১) এক কবিরাজ ছিলেন। বনের লতা-পাতা,শেকড় ইত্যাদি নিয়ে উনি নানা রোগের অত্যন্ত কার্যকরী, ফলপ্রসু চিকিৎসা করতেন। নাম,যশ, খ্যাতি ছিলো খুব। জানিনা এখন উনি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন। উনি বাংলা ভাষা বলতে পারতেন না। এক দুর্বোধ্য পাহাড়ী আন্চলিক ভাষায় উনি কথা বলতেন। যেহেতু উনার রোগী ছিলো বাঙ্গালীরা। তাই নিজেদের প্রয়োজনে অনেক বাঙ্গালীরাও উনার ভাষা রপ্ত করেছিলো।
২) জাপানি, জার্মানী,ইতালীয়দের দেখেছি ওরা ভুল করেও ইংরেজী বলেনা। বোমা মারলেও মুখ থেকে এ,বি,সি,ডি বের হবেনা। একবার সরাসরি জাপানী-আমেরিকান এক অধ্যাপকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম । উনি বলেছিলেন- প্রয়োজনে মানুষ ভাষা শিখে। আমাদের ইংরেজি জানার দরকার নাই। কিন্তু ওদের জাপানী ভাষা জানা দরকার।কেউ স্বীকার করুক আর না করুক তবে এটা সত্য, বর্তমান বিশ্বে প্রতিটি জিনিসই অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত। জাপানী অটো গাড়ি আর ইলেকট্রনিকস পুরো বিশ্ববাজার দখল করে আছে। পৃথিবীর এমন কোনো জাপানি পণ্যের ম্যানুয়েল পাওয়া যাবেনা -যেখানে জাপানী ভাষা লেখা নেই। হয়তো ইংরেজি লেখা আছে কিন্তু জাপানী ভাষাটা থাকা বাধ্যতামূলক।
৩) আমেরিকার বাংলা দোকানগুলোতে কিছু সবজিপ্যাকেট পাওয়া যায়। সেই প্যাকেটগুলোতে খুব সুন্দর করে বাংলাভাষা লেখা আছে। পাশাপাশি ইংরেজি লেখা। পণ্যগুলো শুধু বাংলাভাষী ভোক্তার মাঝেই সীমাবদ্ধ। তাই প্যাকেটে লেখা বাংলা অক্ষরগুলো কোনো গ্লোবাল নাগরিকের ঘর পর্যন্ত যায়নি। যেমন -জাপানী বর্ণমালা খুঁজলে আমাদের ঘরের এদিক ওদিকে সনি টেলিভিশান কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের প্যাকেটে খোদাই করা পাওয়া যাবে।
৪) আমাদের চিঙড়ী মাছ আর গার্মেন্টস আন্তর্জাতিক বিশ্ব জয় করার দারুন একটা সুযোগ ছিলো। চিংড়ীর বাজার যখন বিশ্ব রমরমা ঠিক তখনই পাওয়া গেলো চিংড়ীর ভিতর লোহা -লক্কড়। ফলে চিংড়ী বাংলার খালে আর নদীতে আটকা পড়ে রইলো- আটলান্টিক আর প্রশান্ত পার হতে পারলোনা। গার্মেন্টেসে ভিতর চলছে নানা কূটকৌশল। বড় বড় চেইনস্টোরগুলোতে যখন বাংলা পোষাকের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো- সেখানে আজ ভারতীয় আর পাকিস্তানী গার্মেন্টস। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারলে তো ছিটকে পড়তেই হবে। পৃথিবীর বিশ্ববাজার মামা বাড়ি নয় যে আদর করে মামী ভাগিনার মুখে মোয়া তোলে দিবে। অন্ততঃ এ দুটো পণ্যের মাধ্যমে শুধু আর্থিক সমৃদ্ধি না বাংলা ভাষাও বিশ্ব ছড়িয়ে যেতে পারতো।
৫) কিছুদিন পরপর দেখা যায়- দেশের দারুণ সম্ভাবনাময় তরুনেরা পানি দিয়ে গাড়ী চালাচ্ছে, প্লাস্টিক দিয়ে উড়োজাহাজ বানিয়েছে,
পানিতে ডুব দিয়ে একমাস পানির নীচে দিনরাত পার করছে। সাবমেরিন আবিষ্কার করেই ফেলছে। এগুলো এখন সারা দুনিয়া মাত করবে। শুধু অনলাইন উদ্ভট পত্রিকায় না এসব খবর জাতীয় পত্রিকায়ও আসে। তাছাড়া বাংলার আকাশে ড্রোন ওড়াওড়ি করবে-এরকম খবরও আসে। এসবতো দারুণ সুখবর। সবাইকে সবার কাজের জন্য উৎসাহ দেয়া দরকার।উৎসাহ, অনুপ্রেরণা না পেলে তরুনরা সামনে এগিয়ে যাবে কেমন করে? কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, বাঁশের বন্দুক দিয়ে পটাশের গুলি ভরে রকেট বলা যেমন ঠিক না- ঠিক তেমনি আকাশে ঘুড়ি ওড়িয়ে স্পেসস্ট্যাশান বানিয়ে ফেলেছি-এরকম বলাও ঠিক না। এসব উৎসাহের পরিবর্তে স্রেফ আত্মঘাতি।
৬) ওপরে কয়েকটি কথা বললাম- আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে। সব জায়গায় বাংলা ভাষাকে চালু করতে হবে-এ কথা যেমন ঠিক। তেমনি ঠিক ইংরেজী শিখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। জাপানি, জার্মান, ইতালীয়দের মতো যেকোনো একটা কিছু দিয়ে বিশ্ববাজার দখল না করা পর্যন্ত আমাদের ইংরেজী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতেই হবে। আরেকটি ছোট উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি বুঝা যাবে। একি সময়ে ভারতীয় যে ছেলেটি আমেরিকা আসে ওর ইংরেজী জানার জন্য সে ছেলেটি সামনে এগিয়ে যায়। আর বাংলাদেশী ছেলেটি পিছিয়ে পড়ে।
৭) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বাংলা , হিন্দি না। কিন্তু এই হিন্দী ভাষা শুধু বাংলাদেশ, আমেরিকা, ইউরোপে না আফ্রিকার প্রতিটি দেশেও এই ভাষার বিস্তার। বিশ্বের আইটি, ডাক্তারী একচেটিয়া ওদের আর ছবির জগত হলিউডের পরেই বলতে গেলে ওদের স্থান।তাই,শুধু আবেগ আর চেতনা ভাষা দিবসে শহীদ মিনারে সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফুলের মালায় বন্দি করে রাখলে হবেনা। এই ভাষাকে যদি সত্যিকারের ভালোবাসেন তবে ভাষা যেন মানুষের জীবনে প্রয়োজনী অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
শহীদ ভাষা দিবসে অমর শহীদের প্রতি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। বাংলাভাষা অমর হোক।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



