কি পাইসো তুমি? আমার সাথে মিথ্যে কথা! আগে বাসায় আসো। তারপর মজা বুঝাবো।
অফিসে পৌছা মাত্রই সদ্য বিয়ে করা বউয়ের এমন থ্রেট খেয়ে আমি কেন স্বয়ং WWE চ্যাম্পিয়ন জন সিনারও বুকে কাঁপুনি ধরে যেত। বাসা থেকে অফিস পৌছাতে ৩০ মিনিট সময় লাগে। এই অল্প সময়েই কি এমন ঘটল যে বউ আমার বিরূদ্ধে মিথ্যে বলার অভিযোগ আনল বুঝতে পারলাম না। কখন মিথ্যে বললাম আর কিইবা মিথ্যে বললাম? চিন্তায় পড়ে গেলাম। ও! হ্যা, মনে পড়েছে, মনে পড়েছে। গত কাল অফিস থেকে ফিরেই তার দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে বলেছিলাম তাকে ভীষন সুন্দর লাগছে। আসলে আমার কাছে তখন তাকে সুন্দর বা বান্দর কিছুই লাগছিল না, অথবা সুন্দর লাগছিল কি না সেটা ততোটা খেয়াল করিনি। তবু কথাটা বলার উদ্দেশ্য ছিল টিভিতে রাত ১০ টা থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের খেলাটা দেখতে পারা। ওই সময় স্টার প্লাসে তার প্রিয় ‘ইয়ে রিশতা কা কেহলাতা হে’ না কি জানি একটা সিরিয়্যাল দেখায়। ওটা না দেখলে তার আবার রাতে না কি ঘুম আসে না। কতো করে বুঝাই এর একটা পর্ব না দেখলে কিছুই হয় না। একটা পর্ব কেন এক সাথে অনেকগুলো পর্ব মিস দিলেও সিরিয়্যালের কিছুই আসবে যাবে না। সিরিয়্যাল তার নিজস্ব উদ্ভট গতিতে চলতে থাকবে। আমার কোন কথাতেই কোন কাজ যখন হচ্ছিল না তখন তার রূপ সংক্রান্ত বিষয়ক প্রশংসাটা করেছিলাম। প্রশংসাতেই কাজ হল। বউ আমার খুশিতে চৌদ্দখানা হয়ে আমার সাথে বসে আর্জেন্টিনা আর নাইজেরিয়ার খেলাটা দেখেছিল। কিন্তু এতক্ষন পর আমার সেই নির্দোষ মিথ্যেটা কি করে ধরে ফেলল সে -সেটাই ভাববার বিষয়।
সারাদিন টেনশনের ভেতর দিয়ে অফিস করে বিকেল বেলা বাসায় খুব ভয়ে ভয়ে ফিরলাম। নতুন বউয়ের ঝগড়া-ঝাটি করার স্টাইল সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ওয়াকিবহাল না থাকায় আগে ভাগে আত্মরক্ষার কোন প্রিপারেশন ছাড়াই ঘরে প্রবেশ করতে হল।
পিন পতন নিরব ঘরে গোসল সেরে ফ্রেশ হবার পরেই কাঙ্খিত মিসাইল বর্ষন শুরু হল।
তোমার জন্ম তারিখ কবে?
সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের অ্যাটাকে বাকরুদ্ধ হতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলাম।
কেন? সেদিন না বললাম! ৫ আগস্ট! জন্ম তারিখ নিয়ে আবার কী হল?
তবে আসো। আমার সাথে আসো। বউয়ের পিছন পিছন পরবর্তী আঘাতের আশঙ্কায় আতংকিত আমি বেড রুমে প্রবেশ করলাম।
ওটা অন কর।
বিছানায় রাখা ল্যাপটাপটা অন করলাম কাঁপা কাঁপা হাতে। ব্যাপার কি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
তোমার ফেসবুক আইডিটা ওপেন করো।
করলাম। ফেসবুক আইডি ওপেন করলাম।
তোমার টাইম লাইনে যাও।
গেলাম।
ও মা! এগুলা কী রে বাবা! টাইমলাইন ভর্তি কেবল শুভেচ্ছা আর শুভেচ্ছা। জন্মদিনের শুভেচ্ছা! তা ও আবার শুভেচ্ছা বাণীগুলো আমার উদ্দেশ্যেই লেখা! আমি কি ঠিক দেখছি? আজ তো ১লা জুলাই। আমার জন্মদিন ৫ আগস্ট! ব্যাপারটা বুঝে উঠতে কিছুটা সময় লাগল। গত বছর ফেসবুক আইডিটা খুলিয়েছিলাম বন্ধু হাসানকে দিয়ে। আমার জন্মদিনটা তার জানা না থাকার কারনে এমনিতেই একটা তারিখ ব্যবহার করেছিল সে। ফেসবুক আইডিতে উল্লেখ করা জন্ম তারিখ এতোটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা আমার জানা ছিল না। বউকে পুরো ঘটনা বলতে যাবার আগেই পকেটে রাখা মোবাইলের মেসেজ টোন বেজে উঠল।
আগে মেসেজটা দেখে নাও। বউয়ের শীতল কন্ঠের নিদের্শে মোবাইল ইনবক্স খুলে দেখি অফিসের কলিগ রুপার মেসেজ। হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ, স্যার!
দেখো দেখো। গোটা পৃথিবীর সব মানুষ জানে আজ তোমার জন্ম দিন। অথচ আমাকে বলেছো ৫ আগস্ট। কী দরকার ছিল মিথ্যেটা বলার? বিয়ের পরে বরের প্রথম জন্মদিনে সবার আগে কিভাবে উইশ করে সারপ্রাইজ দিব তাকে সে নিয়ে কত সুন্দর একটা প্লান করে রেখেছিলাম সেই ছেলেবেলা থেকেই। তুমি মিথ্যে বলে সেটার বারোটা বাজিয়ে দিলে। তোমার অফিসের রুপা নামের কে না কে, সেও আমার আগেই তোমাকে উইশ করে ফেলল!
বউয়ের কান্না মেশানো কন্ঠে আপ্লুত হয়ে তাকে বুঝানো শুরু করলাম। দেখো পারুল, রুপা তো ফেসবুকের জন্মদিন দেখে মেসেজ দিয়েছে। ওটা তো সত্যিকারের জন্মদিন না। বিশ্বাস কর আমার জন্মদিন তুমি যেটা জানো সেটাই। ৫ আগস্ট।
তারপর হাসানের ফেসবুক আইডি খুলে দেয়ার পুরো কাহিনী বর্ণনা করলাম।
হু! বানিয়ে বানিয়ে কাহিনী বলতে হবে না আমাকে। এই যে দেখো এই যে দেখো , এইটা কে? পারুল মাউস স্ক্রল করে টাইম লাইনে একটা নাম দেখালো। রাবেয়া মালিক। আমার পপি আপা! পারুল কে জানালাম উনি আমার কাজিন। ইউকে থাকেন।
তোমার কাজিন ও কি তোমার জন্মদিন জানেন না? উনি কেন তোমাকে আজকেই উইশ করবেন?
তাইতো! তাইতো! উনার তো আমার জন্মদিন জানার কথা। যতোদূর মনে পড়ে উনি দেশে থাকতে আমাকে তো আমার সত্যিকারের জন্মদিন ৫ আগস্টেই উইশ করতেন প্রতি বছর। দীর্ঘদিন বিদেশ থাকায় এবং যোগাযোগ না থাকায় মনে হয় ভুলে গেছেন। কিন্তু পারুলকে তো সে কথা বলা যাবে না। বললাম, না, জানেন না মনে হয়।
আর এইটা কে? এই যে এই যে হ্যাপি বার্থডে টু ই্উ, বেস্ট অব লাক লিখেছেন। এই যে জাহিদ হোসেন নোমেন। এইটা সেই ফুপুতো ভাই না? যাকে তুমি আপন বড় ভাইয়ের মতো দেখো?
হ্যা। এইটা তো নোমেন ভাই। ঠিকই তো চিনসো!
তবে উনি কেন তোমাকে আজ উইশ করল? বলো, বলো, উনিও তোমার জন্মদিন জানেন না।
হায় হায় নোমেন ভাই, এটা তুমি কি করলে। তোমার কি মনে নাই নোমেন ভাই তোমার প্রিয় নায়িকা কাজলের জন্মদিন আর আমার জন্মদিন এক বলে তোমার সে কী আফসোস ছিল? এতো সহজে ভুলে গেলে তুমি। নাকি ফ্রান্সে গিয়ে ফ্রান্সের কোন সুন্দরী নায়িকার প্রেমে পড়ে গেলে!
অগত্যা পারুল কে বললাম, আরে এ বয়েসে জন্মদিন কি কেউ মনে রাখে বলো?
ওকে ওকে। তাইলে এইটা কার আইডি? এইটা কার আইডি বলো? কি ব্যাপার চোখ বড় বড় হয়ে গেল কেন? কোনটা মিথ্যে বল? ৫ অগাস্ট নাকি ১ জুলাই?
আমার চোখ সত্যি বোধহয় বড় হয়ে গিয়েছিল। কারন ওটা ছিল আমার বাবার আইডি। কিছুদিন আগে দেশের বাড়ি গিয়ে বাবাকে আইডিটা আমিই খুলে দিয়েছিলাম। কারন আমার কাছে মনে হয়েছিল অবসরে সময় কাটানোর ভাল একটা মাধ্যম হল ফেসবুক। কিন্তু...কিন্তু তাই বলে উনিও আমার ফেসবুক জন্মদিনে আমায় শুভেচ্ছা জানাবেন, লিখবেন, মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অব দ্যা ডে- এ আমার মোটেও বিশ্বাস হচ্ছিল না!
পারুল কে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবার ইচ্ছাটা তাই মরে গেল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





