ভেবেছিলাম ক্যাডেট জীবন নিয়ে কিছু লিখবো না, কিন্তু অন্য অনেকের মতো ঘুরে ফিরে ক্যাডেট কলেজের গল্পতেই বার বার ঘিরে যাই।
মান্নান নামে এক বন্ধু আছে, ক্যাডেট জীবনের ছয় বছরের দুই বছরই এক রুমে কাটিয়েছি। ওর সাথে কেউ গল্প করতে গেলেই কিছুক্ষন গল্প করার পর শুরু করে দেয় ' জানিস একবার না আমাদের কলেজে ...' । তাই বুয়েটে ওকে ছেলেপেলে 'জানিস আমাদের কলেজে না' বলে ক্ষেপাতো, তাইলেই বোঝেন অন্তরের টুকুতে মিশে গেছে আমার ক্যাডেট কলেজ।
যাইহোক, ফেয়ারওয়েল ডিনারের কাহিনী দিয়ে শুরু করি, অনেকটা শেষ থেকে শুরু।
একেবারেই বিদায়ের আগের দিনে সবাই ভুড়িভোজ করে, বিদায়ী মানপত্র পড়া হয়, অধ্যক্ষ বক্তব্য রাখে, ক্রেস্ট বিতরন হয়, তারপর জুনিয়ররা লাইনে দাড়িয়ে বিদায়ীদের সাথে করমর্দন করে ইত্যাদি ইত্যাদি।
ক্রেস্ট নেবার সময় একেকজনের নাম ডাকা হয়, সবাই হাততালি দেয়। যার যত বেশি তালি সে তত জনপ্রিয়।
আমি নিজেকে কখনই জনপ্রিয় সিনিয়রদের খাতায় গন্য করতাম না, জুনিয়রদের পিটাতাম না ঠিকই কিন্তু প্রচুর খাটাতাম। অবশ্য নিজের কাজে না, হাউজের কাজে (সব ক্যাডেট তিনটা হাউজে বিভক্ত ছিল)।
একটা একটা করে আমার নাম এগিয়ে আসছে। বুকে দুড়ু দুড়ু কাঁপছে, না জানি শেষ দিনে বেইজ্জতি হতে নয়, আমার দেয়া কাজের চাপে জুনিয়রদের অবস্থা যায় যায় ছিল। আমার নাম ডাকলে যদি কেউ তালি না দেয়, তাইলে সেই লজ্জা নিয়ে কিভাবে জুনিয়রদের সাথে হাত মেলাবো, সেটাই চিন্তা করছি। হে আল্লাহ ... বাঁচাও ...
আমার নাম ডাকা হল ... ডাকার সাথে সাথে অভাবনীয় এক অবস্থা। আমি বেঞ্চ থেকে দাঁড়া হইনি, অবিরত হাততালি পড়ছে, আমি ভুল শুনেছিলাম কিনা জানি না, অনেকের চেয়ে আমার জন্য তালিগুলো বেশি মনে হচ্ছিল। আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি অধ্যক্ষের দিকে, হাতি শেষই হচ্ছে না, কর মর্দন করলাম ... ক্রেস্ট নিলাম ... উলটা ঘুরে চলেও এলাম ... হাত তালি থামে না। বেঞ্চে বসে গেলাম, এবার থামতে শুরু হয়েছে, পাশে থাকে কোন এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করল ... কি যাদু করেছিস জুনিয়রদের ... এরা দেখি খুবই পছন্দ করে তোকে। আমি তো নিজের আনন্দের অভিভূত, ওকে কি জবাব দেব?
যা হোক ঘোরের মধ্যেই ডিনার শেষ হল। এবার করমর্দনের পালা ....
একে একে এগিয়ে যাচ্ছি ... একেকজনের সাথে হাত মেলাচ্ছি। সবচেয়ে জুনিয়র দিয়েই শুরু হয়। একেবারে যারা বাচ্চা আমাদের চোখে , ক্লাস সেভেনের ক্যাডেট ... তাদের কয়েকজনের সাথে আমার বেশ খাতির হয়ে গিয়েছিল ... একজনের নাম মহসিন ( সেও দুই বছর হয় কলেজ থেকে বের হয়েছে, প্রথমে রংপুর মেডিকেলে এবং পরবতর্ীতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে)। ওর কাছে আসতে না আসতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না।
অদ্ভূত সেই দৃশ্য !
ভেবেছিলাম যাবার আগে সবাই লোক দেখানো কান্না কাঁদে, আমি ওদের মতো কাঁদবো না। কিন্তু ওর কান্না দেখে আমিও কান্না চেপে রাখতে পারলাম না ... আমিও কেঁদে দিলাম।
আজও মনে পড়ে সেই দৃশ্য, দেখতে দেখতে 7 বছর পেরিয়ে গেল, ভুলতে পারছি না।
হয়তো ভুলতেই চাই না।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




