somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নভেরা আর নেই

০৭ ই মে, ২০১৫ ভোর ৬:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
রহস্যময়ী নভেরা আর নেই


পৃথিবীর শেষ অপরাহ্ণ শেষ করে আজ আপনি পরবাসের মাটিতে চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন?জন্ম যেমন আপনার রহস্য ঘেরা ছিলো-মৃত্যুতেও তেমনি আপনি রহস্য রেখে গেলেন। আমরা জানলামনা কিছুই। আর আপনি ও কোনোদিন জানলেন না- হাসনাত আব্দুল হাইয়ের উপন্যাস পড়ে -প্রথম আপনার সম্পর্কে জেনে একটি কিশোর ছেলে নীরবে বুকের ভিতর আপনার জন্য অঝোরে কেঁদেছিলো।

আপনার সম্পর্কে আমি পড়লেই বারবার আমার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। জানতে পারলামনা, আর পারবোও না কোনোদিন কেন এতো ব্যথা ভরা অভিমান বুকে নিয়ে আপনি এই দেশ ছেড়ে চলে গেলেন?

যে আপনি শহীদ মিনারের ভীত হৃদয়ের বিশুদ্ধ স্নেহের পরশে গড়েছিলেন-জানিনা আপনার কবরে একটি ফুলের পাঁপড়িও পরবে কিনা। আপনি রয়ে গেলে নীরবে, নিভৃতে, অভিমানে , বড় গোপনে।
আজ আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিলো। জিজ্ঞাসা করলাম,
নভেরাকে চিনিস? বললো- না সে কে?
ফোনটা রেখে দিলাম, কথা বলতে পারলামনা।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে তাজা প্রাণ ঝরে গেলো ভাষার দাবীতে। বাংলা মায়ের সেই বীরসেনানীদের আপনি এদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত করে গেলেন শহীদ মিনারের মাধ্যমে । সেই শহীদ মিনারের প্রসুতি , ভাস্কর্যের নিপুন কারিগর- নভেরাকে আজ অনেকেই চিনেনা। অনেকেই নামও শুনেনি।

বড়ই রহস্যঘেরা আপনার জীবন। কেউ বলে আপনি চট্টগ্রামের মেয়ে, কেউ বলে সুন্দরবনের। জন্ম ১৯৩০,১৯৩৫ নাকি ১৯৩৯ সাল। তাও সঠিক জানিনা। আন্তর্জালের পাতা চষে সঠিক কোন জীবন বৃত্তান্তই পেলাম না। কেউ বলে আপনি ১৯৮৯ সালে মারা গেছেন, কেউ বলে ২০০৩ সালেই আপনি চির বিদায় নিয়েছেন। সবই মিথ্যা। সবচেয়ে সত্যি হলো- আজই আপনি চলে গেলেন বড় নীরবে, নিভৃতে এই পৃথিবী ছেড়ে।

কেন এতো বড় একজন গুনী শিল্পীর কদর এ দেশে হলোনা???
বাবা, বড় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন।১৪ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে চাইলেন-আপনাকে স্বাভাবিক সংসারে চার দেয়ালের ভিতর রেখে দিতে।কিন্তু আপনি যে সারা পৃথিবীর। যার জন্মই হয়েছে মুক্ত বিহগের মতো পৃথিবীর আকাশে ঘুরে বেড়াতে।

আপনি যেন গাইলেন-
মানুষ দেখুক এক ভাস্কর নারীর আলগা খোঁপার ফাঁস,
মুখে তার নাই আহা গোধুলির নরম কোনো আভাস।

এক অতিন্দ্রীয় নিপুন শিল্পীর ভাস্করের মায়াবি হাত নিয়ে আপনি ভাস্কর শিল্পের ফেরি করে বেড়ালেন ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স হয়ে গ্রীসে। চষে বেড়ালেন- বার্মা, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, লাউস, জাপান, হংকং, নেপাল ,মালেশিয়া ,ইন্দোনেশিয়া। পুরা ভারতীয় উপমহাদেশে ভাস্কর্য শিল্পী হিসাবে প্রথম হয়ে আপনি প্রেসিডেন্ট পদক পেলেন।মুম্বাই থেকে শিখলেন ক্লাসিক ভারতনট্যম নৃত্য। তারপর---চলে গেলেন পরবাসে।
আর পাথরের তৈরী ভাস্করের মতো আপনিও বধির হয়ে গেলেন। কেনো আপনার এতো দুঃখ?কেনো এ দেশের প্রতি এতো অভিমান !

শুনেছি-- এ দেশ ছাড়লেও বড় বেশী গোপন ভালোবাসা ছিলো এ দেশের মাটির প্রতি।তাইতো জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এ দেশের পাসপোর্টটি আকড়ে ধরেছিলেন।ফ্রান্সের নাগরিকত্ব ফিরে দিয়েছেন। আবার, মহান একুশে পদকও আপনি চিনেবাদামের খোসার মতো তুচ্ছ করে ছুড়ে ফেলেছেন। তখনই সরকারের বুঝা উচিত ছিলো- আপনার অভিমান ভাঙানোর। পুরা ভারতবর্ষে ভাস্কর্য শিল্পের যে বিপ্লব আপনি ঘটিয়ে গেলেন-তাঁর মনে কেনো এতো হাহাকার.....কেন তাঁর এতো অভিমান?

রশীদ আমিনের একটা মন্তব্য তুলে ধরছিঃ
Breaking news-এর মতো breaking post !!!
আমাদের দেশে যারা প্রকৃত গুণী শিল্পী তারা পর্দার অন্তরালে হারিয়ে যান । প্রকৃত গুণী শিল্পীদের একটা অহংবোধ থাকে, আমাদের মতো সমাজে এই সব শিল্পীর অহংবোধ প্রতিনিয়ত আঘাত প্রাপ্ত হয়। আমরা তো শুধু ভাগ্যক্রমে এক নভেরাকে বিস্মৃতির অতল থেকে খুঁজে পেয়েছি, কে জানে হয়তো আরো অনেক নভেরাই উলটে যাওয়া বইয়ের পাতার মতো হারিয়ে গেছে ইতিহাসের আঁধারে। "

তাদের কীর্তির উপর জমে যাওয়া আবর্জনাগুলো যদি কোনো ঝড়ো বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়, তবে হয়তো বেরিয়ে আসতে পারে নতুন কোনো নভেরা, আমরা যেন সেই সময়েরই প্রতীক্ষায় থাকি।

একসময় নাকি আপনি আর বাংলা ভাষাও বলতেন না।ফ্রান্সের বাংলা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ইংরেজীতে বলেছিলেন- আপনি বাংলা বুঝেন না।কত বড় বেদনা, কত বড় অভিমানে আপনি বলেছিলেন-বাংলা ভাষা বুঝেন না। যে ভাষার শহীদ মিনার সারা পৃথিবীতেই যার কোনো তুলনা নাই। সেই মিনারের প্রসুতি আপনি আর আপনি বাংলা ভাষা বুঝবেন না, তাই কি হয়?

জীর্ন শীর্ন শরীর নিয়ে দূতাবাসে প্রিয় জন্মভূমির পাসপোর্ট নবায়ন করতে এসেছিলেন। সেই নাকি এ দেশের কোনো বাংগালির সাথে আপনার শেষ দেখা। তারপর আপনি চিরতরে হারিয়ে গেলেন।

গুগলে অনেক ঘাটাঘাটি করে ফ্রেন্চ ভাষায় নভেরা আহমেদের খুবই সংক্ষিপ্ত একটি বৃত্তান্ত পাওয়া যায়, তাও আবার ১৯৭২ সাল পর্যন্ত।

জন্ম -২৯ শে মার্চ, ১৯৩৯ সাল। সুন্দরবান, বাংলাদেশ।
১৯৫১ সালঃ লন্ডনে আগমন।
১৯৫২ সালঃ Jacob Epstein এর শিক্ষার্থী হিসাবে ভাস্কর্যে ডিগ্রী লাভ।
১৯৫৫-১৯৫৬ : Florence Academy of Fine Arts শিক্ষাগ্রহণ।
১৯৫৭ : তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে বর্তমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন। জাতীয় গ্রন্থাগার কর্তৃক আয়োজিত প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদশণী।
১৯৫৭ সালঃ ২য় বারের মতো শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু।
১৯৫৮ সাল: জান্তা আয়ুব খানের কর্তৃক সামরিক শাসন জারি। শহীদ মিনারের কাজ অসমাপ্ত।
১৯৫৯ সাল: বার্মায় গমন
১৯৬০ সালঃ এশিয়া ফাউন্ডেশানের সহযোগিতায়, জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় ৭৫ টি ভাস্কর্যের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনি।
১৯৬১ সালঃ লাহোরে প্রথম প্রেসিডেন্ট পদক জয়লাভ।
১৯৬১ সালঃ মুম্বাই ভারত নট্যম নৃত্য শিক্ষার শুরু এবং সমাপ্তি।
১৯৬২ সালঃ ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং এ প্রদর্শনী।
১৯৬৩ সাল : প্যারিস আগমন। Caesar এবং Giacomett এর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন।
১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সালঃ জাপান, কম্বোডিয়া, লাউস, নেপাল, হংকং , মালেশিয়া, থাইল্যান্ডে ভ্রমণ এবং প্রদর্শনী।
১৯৭১ সালঃ ফ্রান্স প্রত্যাবর্তন
১৯৭২ সালঃ গ্রীস গমন

৫ই মে, ২০১৫ সালঃ চিরবিদায়।

নভেরার জন্য সরকার, প্রত্নতাত্তিক দপ্তর, ফ্রান্স দূতাবাস যা করতে পারেঃ
১) নভেরার একটা পরিপূর্ণ জীবন লিপি তৈরী করা।
২) উইকিপিডিয়াতে সংযোজন করা- বাংলা এবং ইংরেজীতে।
৩) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে নভেরা সম্পর্কে একটি পাঠ অন্তর্ভূক্ত করা। অনেক হাবিজাবিই তো বইয়ে পড়ানো হয়। একটা কিছু বাদ দিয়ে অথবা না দিয়ে এটা করলে কোনো সমস্যা হবেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ করেও কেউ নভেরা সম্পর্কে জানবেনা, তা বড়ই দুঃখজনক।
৪)-প্রতি ভাষা দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন করা। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের এ কাজটুকু করতে আশাকরি সম্মানের হানি হবেনা।
৫) নভেরার ভাস্কর্য গুলো সংরক্ষণ করা।
৬)জাতীয় যাদুঘরে নভেরার জন্য আলাদা গ্যালারি খোলা।

পৃথিবীর যেখানেই ঘুমিয়ে থাকুন আপনার আত্মা চির শান্তিতে থাকুক।
" কত ফাগুনের আগুন ঝরানো স্মরণের প্রান্তরে
শহীদ মিনার সোপানে তোমার রক্তিম ফুল ঝরে"( কবিতার এ লাইনদুটো শবনম মুশতারি আপার স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত)


১৯টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×