somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল ও কিছু কথা

২০ শে মার্চ, ২০১৩ ভোর ৪:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হূমায়ুন আহমেদের দেয়াল ও কিছু কথা
সৈ য় দ কা ম রা ন আ হ মে দ

বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট সাহেব জোহরের নামাজ শেষ করে চোখ বন্ধ করে জানামাজে বসে আছেন । .........।
মোশতাক সাহেবের একাগ্র মনোযোগ ব্যাহত হল। মেজর রশিদের গলা-
'আপনি দেখি বঙ্গভবন কে মসজিদ বানিয়ে ফেলেছেন! সারাক্ষণ নামাজ কালাম পড়লে রাষ্ট্র কার্য্য পরিচালনা করবেন কিভাবে? ....
আপনার নামাজ শেষ হয়েছে? আমি জরুরী কাজ নিয়ে এসেছি। .........
- সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান কে যে আটক করা এটা জানেন?
- জানি না। ডিজিএফআই আমাকে কোনও খবর দেয় না। তারা আমাকে ভাসুর জ্ঞান করে। ভাসুর কে সব কথা বলা যায় না।
মেজর রশীদ বিরক্তির সঙ্গে বললেন রসিকতা করবেন না, সময়টা রসিকতার জন্য উপযুক্ত না।
খন্দকার মোশতাক বললেন, অবশ্যই, অবশ্যই।
_______________________

হুমায়ুন আহমেদের সর্বশেষ উপন্যাস 'দেয়ালের' কিছু অংশ হচ্ছে উপরিউক্ত অংশ। বইটির অধিকাংশ তথ্যই ঐতিহাসিক সত্য। আর প্রিয় লেখক তার 'হুমায়ুনি স্টাইলে' সেই তথ্যগুলোকে করেছেন আরও আকর্ষণীয়।ইতিহাসকে বর্ণনা করেছেন 'ঘড়ুয়াভাবে'।
অনেকদিন পর প্রিয় লেখকের বইটি হাতে পেয়ে যুগপৎ আনন্দ আর বেদনা, দুটোই ছুঁয়ে গেছে। আরও কিছুদিন কি পারতেন না এই মহা পুরুষ আমাদের মধ্যে থাকতে? না, থাকলেন না, জীবনের চরম সত্যকে মেনে নিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। স্রষ্টার ইচ্ছাই আমাদের শিরোধার্য।
_____________________________________

বইটি পড়ে ভালোলাগার চেয়ে দুঃখবোধটা ছিল প্রবল। কে চায় হৃদয় খুড়ে দুঃখ কে জাগাতে। তেমনি আমাদের ১৫ই আগস্ট ও পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থান গুলো যেভাবে রক্তের স্রোত প্রবাহিত করেছিল, সেটা কতটা ভয়ংকর আর ধ্বংসাত্মক ছিল সেটা আজকের বাস্তবতায় অনুধাবন কিছুটা কষ্টসাধ্যই। ১৫ই আগস্ট পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ক্যান্টনমেন্ট ও বংগভবন কেন্দ্রিক হওয়ার সাধারণ জনগণের উপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল অনেকটা লঘু, কিন্তু ছিল সুদূর প্রসারী। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাই মনে করি। আমি মনে করি ঐ সময়গুলো স্বাধীন বাংলাদেশের ‘পারসোনালিটি’ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এবং সেই পারসোনালিটি এখনো বিদ্যমান। আমার কাছে সে পারসোনালিটির একটা বিশেষ দিক হচ্ছে পারষ্পরিক অবিশ্বাস। এছাড়া আরও অনেক গুলি দিকও রয়েছে এই পারসোনালিটির যে গুলো আবার কয়েকটি স্ববিরোধী। যদিও সামরিক বেসামরিক অনেক লেখকই লিখেছেন আমাদের ঐ বিশেষ ক্রান্তিকাল নিয়ে তবুও আমি মনে করি এইসব বিষ্যের উপর গবেষনামুলক লেখার ঘাটতি রয়েছে।
জানি এই বইয়ের উপর শত শত রিভিউ লেখা হবে। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিবেন যে যার মত। আমি যেই যোগ্যতা রাখিনা তবে আমি আমার ‘পাঠক রিয়েকশন’ হিসেবে বলব বইটিতে লেখক নিজে একজন দ্রষ্টা ছিলেন, তাই ঘটনা বর্ণনায় তিনি ছিলেন শতভাগ সৎ। তাই বইটি ইতিহাসের টেক্সট বুক হতে না পারলেও ইতিহাস বর্ণনায় বিশুদ্ধ নিঃসন্দেহে ।
বইতটি ঐতিহাসিক উপন্যাস’ টাইপের হলেও আসল এটা একটা নির্দিষ্ট ৫-৬টি বছরের সংক্ষিপ্ত ‘নোট বুক’ বলা চলে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের চারিত্রিক দূষণের ঐ কয়েকটি বছর সম্পর্কে উদাসীনদের আলসেদের জন্য তুলনামূলক অল্প পৃষ্ঠার নোটবুক হাসি ফোটাবে বলে আমার মনে হয়। আর চাপাবাজ সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ দের কাছে এটা হতে পারে একটি বাইবেল।
লেখক নিজে মন্তব্য বা নিজের মতামত চাপিয়ে দেয়ার কোন চেষ্টাই করেন নি এই বইয়ে। সেটাই এই বইয়ের অন্যতম সৌন্দর্য। দু এক জায়গায় মনে হতে পারে তিনি করেছেন তবে আমি মনে করিনা সেটা চাপিয়ে দেওয়া, বরং সেটা তাঁর লেখক হিসেবে মানব মনের অনুভূতিকে জাগিয়ে দেওয়া। আশা করি ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারবেন অনেকেই।
বইটিতে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এসেছে। এসেছে বঙ্গবন্ধু কে ঘিরে চাটুকার আর সুবিধাভোগী শ্রেণীর কথা। সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে রক্ষিবাহীনীর অপকর্ম। সে রক্ষীবাহিনীর দ্বারা লেখকের পরিবার তাদের বরাদ্দকৃত শহিদ পরিবারের বাড়ী বেদখল হয়েছিল এবং অনেক দেন দরবার করে বাসার দোতলাতে থাকার সুযোগ পেয়েছেন এবং নীচের তলা রক্ষীবাহিনীর একজন সুবেদারের জন্য ছেড়ে দিতে হল। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর নিগৃহীত সে রক্ষীবাহিনীর সুবেদার পালিয়ে গেলেন। তাঁর দুটি মেয়ে এসে লেখকের মাকে অনুরোধ করছে তাদের কে আশ্রয় দেয়ার জন্য। কারণ ‘এখন তাদের পাবলিক মেরে ফেলবে’। এই পরিমাণ ঘৃণা ছিল মানুষের রক্ষিবাহিনীর প্রতি। ক্ষোভ ছিল তুখোড় ছাত্র নেতা হিসেবে খ্যাত তোফায়েল আহমেদ কে নিয়েও। তিনিও ছিলেন রক্ষিবাহীনির সাথে।
এসেছে খন্দকার মোশতাকেরও যেটা একেবারে প্রথমে বর্নিত সংলাপে বুজা যায় কেমন আমোদি ছিলেন তিনি। ছিলেন ক্ষমতা মসনদে বসার সুযোগ সন্ধানী । এসেছে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাধারণ সৈনিক জীবনের উল্লেখ।
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাব, প্রথম অস্থায়ী প্রসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম সহ কামরুজ্জামান সাহেব ও ক্যাপ্টেন মনসুর সাহেবের মত চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের এক নির্মম ঘটনা, যা অশ্রু শিক্ত করবে চোখ।
কর্নেল তাহেরের মৃত্যুর (ফাঁসির)জন্য সামরিক প্রশাসক জিয়া দায়ী, এ সু প্রতিষ্ঠিত সত্য বইটিতে উল্লেখ থাকলেও জিয়ার এ ভিন্ন যে অন্য কোন উপায় ছিলনা, সেটা বইটিতে উল্লেখ করলে ভাল হত। ‘বিপ্লবের নামে অফিসার হত্যার কাজ সিপাহীরা করত’ এবং সেই রেশ তখনও কিন্তু কাটেনি। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন বলে যে অভিযোগ জিয়ার প্রতি সেটা মনে করি সত্য নয়। কর্নেল ফারুক, মেজর রশীদ, মেজর ডালিম কে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছেন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাঁচাতে নয়, বরং নিজেকে খুনিদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য। তবে তিনি নিজের সামরিক ক্ষমতা প্রয়োগে বাড়াবাড়ি করেছেন এবং তাঁর মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে চট্টগ্রামে।
আর অবধারিতভাবে অবন্তি ও শফিকদের হাহাকার মিলিয়ে যায় মিলিটারীদের বুটের কর্কশ শব্দের মাজে আর শাসকের খেয়ালী ইচ্ছায়।
বইটি এক বৈঠকেই পড়ার মত বই। অবশ্য এটা ঘটনার চেয়ে ঘটনা লেখকের কৃতিত্বই বেশি। আশা করি ভালো লাগবে সবার। তবে এক এক করে স্বীয় জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিভে যাওয়া গল্পে পড়ে বিষাদের ছায়া পিছু নিবে, দীর্ঘশ্বাস পড়বে নিজের অজান্তেই ।।
____________X_____________
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ক্যায়া হুয়া ? হুক্কা হুয়া; হুক্কা হুক্কা হুক্কা হুয়া

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫


২৪ বছর ধরে ঢাবিতে অনার্স পড়ছে; তা-ও নাকি ভাষা শিক্ষা বিভাগে উর্দূ নিয়ে !!! আজতক তার পড়া শেষ হয় নাই !!! এ ভার্সিটিতে নাম লিখালে পন্ডিত মশাই'রা কি কোনও... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য

লিখেছেন চারাগাছ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৬




বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য


​আজকের বৃষ্টিটার কোনো ছন্দ নেই। কোনো ব্যাকরণ নেই। স্রেফ আকাশ ভাঙা জল, যা এই শহরের বুকে সশব্দে আছড়ে পড়ছে। মানুষজন তাড়াহুড়ো করে ছাতা মেলছে, আশ্রয়ের খোঁজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×