জাফর ইকবাল স্যার কে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে চিনি ঢাকা শহরে আসার পরে। তার আগে আমার সাথে স্যার এর দেখা হয়েছে আমার কলেজ জীবনে গণিত অলিম্পিয়াড এর সময়। তখন থেকে আমি স্যার এর বই গুলা পড়তে থাকি। তখন থেকে স্যার কে আমার ভাল লাগে। তারপরে ঢাকা শহরে আসার পরে গণিত অলিম্পিয়াড এর কাজে স্যার কে আরো ভাল করে চিনি। স্যার এর সাথে বাংলাদেশের এইদিক থেকে সেই দিক দৌড় ঝাপ করেছি। নিজেদের অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। স্যার সব কথা শুনে নিজে অনুপ্রাণিত হয়েছি।
১
কিছু দিন আগে আমাদের দেশের একজন মুক্তমনা ব্লগার অনন্ত প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হয়েছে। সেই খুনের প্রতিবাদে সিলেট সহ সারাদেশে প্রায় বেশ ভাল তোলপাড় হল। আর সেই সাথে যোগ দিলেন আমাদের সবার প্রিয় জাফর স্যার। আর তখন তিনি সজীব ওয়াজেদ জয় এর একটি কথার বেশ সমালোচনা করেন। আর তাতেই সিলেটের একজন প্রভাবশালী একজন সংসদ সদস্য নাকি জাফর ইকবালকে চাবুক মারার ইচ্ছে পোষণ করেছেন। কী অপরাধ জাফর ইকবালের?
যতদূর জানি ঐ সংসদ সদস্য জাফর ইকবাল স্যার কে চাবুক মারার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন কোনো প্রকার প্ররোচনা ব্যতিরেকেই। জয়ের সঙ্গে বিবিসির কথোপকথনের কিছু পরের ঘটনা এবং তার সঙ্গে ঐ সংসদ সদস্যের চাবকানোর খায়েশ ব্যক্ত করার কোনো সম্পর্ক নেই। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি তার কতিপয় সাঙ্গপাঙ্গ এবং নিজস্ব বশংবদ কর্মীদের ছাত্রলীগ-যুবলীগের ছাপ লাগিয়ে অধিকতর অশ্লীল, কুৎসিত, অরুচিকর, অগ্রহণযোগ্য মিছিল ও শ্লোগানের আয়োজন করে এর সঙ্গে জয়ের বক্তব্যের বিষয়ে জাফর ইকবাল স্যার এর হতাশা জুড়ে দিয়ে নিজের অসংবৃত আচরণ যৌক্তিক প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।
২
এই জাফর ইকবাল স্যারই তাদের শিখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, জেলায় জেলায় তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করতে, চিনিয়েছেন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির স্বরূপ এবং রূপান্তর। তিনি যাঁকে চাবুক মারতে চেয়েছেন সেই জাফর ইকবাল স্যার বিদেশে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভের পর বিদেশে অর্থসম্পদ বৈভবের প্রলোভন উপেক্ষা করে উচ্চশিক্ষিত স্ত্রীকে সঙ্গী করে দেশে এসেছেন; বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিত্তের হাতছানি অবলীলার প্রত্যাখ্যান করে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা এবং জ্ঞান বিতরণের আশ্রম হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন; সুস্থ শিক্ষার জন্য, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য, নতুন প্রজন্মকে সত্য ও ন্যায়ের সাধকে পরিণত করার জন্য প্রাণপাত করে চলেছেন।
সিলেটের যে সংসদ সদস্য জাফর ইকবাল স্যার কে চাবুক মারার কথা বলেছেন তিনিও বহুকাল বিদেশেই ছিলেন বলে শুনেছি। তিনি দেশে ফিরেছেন চলতি হাওয়ার পন্থী হিসেবে এবং শেখ হাসিনার বদান্যতায় ও আওয়ামী লীগের হয়তো কারও কল্যাণে সংসদ সদস্য হিসেবে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার জন্য।
আর এখানেই রয়েছে জাফর ইকবাল স্যার এর সাথে এই বিদেশ ফেরত সংসদ সদস্যর। এখানেই পার্থক্য সুচিন্তার আর স্বার্থচিন্তার। জাফর ইকবালের পিতা ছিলেন শহীদ। একাত্তরে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। কারণ তিনি অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ সরকারি পদে থেকেও কুণ্ঠাহীনভাবে মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন
৩
জাফর ইকবাল স্যার বিদেশে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভের পর বিদেশে অর্থসম্পদ বৈভবের প্রলোভন উপেক্ষা করে উচ্চশিক্ষিত স্ত্রীকে সঙ্গী করে দেশে এসেছেন; বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিত্তের হাতছানি অবলীলার প্রত্যাখ্যান করে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা এবং জ্ঞান বিতরণের আশ্রম হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম থেকেই নিজেদের কিছুটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রিয় একটি বিদ্যাপীঠ হিসেবেই পরিচিত। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি মাঝে মাঝেই তাঁদের বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডের জন্য প্রশংসিত হয়।
দেশের প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন পিপীলিকা, মুঠো ফোনে ভর্তি কার্যক্রম, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা থেকে সবকিছুই শুরু হয়েছিল জাফর স্যারের হাত ধরে শাবিপ্রবি থেকে। প্রতিষ্ঠার ত্রিশ বছর না পেরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে অন্যান্য অনেকের যেমন অবদান রয়েছে ঠিক তেমনি রয়েছে জাফর স্যারের অক্লান্ত পরিশ্রম। আর সেই জাফর ইকবাল স্যার কে চাবুক মারবেন বলেছেন স্থানীয় এক সাংসদ।
এই এমপি শুধু এই বলেই ক্ষান্ত হননি। তিনি চরম সাম্প্রদায়িক কিছু শব্দও ব্যাবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জাফর ইকবাল সে হল ১ লক্ষ পারসেন্ট গৌরগোবিন্দ, সে চায়না সিলেটের মানুষ শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হোক। এখানে যে ভিসি ছিল তাকেও দিয়েছে তাড়িয়ে। আর এই সিলেটের মানুষ তাকে ফুলচন্দন নিয়ে সুন্দর সুন্দর ফুল নিয়ে প্রত্যেক দিন মূর্তিপূজা করতে যায়। আমি যদি বড় কিছু হতাম তাকে ধরে চাবুক মারতাম কোর্ট পয়েন্টে এনে!’
ড. জাফর ইকবাল স্যার কে এসব কথা শুনতে হলো, কারণ তিনি মত দিয়েছিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয় কখনো শুধু একটি অঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হতে পারে না। সিলেটিদের জন্য শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা কোটার বিরুদ্ধে তিনি লেখালেখি করেছেন। তাই তাকে শুনতে হলো জনসম্মুখে চাবুকের বাড়ি খাবার কথা! তাও আবার সরকার দলীয় একজন এমপির মুখ থেকে! এরা বুঝতে পারলো না, ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করার ক্ষেত্রে কোটা সিস্টেম চালু করলে আখেরে সেই অঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদেরই ক্ষতি হবে। দিন শেষে তো দেশের সবার সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যদি ঘটতে থাকে তাহলে এই দেশে আর আলোকিত মানুষ থাকবে না। সবার পরিচয় হয়ে রাজনীতি আর রাজনৈতিক দল দিয়ে।
৪
সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ফেসবুক কে আন্দোলন করেছি স্যার এর সাথে। আর আজ আমি বলছি স্যার এই দেশ, এই সমাজ আপনার মতো গুনি মানুষদের কদর বুঝার ক্ষমতা রাখে না। আমি খুবই দুঃখিত ও লজ্জিত যে, পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে আপনাকে এই অপমান সহ্য করতে হলো।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০১৫ বিকাল ৪:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



