শ্বশুর মশাইয়ের মন বোধহয় একটু গললো। আমার বাবা মা কে পাঠাতে বললেন। বাবা মা তাঁর সাথে কথা বলে আসলেন, অনেক চড়াই উতরাই পার হওয়ার পর বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হল। আমি যেদিন দেশে আসব তার পরেরদিনই বিয়ে। এত তাড়াহুড়া করে দেশে আসার পরের দিনই বিয়ে হয়ে যাওয়াটা যদিও আমার পছন্দ হলনা, তারপরেও অন্ততঃ বিয়ে তো পছন্দের মেয়ের সাথেই হচ্ছে, এটা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।


বাসায় সবাই বিয়ের কাজে ব্যাস্ত। তাই এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে আসে আমার বন্ধুরা। বন্ধুরা বলতে সায়েম, অনিক আর তানিম। প্রায় চার বছর পর বন্ধুদের সাথে দেখা। তাই বেশ ভালই লাগছিল। অনিক ড্রাইভিং করছিল। ঢাকা চট্রগ্রাম হাইওয়ে রোড। অনেকদিন পর সবাই একত্র হয়েছি। সবাই ব্যাপক আনন্দ ফূর্তিতে ছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ প্রচন্ড শব্দ। পেছন থেকে ট্রাকের প্রচন্ড ধাক্কায় আমাদের গাড়ী রাস্তার পাশে ছিটকে পড়েছে। এরপর শুনতে পাই আশেপাশের লোকজন ছুটে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ আর এম্বুলেন্সও এসে হাজির। এক্সিডেন্টে অনিক স্পটডেড। আর দুইজন মারাত্নকভাবে আহত। ব্যাপক রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আহত দুইজনের একজন আমি, অন্যজন তানিম। একমাত্র সায়েমই মোটামোটি যখম ছাড়া আছে। আমাদের দুইজনকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পরে শুনলাম হসপিটালে নেওয়ার পথে তানিমও মারা গিয়েছে। আমাকে আইসিইউ তে ভর্তি করানো হল। আমার তখনও জ্ঞান ছিল। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম খুব তাড়াতাড়িই জ্ঞান হারাবো। জ্ঞান হারানোর আগেই সবার সাথে কথা বলা দরকার। আমি ডাক্তারকে বলে সায়েম, অনন্যা, আমার মা বাবা, আর অনন্যার বাবাকে ডেকে পাঠালাম। আর জ্ঞান হারানোর আগে শুধু এটাই বলতে পারলাম যে, আমি এই বিয়ে করতে পারবোনা। অনন্যার বিয়ে যাতে সায়েমের সাথে হয়। এরপর আর কিছু বলতে পারিনি। মুখ নাড়ছিলাম, কিন্তু কথা বেরোচ্ছিলনা।


আমার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে আমার বাবা মা আর অনন্যার বাবা অনিচ্ছা সত্বেও আমার কথায় রাজী হল। সায়েম আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমার এই অবস্থা দেখে সেও আমার কথায় রাজী না হয়ে উপায় নেই। রাজী ছিলনা শুধু অনন্যা। পরে আমার শেষ ইচ্ছার কথা ভেবে, আর আমার বাবা মা বুঝানোতে সেও রাজী হল। পরদিন দুপুরেই অনন্যা আর সায়েমের বিয়ে হয়ে যায়। সাধারণ বিয়ের অনুষ্ঠানে সবাই হাসি খুশিতে মেতে থাকে। আর এই বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল একেবারেই নিরামিষ। কারো মুখে হাসি নেই। বরং সবাই কান্না করেছে। বাবা, মা, অনন্যা, সায়েম, সবাই।


সেদিন বিকালে আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। ডাক্তার অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাঁচাতে পারেনি। সন্ধ্যা সাতটা দশ মিনিটে আমাকে মৃত ঘোষণা করেন। আমার মৃত্যুর খবর শুনে মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অনন্যা হাঁউমাউ করে পাগলের মত কান্না শুরু করেছে। সায়েম পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। আর বাবা একেবারে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


পরদিন আমাকে দাফন করা হয়। গত এক বছর ধরে আমি এই কবরেই আছি। শুধু শরীরটা মাটির নীচে পড়ে আছে। কিন্তু আমি আছি। আমার অস্তিত্ব আছে। আমি সবাইকে দেখতে পাই। বিধাতার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে মাঝে মাঝে বের হই রাতের শহর দেখতে। আজকেও বের হয়েছি। রাতের শহর দেখতে ভাল লাগে। আর ভাল লাগে জোনাকী দেখতে। সাথে শরীর নেই, তাই শরীরের ওজন অনুভূত হয়না। বেশ ফুরফুরে লাগে।


আজ আমার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। আজ অনন্যা আর সায়েমের প্রথম বিবাহবার্ষিকীও। নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে। আমার কারণেই ওদের বিবাহবার্ষিকীটা সাদামাটা হয়ে গেল। কেক কাটার বদলে ওরা আসল গোরস্থানে আমার কবর দেখতে। যদিও ওদের দেখে অনেক ভাল লেগেছে আমার।


মধ্যরাত গড়িয়ে পড়েছে। গোরস্থানে এতক্ষণে হয়তো হাজারো জোনাকীর মেলা বসে গিয়েছে। ফিরে যাওয়া দরকার। আমার জোনাকী দেখতে খুব ভাল লাগে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৪:১৪
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ সরকারের কাছে সোলার এনার্জি বিক্রি করা কতটা লাভজনক?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৭



যারা আগামী ৬ মাসের মধ্যে বাড়ির ছাদে সোলার সিস্টেম ইন্সটল করবেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক ইউনিট ইলেক্ট্রিসিটির জন্যে ১০.৫০ টাকা করে দিবে। রুফটপে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট বসিয়ে লাভ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সম্পর্ক ও আত্মহত্যা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭



কাউকে আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে বিয়ে করা অথবা আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে অথবা ব্ল্যাকমেইল করে গুরুতর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের মাধ্যমে কাউকে বিয়েতে বাধ্য করা। - বিশ্বের যে কোনো দেশের আইনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২ লাখ কর্মীর খবর ভুয়া - তবে ২৫ টা সাদা হাতি আসছে!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০২



স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া সেপ্টেম্বর মাস থেকে ধাপে ধাপে ২ লাখ কর্মী নেবে ।

আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ কর্মী নেবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×