somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

‘ভূত’ ধরে নোবেল জয় !!

১০ ই অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভুতুড়ে কণা নিউট্রিনো চলার পথে তার রূপ বদলে ফেলে। এবং নিশ্চয়ই কণাটির ভর আছে, তা যতই সামান্য হোক না কেন। নিউট্রিনো অসিলেশন আবিষ্কারের মাধ্যমে এই সত্য উদ্ঘাটন করে কণাজগতের দীর্ঘদিনের এক জটিলতা দূর করার কৃতিত্বস্বরূপ এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন দুই বিজ্ঞানী। এদের একজন জাপানের তাকাকি কাজিতা (জন্ম ১৯৫৯), অন্যজন কানাডার আর্থার বি ম্যাকডোনাল্ড (জন্ম ১৯৪৩)।

নোবেল পাওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাকাকি বলেছেন, ‘বিশ্বাস্যই হচ্ছে না যেন।’ আর ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, ‘খবরটা শোনামাত্রই আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরি।’

ইউনিভার্সিটি অব টোকিওর অধ্যাপক তাকাকি কাজিতা (বাঁয়ে) এবং কুইন’স ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক আর্থার বি ম্যাকডোনাল্ড। ছবি : নোবেল প্রাইজ ডটঅর্গ।

তাকাকি ও ম্যাকডোনাল্ডের আবিষ্কার বা নিউট্রিনো অসিলেশন কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, জানতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশী বিজ্ঞানী সালেহ্ হাসান নাকীবের কাছে। নোবেল ঘোষণার কিছুক্ষণ পর টেলিফোন সাক্ষাৎকারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদার্থবিজ্ঞানী বলেন, ‘মানুষের কৌতূহল- মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, ব্রহ্মাণ্ডের ভবিষ্যতই বা কী? মানুষের মৌলিক এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে গেলে নিউট্রিনোর আচরণ বোঝা জরুরি ছিল।’ নিউট্রিনো অসিলেশন আবিষ্কারের মাধ্যমে সেই কাজটাই করেছেন তাকাকি ও ম্যাকডোনাল্ড।

আমরা সবাই নিউট্রিনো বিশ্বে বসবাস করছি। লাখো লাখো কোটি কোটি নিউট্রিনো ঠিক এই মুহূর্তে আমার-আপনার শরীর ভেদ করছে। আমরা তা দেখতে পাই না, অনুভবও করতে পারি না। অধ্যাপক নাকীব যেমনটা বলছিলেন, ‘দেখা যায় না, ধরা দেয় না, যদিও সর্বময়।’

প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে ছয় কোটি কণা শুধুমাত্র বুড়ো আঙ্গুলের নখ ভেদ করছে। কিন্তু আপনি দেখতে পান না, এমনকি অনুভবও করতে পারেন না। কণাটার নাম নিউট্রিনো।

নিউট্রিনোর গতিপ্রকৃতি কেমন, প্রশ্ন রেখেছিলাম বাংলাদেশের বিজ্ঞান সংগঠন ডিসকাশন প্রজেক্টের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানচিন্তক শামসুদ্দিন আহমেদের কাছে। তিনি বলেন, ‘শূন্যে নিউট্রিনো ছোটে কাছাকাছি আলোর গতিতে। এবং চলতি পথে পদার্থের সঙ্গে মেশে না বললেই চলে।’

ফ্রিল্যান্স ফিজিসিস্ট শামসুদ্দিন উদাহরণ দেন, ‘১৩০ আলোকবর্ষ দীর্ঘ এক লোহার দণ্ড কল্পনা করা যাক। ওই লোহার ভেতর দিয়ে যদি নিউট্রিনো এক প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে পৌঁছায় তবে তাকে কোনো মতে তার স্পর্শ পাওয়া যাবে কিংবা তাকে শ্লথ করা যাবে।’

নিউট্রিনোদের কারো জন্ম ব্রহ্মাণ্ডের জন্মলগ্নে মহাবিস্ফোরণের কালে, কেউ জন্ম নেয় সুপারনোভা বিস্ফোরণে ভারি নক্ষত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, কারো বা সৃষ্টি পৃথিবীতে পারমাণবিক চুল্লিতে। এমনকি আমার-আপনার দেহের ভেতর পটাশিয়াম মৌলের এক আইসোটোপের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের কারণে প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ হাজার নিউট্রিনো তৈরি হচ্ছে।

বাইরে থেকে পৃথিবীতে যত নিউট্রিনো আসে তার অধিকাংশই সূর্যের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় উদগত হয়। আলোর কণা ফোটনের পরই মহাবিশ্বে সবচেয়ে প্রাচুর্যময় কণা হলো এই নিউট্রিনো।

নিউট্রিনো সম্পর্কে প্রথম ধারণা দিয়েছিলেন অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী ওলফগ্যাং পাউলি, ১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে। তিনি বলেছিলেন, এই কণা তড়িৎ নিরপেক্ষ, দুর্বল প্রতিক্রিয়াশীল ও অতিমাত্রায় হালকা। তবে নোবেলজয়ী (পদার্থবিজ্ঞান, ১৯৪৫) এই বিজ্ঞানী নাকি তার অনুমান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি খুব সম্ভব ভয়ানক একটা কাণ্ড ঘটিয়েছি। আমি এমন একটা কণার ধারণা দিয়েছি যাকে ধরা অসম্ভব।’ এরপর ইতালির নোবেলজয়ী (পদার্থবিজ্ঞান, ১৯৩৮) বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি একটি সূত্রে পাউলির কল্পিত এই কণাকে যুক্ত করেছিলেন।

পাউলি বিশ্বাস করুন চাই না করুন, ১৯৫৬ সালে ঠিকই আবিষ্কার হয়ে যায় নিউট্রিনো। দুই মার্কিন বিজ্ঞানী, ফ্রেডরিক রিনস (১৯৯৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে যিনি নোবেল পান) ও ক্লাইড কোয়ান টেলিগ্রাম করে পাউলিকে জানান, তাদের ধারকযন্ত্রে (ডিটেক্টর) অধরা কণাটির চিহ্ন ধরা পড়েছে। অতএব, ভূত নয়, সত্যিকারের কণাই পোলটারজিস্ট (নিউট্রিনোকে তখন এই নামেই ডাকা হতো)।

১৯৫৩ সালে ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ডে গবেষণাগারে ফ্রেডরিক রিনস (বাঁয়ে) ও ক্লাইড কোয়ান। এই ঘরেই ধারকযন্ত্রে ধরা পড়েছিল নিউট্রিনো নামের ভূত-কণার ছাপ। ছবি : জেনারেল ইলেকট্রিক কো.।

কিন্তু ষাটের দশকের পর থেকেই এই কণা নিয়ে একটা রহস্য বড় হতে থাকে। যতগুলো নিউট্রিনো থাকলে সূর্যকে অতটা উজ্জ্বল দেখা যায়, পৃথিবীতে আছড়ে পড়া নিউট্রিনোর সংখ্যা গণনা করতে গিয়ে দেখা গেল, তিন ভাগের দুই ভাগ কণাই বেপাত্তা। না, অন্তত চল্লিশ বছর ধরে তাদের আর খোঁজ মেলেনি, মেটেনি সেই ভূত-রহস্য। ফলে সত্যিকারের কণা হওয়া সত্ত্বেও নিউট্রিনোর পরিচিতি থেকে যায় ভুতুড়ে কণা ও অধরা কণা হিসেবেই।

অবশেষে ১৯৯৮ সালে রহস্যের জট খুলে ফেলেন তাকাকি কাজিতা। জাপানে মাটির নিচে সুপার-কামিওকাদে ধারকযন্ত্রের পুরোধা এই বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেন, সূর্য থেকে পৃথিবীতে পৌঁছার পথে, বলা ভালো ধারকযন্ত্রে ছাপ ফেলার আগে, রূপ বদলে ফেলে নিউট্রিনোরা। এরা অন্তত তিন রূপে নিজেদের পাল্টে ফেলতে পারে। ভূগোলকের ঠিক উল্টো দিকে কানাডায় বসে এই সত্যটাই বছর তিনেক পরে আবিষ্কার করেন আর্থার বি ম্যাকডোনাল্ড।

মহাজাগতিক গিরগিটি : সূর্য থেকে পৃথিবীতে আাসার পথে দুই-তৃতীয়াংশ নিউট্রিনো নিজের রূপ বদলে একাধিক রূপ ধারণ করতে পারে। শিল্পী জোহানস জার্নেস্ট্যাডের চোখে টাও-নিউট্রিনো, ইলেকট্রন-নিউট্রিনো ও মিয়ন-নিউট্রিনো। সৌজনে দ্য রয়াল সুইডিশ এ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস।

যেহেতু পথিমধ্যে রূপ বদলে নেয়, তাই নিউট্রিনো কোনোভাবেই ভরশূন্য কণা হতে পারে না। ফলে বিজ্ঞানীরা বললেন, নিউট্রিনোর ভর অতি অবশ্যই থাকবে তা সে যতই নগণ্য হোক না কেন।

কিন্তু নিউট্রিনো ভর পেল কোত্থেকে? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নাকীব বলছেন, এই বিষয়টা এখনও স্পষ্ট নয়। নিউট্রিনো আছে, তার ভরও রয়েছে কিন্তু প্রচলিত হিগস মেকানিজম দিয়ে নিউট্রিনোর ভরের উৎস জানা যায়নি।

এদিকে ফ্রিল্যান্স ফিজিসিস্ট শামসুদ্দিন বলেন, নিউট্রিনোর ভর নতুন একটা মৌলিক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি করেছে আমাদের। নিউট্রিনোর ভরশূন্য হলে মুক্তমুখী, সতত সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সম্ভাবনা যতটা না ছিল, এই কণাদের ভর আছে বলে সংকুচিত মহাবিশ্বের সম্ভাবনা তার চেয়ে বেশি।

কী লেখা আছে এই মহাবিশ্বের ভাগ্যে, কী তার ভবিষ্যৎ? উত্তর পেতে জানতে হবে নিউট্রিনোর ভরের উৎসকে। নিশ্চয়ই সেই সত্যও একদিন উদ্ঘাটন করবে মানুষ।
সংগ্রহ- দ্য রিপোর্ট২৪ থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ১২:০৯
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য

লিখেছেন চারাগাছ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৬




বৃষ্টির ডায়েরি: অধ্যায় শূন্য


​আজকের বৃষ্টিটার কোনো ছন্দ নেই। কোনো ব্যাকরণ নেই। স্রেফ আকাশ ভাঙা জল, যা এই শহরের বুকে সশব্দে আছড়ে পড়ছে। মানুষজন তাড়াহুড়ো করে ছাতা মেলছে, আশ্রয়ের খোঁজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতিতে ফেরার টিকিট কি এবার ক্রেমলিনে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১০


বিশ্বজুড়ে থরথর কম্পন শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন মুল্লুক থেকে মহাখালী, সবাই আজ বাকরুদ্ধ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে, অর্থাৎ ভারতীয় কয়েকটি বেনামী ফেসবুক পেজ এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সোভিয়েত শৈশব

লিখেছেন চারাগাছ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১





বাংলা ব্লগের জগতে সহব্লগাররা যারা আমাকে অনেকদিন ধরে চেনেন, তারা জানেন—আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগে, তাই না?

রাশিয়ায় আমি কোনোদিন যাইনি।

তবু আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।

আমার সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×