somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেজদার হাফ সেঞ্চুরী!!!!

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ রাত ১২:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাধারন মধ্যবিত্তের সংসারে আমার বাবা মায়ের সন্তান সন্ততির সংখ্যা ছিল চারজন। তিন ছেলে ও এক মেয়ে। চারজনের মধ্যে আমার অবস্থান তিন নাম্বারে। আমার বাবা মা দুজনেই ছিলেন চাকুরীজীবি। বাবা চাকুরী করতেন অফিসে, মা ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা। শৈশবে আমাদের দেখভাল করতেন আমাদের ঠাকুরমা (বাবার মা)।দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত আমাদের ঠাকুমা আমাদের সাথে ছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ভারত থেকে আমার বাবা মা যখন দেশে ফিরে আসেন আমাদেরকে নিয়ে, আমার ঠাকুরমা আমাদের সাথে আর আসেননি, ওখানেই থেকে গেছিলেন আমার কাকাদের কাছে। এই হচ্ছে আমাদের সংসারের একটি ্মোটামুটি চিত্র।

আমার তিন ভাইয়ের মাঝে আমার বড় ভাই বরাবরই একটু সমীহ পেত ছোট বড় সকলের কাছ থেকে। পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবেতো বটেই, অত্যন্ত সুবোধ ও মেধাবী ছেলে হিসেবে পরিবারের গন্ডী ছাড়িয়ে পাড়া মহল্লাতেও তার আলাদা একটি অবস্থান ছিল। আমি বরাবরই একটু ‘অহংকারী’ ছিলাম একটি মাত্র মেয়ে বলে। অহংকারী হওয়ার প্রশ্রয় পেতাম বাবার কাছ থেকে। আমার অসম্ভব রাগী বাবার আমার প্রতি দূর্বলতা ছিল সকল তর্ক বিতর্কের ঊর্ধ্বে। আমার ছোটভাই খুব বেশী সুন্দর ছিল দেখতে, বরাবর শান্ত স্বভাবের ভাইটিকে সকলেই আদর করতো। বাকী থাকলো আমার মেজভাই, আমার ‘মেজদা’।

জন্মের পরে শিশুর নামকরন করার সময় বেশীর ভাগ মানুষ শিশুটির উপর নামের প্রভাবের কথা বিবেচনায় রাখেনা, ইচ্ছেমত একটি নাম রেখে দেয়। ব্যাপারটি আমাদের ভাইবোনদের নামকরনের বেলাতেও মনে হয় ঘটেছিল। আর তাই ্না বুঝেই আমার মেজদার নাম রাখা হয়েছিল ‘চঞ্চল’। বড়দাকে ডাকা হতো ‘মানিক’ নামে। ব্যস! ওটুকুই যথেষ্ট। নামের প্রভাব বেশ ভালোভাবেই পড়েছিল আমার মেজ ভাইটির উপর। চঞ্চল নামের ছেলেটি শৈশবেই তার নামের প্রতি সুবিচার করা শুরু করেছিল।

আমার মেজদাটি ছিল ভীষন চঞ্চল। মেজদাকে তার চঞ্চলতার কারনেই আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সকলেই প্রচন্ড রকমের ভালোবাসত। সেই তিন চার বছর বয়স থেকেই চঞ্চল মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসত। এক জায়গাতে বসেই সে ৯/১০ টা রসগোল্লা খেয়ে ফেলতে পারতো। আমাদের ছেলেবেলাতে খেতে পারাটা ছিল একটি বিশেষ গুন। কোথাও নেমন্তন্ন খেতে গেলে দেখা যেত, আসরে যে ব্যক্তিটি যত বড় ভোজন রসিক, তার সমাদর ছিল তত বেশী। খাওয়ার আসরে তাকে ঘিরে থাকত লোকজন, শুধুমাত্র তার ‘দৃষ্টিনন্দন খাওয়া’ উপভোগ করার জন্য। আমার মেজদাটি সেই ছোটবেলাতেই তেমন একটি গুন অর্জন করেছিল বলেই বাইরে ঘরে তার আদর ছিল। আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে সে দেখতেও ছিল ভারী মিষ্টি।

আমাদের চার ভাইবোনের মধ্যে আমি আর আমার মেজদা পেয়েছি বাবার গায়ের রঙ, কালো বা শ্যামলা, বাকী দুই ভাই পেয়েছে আমার মায়ের গায়ের রঙ, গৌর বর্ণ। ফলে তখন থেকেই ভাইবোনের মধ্যে একটি শ্রেণীভেদ তৈরী হয়ে যায়। আমি আর আমার মেজদা নিজেদের মধ্যে একধরনের একাত্মতা টের পাই। সেই ছোট্ট বয়সেই আমার মেজদাটি আমাকে অনেক বেশী ভালোবাসত। তার কাঁধে চড়িয়ে ‘দই নিবেন দই’ বলে সারা বাড়ী ঘুরত। আমি তার মাথার ঘন কোঁকড়া চুল জাপ্টে ধরে থাকতাম, ব্যথায় নিশ্চয়ই তার দম বেরিয়ে যেতে চাইতো, তার পরেও আমাকে কাঁধ থেকে নামাতোনা, শুধু বলতো ‘এত জোরে চুল টানিসনা, ব্যথা পাই’। তবে আমাকে যেমন কাঁধে চড়িয়ে ঘুড়াতো, তেমনি আবার খেতে বসলে আমার থালাতে যদি কোন একটা খাবার ভাগে বেশী পড়ে যেতো, বিনা বাক্যব্যয়ে সে সেটা তুলে নিত। এটাই ছিল আমাদের অলিখিত নিয়ম।

আমার মেজদাটিকে স্কুলেও টিচাররা অনেক আদর করতো। সারাদিন ‘বান্দরামী’ করা একটা ছেলে পরীক্ষার খাতায় কিভাবে এমন গড়গড় করে ইতিহাস, ভূগোলের মত খটমট জিনিস পাতার পর পাতা লিখে যেত, সেটাই ছিল আশ্চর্য্যের ব্যাপার। সারাদিন সে স্কুলে ‘বান্দরামী’ করতো, এই দেয়াল টপকাচ্ছে, এই গাছে ঝুলছে, স্কুল বিল্ডিং এর রেলিং বাইছে, মোটের উপর টিচারদের ভাষায় যা ছিল ‘পোলা বড় বান্দর’। আমার মা নিজেও শিক্ষিকা ছিলেন বলেই অন্য স্কুলের শিক্ষকরা মায়ের এই চঞ্চল ছেলেটির নামে নালিশ করা অবশ্য কর্তব্য মনে করতেন। আমার অতি নীতিবান মা, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে আর দেরী করতেননা, বাসায় ফিরেই উচ্চ আদালতে তা পেশ করে দিতেন। আমার ‘বীর, পরাক্রমশালী’ বাবা এতটুকু সময় অপচয় করতেন না বিচারের দন্ড হাতে নিয়ে। দড়াম দড়াম করে শুরু করতেন পিট্টি। আহারে! আমার বাবা মা যদি আমেরিকাতে থাকতেন, কতবার যে তাঁদের জেলের ভাত খেতে হতো, সেটাই এখন ভাবি। আমার বাবা আমার মেজদাকে পিটাতেন, আমার মেজদা এতটুকু চিৎকার করতোনা, পিটানিগুলি সহ্য করতো, আর আমি পাশের ঘরে থেকে টের পেতাম কি ব্যথাই পাচ্ছে আমার প্রিয় ভাইটা। আমি ছোটভাইকে সাথে নিয়ে হাউমাউ করে চীৎকার শুরু করে দিতাম। আমার এখনও চোখ ফেটে জল আসছে, সেই সময়ের কথা মনে পড়ে। আমি কাঁদতাম আর বলতাম, ‘ও বাবা আর মাইরোনা, ও বাবা আর মাইরোনা’। আমার বাবার হাত অবশ হয়ে আসতো, মাইর বন্ধ হয়ে যেত। একঘন্টা পরেই বাবা যখন আমাদের সবাইকে নিয়ে খেতে বসতো, নিজের থালা থেকে মাছের টুকরাটা তুলে তাঁর ছেলের পাতে দিয়ে দিতেন। এটাই ছিল পরিচিত দৃশ্য। আমার মেজদার মনে হয় কোন মান অভিমান ছিলনা। বাবার কাছ থেকে মাছ পেয়ে মনে হয় পিটানি খাওয়ার কথা ভুলে যেত।

আমার মেজদার স্মৃতিশক্তি ও মুখস্থবিদ্যা ছিল ঈর্ষনীয় পর্যায়ের। একমাত্র অঙ্কে ছিল তার দারুন ভয়। অঙ্ক ভালো বুঝতোনা অথবা বুঝার চেষ্টা করতোনা। নাহলে আমাদের বাকী তিন ভাইবোনের সকলেই ছিলাম অঙ্কে দারুন ভাল, একমাত্র মেজদা ছাড়া। আমরা চার ভাইবোনই ছিলাম স্কুলের ফার্স্ট বয়/গার্ল। স্কুল থেকেই আমাদের উপর অনেক আশা ভরসা করা হতো। অংকে তেমন একটা ভালো ছিলনা (?) বলেই আমার মেজদা স্বাভাবিকভাবেই মানবিক বিভাগে পড়তো। আমাদের কোন প্রাইভেট টিউটর ছিলনা। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে যখন প্রিটেস্ট পরীক্ষা হলো, মেজদা প্রিটেস্টে অঙ্কে পেয়েছিল ২৯। টিচার গ্রেস দিয়ে ওটাকে ৩৩ করে দিয়েছিল। আমাদের পরিবারে ফার্স্ট বয় অঙ্কে ফেল করেছে, এমন সংবাদ পরিবারের প্রধানের ভেতর কেমন ঘূর্ণী সৃষ্টি করতে পারে, তা মোটামুটি আশেপাশের সকলেই জানতো। অনেকেই মজা দেখার অপেক্ষায় থাকতো, কিভাবে চঞ্চল নামের চঞ্চল কিশোরটিকে তার বাবা বেধড়ক পিটায়, এটা দেখার জন্যও মনে হয়, প্রতিবেশীদের অনেকে ‘আহারে, মাস্টার দিদির পোলা অঙ্কে ফেল করছে’ বলে বাবাকে উসকে দিয়েছিল। বাবা যথারীতি পিটিয়ে ক্ষান্ত হলে পরে আমার বড়দা ম্যাট্রিকের আগের তিনমাস ছোট ভাইটিকে অংক শিখিয়েছিল। পরীক্ষা দিয়ে এলে পরে উৎকন্ঠিত সকলেই জিজ্ঞেস করেছিল, পরীক্ষা কেমন হয়েছে। মেজদা বলেছিল, ৬৫র উত্তর দিয়েছি। শুনে সকলের মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। ইংরেজী পরীক্ষা্র আগের দিন বাবা জানতে চেয়েছিলেন ‘প্যাট্রিয়টিজম’ Essay শিখেছে কিনা। মেজদা বলেছে, শিখে নাই। পরীক্ষার আগের দিন তাকে যথারীতি পিট্টি খেয়ে Essay নিয়ে বসতে হয়েছিল। মাত্র দুই ঘন্টা সময়ে চঞ্চল তিন চার পৃষ্ঠার রচনাটি গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পেরেছিল। পরেরদিন পরীক্ষায় প্যাট্রিয়টিজম এসেটি এসেছিল। (অন্য এসেও কমন পড়েছিল, কিনতু আমার বাবা চাইতেন আমরা যেনো ্কঠিন টপিকের উপর লিখি)। ম্যাট্রিকের রেজাল্ট যখন বের হলো, দেখা গেল, ১৯৭৬ সালের ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফলে আমার মেজদা মানবিক বিভাগ থেকে ফার্স্ট ডিভিশান পেয়ে পাশ করেছে। বিস্তারিত জানা গেলো দুই এক ঘন্টা পরেই। মানবিক বিভাগে সারা ঢাকা বিভাগে মাত্র ৫৫জন এবং নারায়নগঞ্জ সাবডিভিশানে মাত্র একজন ফার্স্ট ডিভিশান পেয়েছিল। সেই একজনটি হচ্ছে ১৪ বছর বয়সী দুরন্ত, চঞ্চল কিশোর ‘অশোক কুমার দাস’। আমার বাবা মায়ের মুখে দেখা গেল বিজয়ীর হাসি। মার্কশীট এলে দেখা গেল, সে অংকে পেয়েছে ৬৪। তার ধারনা ছিল ৬৫ তে ৬৫ পাবে, হয়ত জ্যামিতিতে কোথাও ১ নম্বর কাটা গেছে। আর আমরা সকলেই অবাক হলাম, অংকও কিভাবে মুখস্থ করা যায়, তা দেখে।

কলেজে গিয়ে উচ্চমাধ্যমিক ক্লাসে ভর্তি হতেই মনে হয় সেই কৈশোরের চঞ্চলতা কমে যেতে শুরু করলো। উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগে কেউই ফার্স্ট ডিভিশান পায়নি, আমার মেজদাও ফার্স্ট ডিভিশান পায়নি তবে যুক্তিবিদ্যাতে লেটার মার্ক পেয়েছে। মেজদার পাশে থেকে তখনই শিখেছিলাম, গরু ঘাস খায়, মানুষ গরু খায় তাই মানুষ ঘাস খায়। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে আমার মেজদাকে আর পিটানি খেতে হয়নি। তারপরতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবার ইচ্ছেতেই ইংলিশ অনার্স পড়তে শুরু করলো। বাড়ী থেকে এত দূরে গিয়ে ঘরের সবচেয়ে চঞ্চল ভোজন বিলাসী ছেলেটা কিভাবে থাকতো, তা নিয়ে আমাদের সকলের মনেই একটু চাপা কষ্ট ছিল। ১৯৮১ সালে বাসে করে মানিকগঞ্জ যাওয়ার পথে জাহাঙ্গীরনগর বিশেবিদ্যালয়কে পাশে রেখে বাস ছুটছিল, আমার দুই চোখ ছাপিয়ে জল চলে এসেছিল, শুধু ভেবে যে আহারে আমার মেজদাটা এত দূরে পড়ে আছে! কেউ নেই তাকে একটু আদর করার, হোস্টেলের খাওয়া দাওয়া তার ভালো লাগার কথা নয়। আমার বাবা একেবারে মাপা পয়সার বাইরে একটা টাকাও দিতে পারতোনা। কিভাবে আমার মেজদা এখানে আছে কে জানে! এমনটা ভেবেই কাঁদছিলাম।

আমরা জানতে পারিনি আমার মেজদা ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছিল। এরপরে আমিও যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলাম, ভর্তি পরীক্ষায় আমি খুবই ভালো রেজাল্ট করেছিলাম, আমার মেজদা রেজাল্টের কাগজটি হাতে নিয়ে আমাকে পাশে রেখেই হাঁটছিল, হঠাৎ করেই আমার মেজদা কাঁদতে শুরু করলো। আমি থতমত খেয়ে যেতেই সে বলতে পারলো, “ তোরা সবাই বাবার লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে, আমি ছাড়া। তোরা সবাই কত ভাল রেজাল্ট করলি, আর আমি অনার্সে মনে হয় থার্ড ক্লাস পাব। আমি সারা জীবন বাবারে জ্বালিয়ে গেলাম। তোদের মত সায়েন্স পড়তে পারলামনা, আর্টস পড়লাম, এইবার যদি থার্ড ক্লাস পাই, কি যে হবে”। আমার যে মেজদা বাবার পিটানি খেয়েও কাঁদে নাই কোনদিন, সেই মেজদাকে কাঁদতে দেখে আমার যে কি কষ্ট হচ্ছিল, কিনতু আমি নিজেকে সামলে নিয়ে তখন থেকেই শুরু করলাম মেজদাকে অভয় দেয়া। আমি বাবাকে কিছুই বলিনি, আমার মেজদা রাজনীতি করতে গিয়ে পড়ালেখাতে ফাঁকী দিয়েছিল, ফলে ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ারের রেজাল্ট বেশ খারাপ হয়েছিল, থার্ড ইয়ারে তাকে এত বেশী মেকাপ করতে হতো যে এমন অবস্থায় আমি হলে ফেল করতাম। আমি মেজদাকে সাহস দিতাম, জানিনা আমার অসম্ভব মেধাবী, তুখোড় স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন মেজদার সেই দিনগুলোর কথা মনে আছে কিনা। আমার নিজের মাসের খরচ থেকে পয়সা বাঁচিয়ে মেজদাকে দিতাম, সে একটু খেতে ভালোবাসত বলে বাবার পাঠানো টাকায় তার চলতে চাইতোনা। আমি টাকা দিতাম বলে সে প্রান্তিকে গিয়ে কয়েকটা মাস বেশ ভালোই চলেছে মনে হয়।

১৯৮৩ সালে তুমুল ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ১৪ই ফেব্রুয়ারী আমাকে না বলেই আমার মেজদা ঢাকা চলে গেছিল। ব্যস! আটকা পড়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন এক হোস্টেলে। তখন ফোন ছিলনা, হোস্টেলের একটিমাত্র ফোন থেকে কল দিতে গেলে বিরাট লাইনে দাঁড়াতে হতো। নওয়াব ফয়জুন্নেছা হল থেকে মীর মোশাররফ হোসেন হলে ফোন করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সারারাত জেগে ছিলাম, মেজদার কোন খোঁজ না পেয়ে। পরের দিন কোন একফাঁকে সে ঢাকা থেকে ফিরে এসেছিল, বলেছিল আগের রাতে ঘটে যাওয়া অসম্ভব ঘটনার কিছু অংশ। প্রেসিডেন্ট এরশাদের সেনাবাহিনী হলগুলোতে ঢুকে সব কক্ষ তল্লাশী করে ছাত্রদের ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। মেজদা যে রুমে আশ্রয় নিয়েছিল, সেই রুমে আরেকজন ভর্তিচ্ছু ছাত্র ছিল, সে এসেছিল মঠবাড়িয়া থেকে, তার কাছ থেকে মঠবাড়িয়ার কলেজের নামঠিকানা শুনে মেজদা মনে রেখেছিল, মিলিটারী এসে ঢুকে তল্লাশী চালাতেই সে অকপটে মঠবাড়িয়া থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছে বলে পার পেয়ে গেছে। পরের দিন সে ফিরে এসেছে। এদিকে আমি প্রায়ই তাকে মনে করিয়ে দিতাম তার ফাইনাল পরীক্ষার কথা, সাহস দিতাম, ভরসা দিতাম। শেষ পর্যন্ত আমার মেজদা সকল প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই ইংলিশ অনার্স পরীক্ষায় ভালোভাবেই আকাংক্ষিত সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছিল। হলে কি হবে, ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী’ র মতই হয়েছে আমার ভাইটির অবস্থা। এরপরেও সে আবার আন্দোলনে যোগ দিত, শেষ পর্যন্ত আরেকবার ১৯৮৪ সালে এরশাদ ভ্যাকেশানের সময় আমার ভাইটির সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে হোস্টেল ছেড়ে আমি বাড়ী চলে গেলাম, আর নারায়নগঞ্জ থেকে আমার বড়দা এলো ছোট ভাইটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। বড়দা এসে দেখতে পেয়েছিল, মীর মোশাররফ হোসেন হলের সামনের মাঠে ঠা ঠা রোদে অনেক ছাত্রের সাথে রোদে ভাজা ভাজা হচ্ছিল তার ভাইটিও, মিলিটারীরা সবাইকে গার্ড দিয়ে রেখেছিল। সেইবার বড়দা আমার মেজদাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল, ঐ শেষ, এরপরে আর কখনও মেজদা ঐ পথে পা বাড়ায়নি।

আমার মেজদা অধ্যাপনা করতে চেয়েছিল, কিনতু আমার বাবার ইচ্ছেতে তাকে ব্যাঙ্কিং পরীক্ষায় বসতে হয়, এবং মাস্টার্স পাশ করার আগেই সে চাকুরী পেয়ে যায়। মাস্টার্স পাশ করেই সে যোগ দেয় চাকুরীতে। এত কম বয়সে এমএ পাশ করতে আর কাউকে দেখিনি ঐ সময়ে। যাই হোক, মেজদাকে অধ্যাপনা করতে দিতে রাজী না হওয়ার অন্যতম কারন ছিল, ছেলেকে আর চোখের সামনে থেকে ছাড়তে চায়নি আমার বাবা। আমরা অনেক পরে বুঝতে পেরেছি, আমার বাবা বাইরে দিয়ে বাঘ হলেও ভেতরে একজন স্নেহান্ধ বাবা ছাড়া আর কিছুইনা। উনার স্নেহের বলি হয়েছে আমাদের ভাইদের ক্যারিয়ার। কাউকেই কাছছাড়া করতে চাননি বলেই শেষ পর্যন্ত তাদের আর চাকুরী বদল করা হয়নি।

আমার মেজদা এখনও সোনালী ব্যাঙ্কে বহাল তবিয়তেই আছে। এক ছেলের বাবা সে। ছেলেটি অবশ্য বাবার চঞ্চলতার কিছুই পায়নি। আমার মেজদা নিজের বাবার হাতে অনেক পিট্টি খেয়েছে বলেই মনে হয় নিজের ছেলের গায়ে কখনও হাত তোলেনি। তবে মেজদা যেমন বাবার আদর পেয়েছে, সেই আদরটুকু কিনতু সেও করছে নিজের ছেলেকে। আমার মেজদাটি আমার অনেক আদরের একজন মানুষ, তার এতটুকু মানসিক কষ্টও আমাকে অনেক কাঁদায়। আমার মেজদা আমাকে সেই ছোটবেলাতে যেমন ভালোবাসত, আমার অত্যাচার সহ্য করতো, এখনও সে আমার অত্যাচার হাসিমুখেই সহ্য করে। আমি বিয়ের পরে সঞ্চয় করতামনা, সে নিজে উদ্যোগী হয়ে বাসে করে সাভার যেতো, প্রতি মাসে আমার কাছ থেকে টাকা এনে তার ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে দিত, এভাবেই সে আমার পায়ের তলায় একটু শক্ত মাটি তৈরী করে দিয়েছে। আমার মেজদার কাছে পাড়া প্রতিবেশীরা আসে সঞ্চয়ের পরামর্শ নিতে, সে হাসিমুখে সবাইকে সাহায্য করে।

প্রতি বছর আমার মেজদার জন্মদিনে আমি আমেরিকা থেকে ফোন করি। সে খুশী হয়। সবার সব দিকে খেয়াল থাকেনা, হয়ত আমাদের অনেকেই ভুলে যায় তাকে ঠিক সময়ে শুভেচ্ছা জানাতে, মেজদা বাচ্চা ছেলেদের মতই অভিমান করে। আমি তাকে বুঝাতে চেষ্টা করি, এমন করোনা, তোমাকে সবাই ভালোবাসে, ভালোবাসা অনুভব করার ব্যাপার। আমার মেজদার অভিমান জল হয়ে যায়। ইদানিং আমি একটু লেখালেখি করি, আমার লেখালেখির ব্যাপারে পরিবারের আর কারো কোন প্রতিক্রিয়া আছে বলে মনে হয়না, ব্যতিক্রম মেজদা। ফেসবুকে প্রায় প্রায় সে আমাকে মেসেজ পাঠায়, “ মিঠু, আমার গর্বে বুকটা ভরে উঠে যখন আমার সহকর্মী কেউ বলে, আপনার বোনের লেখা ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিনে। আমি নিজেও অবাক হই, বোন হিসেবে না দেখে তোকে লেখিকা হিসেবেই দেখি, দুই একটা লেখা এমন চমৎকার হয়েছে যে বলে বোঝাতে পারবোনা”। এই আমার সেই মেজদা যে ছোটবেলাতে আমাকে কাঁধে চড়াতো, যে আমার খাবার থালা থেকে মাছের টুকরাটি অবলীলায় তুলে নিয়ে যেত, যে আমার ভর্তির রেজাল্ট দেখে কিছুটা আনন্দে কিছুটা দুঃখে কেঁদে ফেলেছিল, এই আমার সেই মেজদা যে আমার বকা খেয়েও আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে এসে আমার একাউন্টে জমা করে দিত, সেই মেজদাটি আমার ঘ্যান ঘ্যান সহ্য করতে না পেরে কিছু টাকা শেয়ার মার্কেটে খাটিয়ে দিয়েছিল, শেয়ার মার্কেটে ধ্বস নামার পরে আমার এই মেজদাটি আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, প্রয়োজনে সে নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে হলেও আমার মূলধন ফিরিয়ে দেবে বলে। আমার মেজদা পৃথিবীতে একটাই হয়। এমন মেজদার উদাহরন আর কেউ দেখাতে পারবেনা, কারন আমি এই নাতিদীর্ঘ লেখাটিতে আমার মেজদার ভালোমানুষীর এক চতুর্থাংশ লিখেছি, বাকী তিন চতুর্থাংশ জমা করে রেখেছি, প্রয়োজনে লিখব।

আজ আমার মেজদার পঞ্চাশতম জন্মদিনে আমি ফোন করিনি। আমার স্বামীকে সে খুব পছন্দ করে। বয়সে অনেক ছোট হলেও বউএর বড় ভাই বলে কথা, কিনতু না, আমার স্বামীটিও চঞ্চল নামের সদা আনন্দময়, বেশ অভিমানী, ছেলেটিকে ছোটভাই বা বন্ধুর মত ভালোবাসে। আমার স্বামী তাকে ফোন করে উইশ করেছে আর আমি? এইতো মেজদার প্রতি আমার প্রীতি উপহার!!
শুভ জন্মদিন মেজদা!!!!!!!
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:২৯


এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এক্সিট পোল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন ৬১টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট, প্রায় ৫১–৫২ আসন।
গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট: প্রায় ৪৯–৫১ আসন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এক সেকেন্ডের নেই ভরসা

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৩


সংসারের শত দায়িত্ব কাঁধে। ধাপে ধাপে সব পালন করতে হবে। মোটরসাইকেল নিয়ে ভালো মনে রাস্তায় নামলেন রাইড শেয়ার করবেন বলে। হঠাৎ একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা লাগল। আপনি রাস্তায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসমাপ্ত নীহারিকা - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭



বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে দেখলে মানুষের প্রথম যে কথাটা মনে হতো, তা হলো—ছেলেটার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে।
কালো জিনস। কালো টি-শার্ট। টি-শার্টে কখনো Behemoth, কখনো Slayer, কখনো Cannibal Corpse। কানে হেডফোন। চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:১৮


বাংলাদেশের সমাজে একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গিয়েছে। দুই বছর আগে ব্লগে অ্যাকাউন্ট খোলার পর থেকে এই পরিবর্তন নিয়ে কম করে হলেও বিশটির বেশি পোস্ট লিখেছি। এই বিপ্লবের সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:৫৬

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত



সময় চলেছে তার আপন খেয়ালে,
নদীর স্রোতেরা হারায় কালের বুকে;
আমি শুধু এক অনন্তকাল ধরে,
ডুবে আছি প্রিয়, তোমার চাওয়া পাওয়ার ওই সুখে।

বাহিরের সব নিয়ম চলুক তার মতো,
মহাবিশ্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×