শহুরে জীবনে কোনো স্বাদ নেই, তৃপ্তি নেই । আছে শুধু একরাশ প্রত্যাশার আবর্জনা । শহরের যান্ত্রিকতা আমরা সবাই কাজে লাগাই । কেউ নিরেট ভালোবাসি না । তাই সারাদিন কর্মব্যস্ত জীবনের ইতি টেনে রাত্রিকালীন নিদ্রালয়ে কিছুটা সময় হলেও ফিরে যাই গ্রামের জন্মস্থানে । যার ধূলিতে আছে অসংখ্য মধুমাখা স্মৃতি । পরতে পরতে রয়েছে কিছু বাস্তব স্বপ্নের অভিজ্ঞতা ।
স্কুল জীবনে ভালো কিছু বন্ধু ছিলো । দু’জনের কথা না বললেই নয়- মাহফুজ ও আলী আকবর । আমরা এই তিনজনই স্কুলের বখাটে রিয়েলিটি শোতে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হতাম । আর ছিলো দুর্বল মাহতাব । সারাদিন খুব জ্ঞানী জ্ঞানী লেকচার দিতো । এই জন্য মাহতাবকে প্রতিদিন না মারতে পারলে কেমন যেনো পড়ালেখায় আমাদের মন বসতো না । আরো একজন ছিলো- সুস্মিতা । খুব পছন্দ করতা, কিন্তু বলতে পারি নি । তবে যার সাথে প্রেম ছিলো শুনেছি কিছুদিন আগে তার নিকা সম্পাদিত হয়েছে । দোয়া করি, তিনি যেনো সুখী হন এবং আমায় প্রতি তার প্রদত্ত অভিশাপখানা আল্লাহ যেনো নিজগুণে ক্ষমা করেন, মাফ করেন । গোপনে বলে রাখি, স্কুলের মেয়েদের কনডমের সাথে পরিচিতি দান সম্ভবত আমরা তিনি বন্ধুই প্রথম দিয়েছিলাম । তবে শুধুই পরিচিতি; হাতে কলমে নয় ।
লেখাপড়ায় খুবই চমৎকার ছিলাম । দাঁড়িয়ে কিংবা বসে পড়া বলেছি, এমন কখনো হয় নি । স্যারেরা তাই বিরক্তিভরে নিয়মিত আব্বুর কাছে নালিশ দিতো,
-স্যার, আপনার ছেলে নেতা হইছে ।
-বাগানে বসে সিগারেট ধরাইছে ।
-অনেক ছেলেমেয়েকেই তো মানুষ করলেন । কিন্তু নিজের একমাত্র ছেলেটাকে বোধ হয় আর পারলেন না ।
আব্বু বাড়িতে এসে বিভিন্ন ভার্সিটি, মেডিকেল পড়ুয়া ছেলেদের সাথে আমার তুলনা করে যথোপযুক্ত উত্তম মাধ্যম দিয়ে হপ্তাখানেকের জন্য খেলাধূলা ও মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন । কিন্তু আম্মু পুরোনো কথাগুলো নতুন রেকর্ডেই বাজাতেন । নির্লজ্জ, বাড়ি থেকে বের হ । আর সহ্য হয় না, যার ছেলেপুলে নাই, সে-ই ভালো আছে । অত:পর টেবিল থেকে কতক গ্রামার বই পাশের পুকুরে নিক্ষেপ করে রাতের খাবারের ওপর কারফিউ জারি করতেন । তবে আমার চাচাচাচি সুকৌশলে তাদের ঘরে ডেকে নিয়ে রাত্রিবেলার সেই মিলটি খাওয়াতে কোনোদিনই ভুল করেন নি । দাদু যেদিন বাসায় থাকতো, সেদিন আব্বু-আম্মু কিছু বলার সাহস পেতো না । খুবই রোমান্টিক ধাচের মানুষ । বয়স শত ছুঁই ছুঁই । অথচ এখনো আমার বউ দেখার স্বপ্ন দেখেন ।
পড়ালেখার ব্যাপারে আব্বু শুধু একটা কথাই বলতেন, গ্রামার পড়, আর সূত্র মুখস্ত কর । আরো কতগুলো বিখ্যাত উক্তি ছিলো । খালি মুখস্ত করিস না, একটু বুঝেও পড় । কী বাহারি হাতের লেখা, সব বানান ভুল । স্কুল টিচার সেলিম স্যারও কম যান নি । সব সময় শুধু উপদেশ দিয়েই যেতেন । কামরুল, বাইরুম বাইরুম একটু কম করো । ঐ সব ছাড়ো । ভবিষ্যত অন্ধকার । স্যারের অঙ্কের হাততত্ত্ব কিংবা দেলোয়ার স্যারের মাছকাহিনী এখনো খুব মিস করি ।স্যারেরা প্রতিবছর দুর্নীতি করে প্রতিবছর আমাকেই ফার্স্ট বানাতো এবং বোর্ডের অশেষ কৃপায় স্কুলের একমাত্র জিপিএ-৫ টি আমিই পেয়েছিলাম ।
স্কুলের পাট চুটিয়ে কলেজে ভর্তি হয়ে নেতামি ভাবটা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলো । কলেজেরে প্রথম বর্ষটা পার করেছি শুধু বাড়িঅলা আন্টির মেয়ের প্রেমকাব্য শুনে । কোন মাফিলে খিচুড়ি দিবে, কোন ক্ষেতের তরমুজ মোটা হইছে কিংবা কোন বাড়িতে সুন্দরী মেয়ে আছে, তা বের করতে কোনোদিনই ভুল হয় নি । কলেজের স্মরণীয় বরণীয় কিছু মারামারিতে পার্টিসিপিয়েট করার সৌভাগৗ জীবনে হয়েছে । প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় সর্ববিষয়ে ফেল করে খুশিতে বন্ধুবান্ধব মিলে রুমে পার্টি দিয়েছিলাম । সেই পার্টিতে স্যারের মুর্গি চুরি করে তার মেয়েকে নিমতন্ন দিয়ে কী যে ভুল করেছিলাম, তা আজো ভাবি ।
আলাদিনের চেরাগ হাতে নিয়ে অঘটন ঘটন পটীয়সী হয়ে এইচএসসিতেও কী করে যে জিপিএ-৫টা বাগিয়ে নিলুম, তা কল্পনা অতীত । সে স্যার খাতা দেখেছেন, পাইলে হয়তো জিজ্ঞেস করতাম, মামুর ব্যাটা, মানুষ আর পাইলি না । খাতা কি তুই দেখেছো না বউকে দিয়ে দেখিয়েছো । কী এমন মহত্ত্ব লিখেছি যে, আমার মতো ছাত্র এ প্লাস পাবে ?
কলেজ লাইফে খাইরুল ভাইর জন্য খুব কষ্ট হতো । বেচারা দু’শো পঞ্চাশটি প্যারাগ্রাফ আর ছিয়ানব্বুইটি রচনা পড়েও কোনোদিন পরীক্ষায় ‘মাইমাদার’ কমন বাজাতে পারে নি । কষ্ট করে তাকে ডাকতে হতো, ‘প্যারাগ্রাফ খাইরুল’ ।
কলেজের সভাপতির কথা যে এতো সত্য হবে কে জানতো ! কলেজে মেয়েলি এক বিচারে আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, হয় তুমি শীর্ষ টেররিস্ট হবা, নয়তো কেনো স্বনামধন্য ভার্সিটিতে চান্স পাবা । মাঝে মাঝে ভাবি, এতো ভালো স্টুডেন্টদের মাঝে কী করে জগন্নাথ ভার্সিটিতে চান্স পেলাম ? আর আমার মতো ছত্রের ভর্সিটিতে চান্স পেলে দেশের শিক্ষাব্যাবস্থার কী হবে ? রনি, শ্রাবণ, সাদ্দাম, সাব্বির, সবুজ, শাহাদাত, অলক, মাসুদ, করিম- ওদের মতো বন্ধু পেয়েছি জীবনে, যারা সবসময় আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায় । তাদের আলোয় আলোকিত হতে পারে এই অধমের জীবনটা ।
তবে আমি বলতে চাই, আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে কোনো স্বার্থপরতা থাকবে না । নি:স্বার্থতার যে বীজ বপন করেছি, তা ফুলে ফুলে বিকশিত হয়ে সুরভী ছড়াবে হাজার বছর...অনন্তকাল ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


