![]()
(ছবিঃ শিক্ষক মহোদয় পা ছুঁয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করছেন এক পাষণ্ড ম্যজিস্ট্রেটের কাছে।আমরা খুবই দুঃখিত , লজ্জিত, মর্মাহত ।আপনি আমাদের ক্ষমা করুণ স্যার। আমরা শুধু ব্লগার হিসাবেই নই, সাধারণ সচেতন নাগরিক হিসাবে , মানুষ হিসাবে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই)
একটি বহুল প্রচলিত পুরানো কৌতুক মনে পড়ে গেলো-
জনৈক ভদ্রলোক বাসে নিজের সীটে বসতে গিয়ে দেখেন একজন লোক একবোরে দুসীট দখল করে খুব আয়েশ করে বসে আছন।তিনি এবার বসে থাকা লোককে লম্বা একটা সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-
স্যার, আপনার আব্বাজান কি এই এলাকার মান্যবর চেয়ারম্যান?
না, তা হবেন কেন?
তাহলে আপনার আব্বা অথবা ভাই কি কোনো রাজনৈতিক দল করেন? অথবা দলীয় কোনো ক্যাডার?
না, আমাদের পরিবারে কেউতো কোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত না। আর ওরকম ও কেউ নেই
তাহলে কেউ কি বড় আমলা?
জ্বিনা ভাই। ওরকম কেউ নেই।
নিশ্চয়ই কেউ তাহলে পুলিশে আছেন?
না ভাই । তাও নেই।
তাহলে,অবশ্যই কেউ র্যাবে আছেন?
জ্বিনা ভাই । তাও নেই। কিন্তু, বুঝলামনা । আপনি আমাকে এসব প্রশ্ন করছেন কেন?
আরে ব্যাটা। রাখ তোর বুঝাবুঝি। আগে আমার সালাম ফেরত দে।আর পাছায় লাত্থি দেয়ার আগে দুসীটের মাঝখানে না বসে নিজের সীটে গিয়ে বস, যা ভাগ।
আসলে এটা স্রেফ একটা কৌতুক হলেও-এখানে দেশের একটি খুবই করুণ চিত্র ফুটে ওঠেছে। অর্থ্যাৎ উপরোক্ত পেশার সাথে যারা জড়িত তাদের ঘাঁটানো যাবেনা। ওরা শুধু দুসীট না পারলে পুরো দেশ দখল করে বসে থাকুক। আর নিশ্চিত হয়ে নিন। উপরোক্ত পেশার সাথে যারা জড়িত না-এরা হলো যে আমজনতা।তাদেরকে পাছায় নিশ্চিন্তে লাত্থি দেয়া যাবে। কোনো ভয় নেই।
এরকম আরেকটি মুখরোচক কৌতুক আছে-এটাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে শোনা ""মোগ বাড়ি বরিশাল মোর দাদায় চহিদার মোরা আইনের মানু মোরে চেন? "
মানে- পদবী একটা হলেই হলো। সাধু সাবধান । একেবারে তফাতে থেকো বাপু।
দেশ থেকে এবার একটু দেশের বাইরে আসি। বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার ভূমিকা, বিভিন্ন দেশে গিয়ে পুলিশিং করা ইত্যাদি দারুণ প্রশ্নবিদ্ধ। আমি সেদিকে যাচ্ছিনা। আমি শুধু এদেশের সাধারণ মানুষের একটি উদাহরণ দিচ্ছি।
সুজান নামে এক মধ্য বয়স্ক শেতাঙ্গ মহিলা আমার অধীনে কাজ করে। সবসময় খুবই হাসিখুশী, উৎফুল্ল।একদিন আমি বাইরে থেকে মধ্যাহ্ন শেষ করে এসে দেখি, বেচারী ওর অফিসে খুব মন খারাপ করে বসে আছে। আমি তাঁর পাশে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-
সুজান, আপনার মনটা কি খুব খারাপ?
হ্যাঁ। মনটা বেশ ভালো না।
কেন? কি হয়েছে?
আমার মেয়েটা না আজ সারাদিন আমাকে ফোন করেনি। তাই ওর জন্য অল্প চিন্তা করছি। আমি কয়েকবার ফোন করেও পেলাম না।
এখানে, বলে রাখি। আমাদের সাধারণ ধারণা এ দেশ বড় ছেলেমেয়েরা মা বাপের তেমন খোঁজ খবর রাখেনা। কথাটা পুরো ঠিকনা। ওর বেশ স্বাধীন। এ কথা যেমন ঠিক। আবার অনেক পরিবারে খুব সুন্দর পারিবারিক বন্ধন রয়েছে একথাটাও ঠিক।
যাইহোক, আমি দেখলাম। সুজানার ডেস্কের এক কোণে একটা ছবি। আগে কোনোদিন খেয়াল করিনি। ছবিতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আর আর্মির পোষাক পরিহিত এক মহিলা অফিসার। দেখে মনে হলো দুজন খুব আন্তরিক ভাবে কথা বলছেন।
আমার কৌতূহল বাড়লো- জিজ্ঞাসা করলাম। প্রেসিডেন্টের সাথে ইনি কে?
সুজান বললো- কেন, তুমি জানো না? ইনিতো আমার মেয়ে।
আমার কৌতূহল আরো বাড়লো। ও তাই নাকি। ছবিতে তো অন্য আর কাউকে দেখছিনা। শুধু প্রেসিডেন্ট আর আপনার মেয়ে। উনি কি আপনার মেয়েকে ব্যক্তিগতভাবে চিনেন?
হ্যাঁ। চিনবেন না কেন? ওদের তো খুবই ভালো করে চেনাজানা ।
আমি আমার রুমে ফিরলাম। চিন্তা করলাম। সুজান আমার সাথে কাজ করছে আজ কত বছর হলো? কোনোদিন বলেননি-উনার মেয়ে ইউএসআর্মির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। প্রেসিডেন্টের সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক। নিজেকে এতোটুকু জাহির করে বলেননি- দেখো, আমি অমুকের মা। আমার সাথে সাবধানে কথা বলো। সাধারণ একজন চাকুরিজীবীর মতো কাজ করেই যাচ্ছেন।
অথচ, আমাদের দেশ কারো ভাই, বাপ যদি একটা পদ পেয়েই যায়, একটা উর্দি গায়ে ওঠে, রাজনৈতিক নেতা অথবা ক্যাডার, পুলিশের সুপার অথবা সিপাহী, র্যাবের কমান্ডার অথবা সিপাই, আর্মির কর্ণেল অথবা সোলজার, বিসিএস ক্যাডার অথবা চহিদার কোনোভাবেই কোনো পদ পেয়েই যায়-ঐ এলাকায় খবর হয়ে যাবে। উনারা আসছেন-রাস্তা ক্লিয়ার করো। নাহয় খবর আছে। যার পদবি যত বড়-সে তার চেয়ে ছোট পদবির ওপর খবরদারি করবেই। উল্টোপাল্টা হলেই -চাকরি নটও হয়ে যেতে পারে।
আমার মনে পড়ে, আমার এক পরিচিত ভাই। তখন আর্মির নয়া অফিসার।
শাহবাগ এলাকায়- পুলিশ কনস্টেবল উনার মোটর সাইকেল থামিয়ে লাইসেন্স চেয়েছিলো বলে-উনি অত্যন্ত বিশ্রী ভাবে বাপের বয়সী সেই কনস্টেবলকে বলেছিলেন- "ব্লাডি, জানিস, আমি কে? আমি তোর বাপ। যা , কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।?
আমার সেই করুণ দৃশ্যটি আজো চোখ ভাসে। জানিনা,সেদিন সেই বাপের বয়সী কনস্টেবলকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে উনার ছেলেমেয়েদের কেউ দেখেছিলো কিনা? দেখলে আগে কার চোখ থেকে পানি আসতো। বাপের না কি ছেলেমেয়েদের? ভাগ্য ভালো- সে সময় সবার হাতে হাতে ক্যামেরাওয়ালা ফোন ছিলোনা।
তবে , আজকের এই ছবিটি সবাই দেখছে। সম্মানিত শিক্ষক মহোদয়ের অপরাধ উনি কেন এই ম্যাজিস্ট্রেট নামক বেয়াদবকে পরীক্ষা হলে ঢুকার আগে পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন? তাইতো, উনাকে পা ছুঁয়ে ক্ষমা প্রার্থণা করতে হচ্ছে।
আপনাদের মনে পড়ে?- আমাদের বিশ্বসেরা সুপারস্টার সাকিবের পাপন সাহেবের পা ধরে ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়ার সেই করুণ আকুতি।
আপনার ক্ষমতা আছে, আপনি পা ধরাবেন। আপনার ক্ষমতা আছে, আপনি কান ধরিয়ে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখবেন।আপনার ক্ষমতা আছে আপনি বাপের বয়সী মানুষকে চড় থাপ্পর মারবেন। কে আপনার বিচার করবে?
আপনার ক্ষমতা থাকলে আপনিতো পুরো বিচার ব্যবস্থাকেই কান ধরিয়ে পারলে দাঁড় করিয়ে রাখেন।
শাহ মুহম্মদ সগীরের একটা বিখ্যাত কবিতার লাইন-
"ওস্তাদে প্রণাম করো পিতা হন্তে বাড়
দোসর জনম দিলা তিহ সে আম্বার" ।
যিনি আজ পা ছুঁয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে যাচ্ছেন-উনি নিজেই হয়তো শত শত ম্যাজিস্ট্রেট তৈরী করেছেন। পুরো জাতি যারা তৈরি করে দেয়, যে গুরু মানুষ বানানোর কারিগর, যারা ২য় পিতা হিসাবে স্বীকৃত, সেই শিক্ষাগুরু, সেই শিক্ষাপিতা যখন মাথা নত করে পা ছুঁতে যায়- তখন এই জাতির সম্মানের , মর্যাদার, গৌরবের, অহঙ্কারের আর কিবা বাকি থাকতে পারে?
সম্মানিত শিক্ষক মহোদয় হয়তোবা মনে মনে বলছেন- হে ধরণী তুমি একটু ফাঁক হও, এই পাষণ্ডের পা স্পর্শ করার আগেই যেন আমি তোমার মাঝে ঢুকে যেতে পারি। আবার হয়তো বা চোখে ভাসছে- বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী, ছোট, ছোট সন্তান-এরা সবাই যে বড় বিপদে পড়ে যাবে। সম্মান দিয়ে ওতো কি হবে?
শুধু পা কেন, যদি জুতো পরিষ্কার করে দিতে বলে তাও যে করতে হবে।পা স্পর্শ করছি, সবাই দেখলে দেখুক। কিন্তু আমার চোখের জল যেন কেউ দেখতে না পায় প্রভু। তার চেয়ে বরং চোখের জল মাটিতে পড়ার আগেই আমি যেন দ্রুত ক্ষমার কাজটা শেষ করে ফেলি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


