somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি নীল খামের চিঠি আবু নোমান

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ৯:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আরমান কয়েক গ্লাস পানি খেলো। বুকটা ভিজছেই না। তীব্র না হলেও শীতের আমেজ এখনো যায়নি। তবু আরমানের কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম, মাথার চুলগুলোও ভেজা ভেজা। এইমাত্র মানুষ খুন করেছে সে। আপন চাচা কফিল সাহেবকে খুন করে লাশ মাটিতে পুঁতে এসেছে তারা। নাবিলা তাকে এভাবে খুন করতে বলেনি। খুন কীভাবে করা হবে তা নিয়ে ভাই-বোনে বেশ কিছুদিন বিতর্ক হয়েছে, কিন্তু কোনো কুল-কিনারা করতে পারেনি। চাচি বাসায় না থাকায় আরমান হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলো বন্ধু রাসেলসহ রাতেই ফায়সালা করবে। সেই মোতাবেক কাজ। এই মূহুর্তে আরমান কেমন যেন অস্বাভাবিক সব আচরণ করছে। ঘুম আসছে, অথচ ঘরময় পায়চারি করছে সে। পানি খাচ্ছে, তবু বুক ফাটা তৃষ্ণা, যেন কতোকাল পানি পান করেনি। চাচাকে আরমান অনেক চিন্তা করেই খুন করেছে। একদম পরিকল্পিত ঠাণ্ডা মাথার খুন। যদিও চাচা তাকে খুবই আদর করতেন। হত্যার পর থেকেই আরমানের মনের মধ্যে তোলপাড় করে তুলেছে। ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে হৃদয়। হত্যা না করে অন্য কিছু কি করা যেতো না?
চাচা কফিলউদ্দিন আরমান আর নাবিলাকে ছোটবেলা থেকে বড় করেছে। তাদের বাবা-মা রোড এক্সিডেন্টে মারা যাবার পর থেকেই এই চাচা তাদের বড্ড ভালোবেসে নিজের কাছে রেখেছিলেন। তাঁর নিজের দু’সন্তান থাকা সত্ত্বেও অনায়াসেই তারা চাচা-চাচির কাছে একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলো। চাচি মাঝে-মধ্যে তাঁর নিজের সন্তান এবং এদের মধ্যে একটা বিভক্তির প্রাচীর তুলতে চাইলেও চাচা এটা কখনো করেন নি। অসম্ভব ভালো এই মানুষটিকে ভাই-বোন বাবা-মার মতই দেখে আসছিলো। নিজের বাবা-মাকে খুব একটা মনে পড়ে না। যেটুকু পড়ে, তাতে কষ্টই বাড়ে। তাইতো ওরা মনে করতে চায় না। চাচা কফিলউদ্দিন ওদের সর্বক্ষণ চোখে চোখেই রাখতেন। কখনো যেন কষ্ট না পায়, মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে, বাবা-মার কথা মনে করে যেন খারাপ না লাগে সে বিষয়ে তিনি খুবই তৎপর ছিলেন। এমনিতে চুপচাপ এ চাচা কথা বলেন খুবই কম। একান্ত প্রয়োজন না হলে তিনি কারো সঙ্গেই কথা বলেন না। একা একাই অনেক কাজ করে বসেন। এমন ভালো মানুষ চাচা হঠাৎ করেই কেন এমন হলেন, আল্লাই জানে।
দরজায় খট্ শব্দ হতেই চমকে পেছনে তাকায় আরমান। নাবিলা কাঁদছে। আরমান নাবিলাকে কীভাবে বোঝাবে, সে নিজেই বুঝতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে সে কখনো পড়েনি। ধীরে ধীরে নাবিলার সামনে এসে দাঁড়ায় আরমান। ডান হাত নাবিলার কাঁধে দিতে গিয়েও টেনে নেয়। নাবিলা ফোঁপাতে থাকে। আরমান তার হাতটি এবার কাঁধে দিতেই নাবিলার ফোঁপানি বিষ্ফোরিত হয়। কেঁপে কেঁপে বলতে থাকে, এবার আমাদের কী হবে, ভাইয়া? এবার কী হবে? এর উত্তর আরমানেরও জানা নেই। কী উত্তর দেবে সে?
আরমান আর নাবিলার মনের সন্দেহটা খুব বেশি আগের নয়। বাবা-মার মৃত্যুর সময় তারা ছিলো একদম ছোট। আজ আর তেমন মনে পড়ে না। স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে ভাই-বোনের কলেজে ভর্তি পর্যন্ত সবকিছুই চাচার হাত ধরেই হয়েছে। সমস্ত চাহিদা চাচা পূরণ করতেন, না চাইতেই। আরমানের কলেজে ভর্তির সময়ও চাচা নতুন শার্ট-প্যান্ট কিনে দিয়েছেন। বাড়ি থেকে কলেজ সামান্য দূরে হওয়ায় আরমান একটি সাইকেল চেয়েছিলো, কিন্তু চাচা কিনে দিলেন একদম নতুন মোটর-সাইকেল। আরমান এজন্য এত খুশি হয়েছিলো যে, ক্লাসের সকলকে মিষ্টি খাইয়েছিলো। ক্লাসের কোনো কোনো বন্ধু বলেছিলো, আরমানের চাচা তাকে যতটা ভালোবাসে, আমাদের বাবারাও অতটা ভালোবাসে না। অবশ্য রাসেল বলেছিলো, দেখ্ বন্ধু, তোর বাবা যে সম্পদ রেখে গেছে, এত্থেকে একটি মোটর-সাইকেল, এ আর এমন কী? অনেক কিছুই দিতে পারে তোর চাচা।
রাসেলের কথাটি প্রথমে আরমানের পছন্দ হয়নি। কিন্তু একটা চিন্তার জট তার মধ্যে দানা বেঁধে উঠেছিলো সেদিন থেকেই। এরপর নাবিলা যখন কলেজে ভর্তি হলো, চাচা তখন কী এক কাজে ঢাকায়। নাবিলা ভেবেছিলো, তাকেও দামি কিছু একটা কিনে দেবেন, কিন্তু হতাশ হলো। নাবিলা বাসায় এসে চাচিকে একটা দামি থ্রি-পিসের কথা বলতেই চাচি ঝামটা মেরে উত্তর দিলেন। আমি কী বলি? তোরা তোদের চাচাকে বল। আমার কথাতো সে শোনেই না। এখন ধরেছে নতুন ধান্দা, জমি বিক্রির।
মানে? জমি কেন বিক্রি করবে চাচা!
আমি তার কি জানি? কোনো কিছুই তো আমাকে বলে না। শুনলাম, ও পাড়ার সোলেমান মিয়ার কাছে। ওরাই নাকি কিনেছে। চাচির মুখে বিরক্তি।
নাবিলা কথাটি আরমানকে বলে। আরমান রাসেলকে। আরমানের প্রিয় বন্ধু এখন রাসেল। কাজে-অকাজে, প্রায়ই সে আসে আরমানের কাছে। নাবিলাও বড় হয়েছে। লম্বা, ফর্সা কুচকানো বিশাল সাইজ কালো চুলের অধিকারিণী এই মেয়েটি দিন দিন হয়ে উঠছে আরো সুন্দরি। নাবিলার প্রতি রাসেলের যে দুর্বলতা, এই বিষয়টি চাচার দৃষ্টি এড়ায়নি। কথাটি তিনি একদিন নাবিলাকেই বলেছিলেন, মা, রাসেল ছেলেটি এখানে এত ঘুরঘুর করে কেন?
চাচার মুখের ‘ঘুরঘুর’ শব্দটি শুনে নাবিলার ভ্রু কুঞ্চিত হয়েছিল। বলেছিল, ও ভাইয়ার বন্ধু।
চাচা ভেবেছিলেন, নাবিলা এতেই সাবধান হবে। কথাটি সে আরমানকে বলতেই আরমান কেমন বিমর্ষ হয়ে পড়ে। কয়েকদিন পর আরমান নাবিলাকে গোপনে বলে, জানিস, চাচা এখন অন্যরকম হয়ে গেছে।
অন্যরকম মানে?
অন্যরকম মানে অন্যরকম। আমাদের বাবার নামের জমিগুলো বিক্রি করে টাকা ব্যাংকে জমা রাখছে। আরমান যথাসম্ভব অনুচ্চ কন্ঠে বলতে গিয়েও উচ্চ হয়ে যায়।
অ্যাঁ! নাবিলা অবিশ্বাসের চোখে তাকায় আরমানের দিকে।
হ্যাঁ। পৃথিবীতে মানুষ চেনাই মুসকিল, বুঝলি নাবিলা। জমি থাকলে তো আমাদের ভাগ আমরা পেয়ে যাবো। কিন্তু জমি বিক্রির টাকা ব্যাংকে জমা থাকলে সেগুলো তো চাচার নামে থাকবে।
নাবিলা শক্ত গলায় বললো, তোকে এগুলো কে বললো ভাইয়া?
রাসেল, রাসেল সব জানে।
নাবিলার মনে পড়ে, চাচিও তাকে জমি বিক্রির কথা একবার বলেছিলো। তাই বলে তাদের জমি? ছি-ছি ! প্রচণ্ড কান্না এসে নাবিলার কণ্ঠকে বাষ্পরুদ্ধ করে। হতাশামিশ্রিত কন্ঠে নাবিলা জিজ্ঞেস করে, এখন আমাদের কী হবে?
এখন আমাদের বাঁচতে হবে।
কীভাবে? নাবিলা আরমানের দিকে তাকায়।
আমরা চাচাকে মেরে ফেলবো।
না-না, নাবিলা আঁতকে ওঠে।
কিন্তু এটাই পথ। নইলে চাচা আমাদের সব জমি-জমা বিক্রি করে আমাদের পথের ফকির করে ছেড়ে দেবে।
নাবিলা কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই জিজ্ঞেস করে, কিভাবে মেরে ফেলবে?
আমি আর রাসেল।
রাসেল?
হ্যাঁ। কোনো অসুবিধা হবে না। ওর সঙ্গে কথা বলেই ঠিক করেছি।
না-না এ হতে পারে না। নাবিলা আবারো কাঁদতে থাকে।
চাচার দুসন্তানের স্কুল ছুটি থাকায় চাচির সঙ্গে তারাও যায় নানার বাড়ি।
আরমান রুমালে ক্লোরফরম মাখে আর রাসেল চেপে ধরে চাচার গলাটা। সবকিছুই সম্পন্ন হয় নিপুনভাবে।
খোঁজাখুঁজি শূরু হয়েছে। একমাস, দু’মাস, তিনমাস। প্রায় চারমাস পর একটি নীল খামের চিঠি এলো। ঢাকা থেকে কফিলউদ্দিন সাহেবের নামে লিখা। আরমান চিঠিটি দেখেই চমকে ওঠে। গভীর রাতে নাবিলার ঘরে গিয়ে আরমান চিঠিটি খুলে পড়তে শুরু করে।
বন্ধুবর কফিলউদ্দিন,
তোমার ভাতিজা-ভাতিজির নামে নেয়া দু’টি হাউজ বিল্ডিং-এর প্লটের জন্য আর মাত্র একটি কিস্তি বাকি। দু’টি কিস্তিতে তোমার দিতে হবে সামান্যই। আমি জানি, ওদের তুমি কতোটা ভালোবাসো। নিজেদের জমি বিক্রি করে ওদের প্লট কিনে দিচ্ছো। এ যুগে ক’ জন চাচা এমন করে? আটচল্লিশ লক্ষ টাকার মধ্যে বত্রিশ হাজার টাকা মাত্র বাকি রয়েছে। এ টাকা পরিশোধ করে তাড়াতাড়ি তাদের নামে বরাদ্দকৃত প্লটের রেজিষ্ট্রি নেয়ার জন্য তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি। কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে।
তোমার গুণমুগ্ধ বন্ধু।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটি বড়দের গল্প - ছোটরাও পড়তে পারে

লিখেছেন মুনতাসির, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৫০

বিজ্ঞানীরা তিনটা আলাদা দ্বীপে দুইজন পুরুষ আর একজন মহিলা মানুষকে এক বছরের জন্য ফেলে রেখে এসেছে। একটা দ্বীপ ব্রিটিশদের, একটা ফ্রেঞ্চদের, আর শেষটা আমাদের বাংলাদেশীদের। এক বছর পর যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:০০

সংকটে আওয়ামী লীগের কর্মীরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুবার প্রমাণ হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি থাকে তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তাদের শ্রম, ত্যাগ, জেল-জুলুম সহ্য করার মানসিকতা এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

খাজনা

লিখেছেন রাজীব নুর, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:২৯



মন! মানুষের মন! মানুষকে তছনছ করে দেয়!
কখনো সে বাঘ, কখনো সে অজগর, কখনো সে শত্রু, কখনো সে বন্ধু!
কখনো সে ঈশ্বর, কখনো সে শয়তান, কখনো সে নিয়তি!
বিদিকিচ্ছিরি কান্ড!

লম্বা টানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের ওভারব্রীজ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:০৪

বেশ অনেকদিন আগের কথা। আমি কোন এক দুর্ঘটনায় পা এ ব্যাথা পাই। হাসপাতালে ইমারজেন্সি চিকিৎসা নেই। কিন্তু সুস্থ হতে আরো অনেক দেরী। সম্ভবত চিটাগাং রোডে (নারায়ণগঞ্জ) এ রাস্তা পার হবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:১৫


ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত যখন মাইক্রোফোনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন , তখন তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের ক্লান্ত অভিমান। একটা মুসলিম দেশ, কোটি কোটি মুসলিম মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×