somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তিনশত তম পোস্টঃ রবিবারের ছোটগল্প- অলৌকিক ক্যামেলিয়া

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ৭:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক্যামেলিয়া হাসপাতালের জানালা দিয়ে অশ্রুবিঁদু চোখে চেয়ে আছে বাইরের দিকে। মন দিয়ে ও কিছু একটা গুনে। তারপর খুব কষ্টে ডায়েরীর পাতা খুলে লিখে ৭। ডাক্তাররা প্রতিদিন ওর সাথে মিথ্যা কথা বলেন। দেহে যার মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে ডাক্তারদের মিথ্যা কথায় সে কি আর কোনোদিন বেঁচে ওঠবে। দিন যায়। ধীরে ধীরে মৃত্যু ওর কাছে আসে।ওর ডায়েরীতে আর কোনো কিছু লেখা নেই। শুধু অঙ্কের সংখ্যাগুলো ছাড়া। কয়েকদিন আগে লেখা ছিলো ১৫। তারপর হলো ১২।জানালার বাইরে ওর মতো একটা রুগ্ন ক্যামেলিয়া গাছ আছে। প্রতিদিন গাছটি থেকে একটা, দুটো পাতা ঝরে যায়। ঝরে পড়া পাতার পর গাছে বেঁচে থাকা পাতাগুলোই হলো ওর জীবনের শেষ দিন। গাছে আজ মাত্র ৭ টি পাতা কোনো রকমে ঠিকে আছে। ক্যামেলিয়া ভালো করেই জানে -বিধাতা মানুষ আর এই গাছের জীবনকে একসাথে বেঁধে দিয়েছেন। তা না হলে- ওর জানালার বাইরে ওর নামের সাথে মিলে যায় এরকম রুগ্ন একটা ক্যামেলিয়া গাছ থাকবেই বা কেন? আর গাছটি থেকে প্রতিদিন এভাবেই পাতাগুলো ঝরে যাবেই বা কেন?

শুধু ডাক্তাররা না ক্যামেলিয়াকে যারা হাসপাতালে দেখতে আসে-তারাও এ ঘটনাটি জানে। ওর মাথায় হাত রেখে শান্ত্বনা দিয়ে বলে- এ তোমার মিছে বাড়াবাড়ি। গাছের পাতার সাথে মানুষের জীবনের কি সম্পর্ক! এরকম কোনো কিছুই হতে পারেনা। ওরা জোর করে জানালা বন্ধ করে রাখে। ডাক্তাররা বলেন- ক্যামেলিয়ার আসনটিই অন্য জায়গায় বদলে নিতে। যেখান থেকে জানালার বাইরে যেন আর কোনো গাছই দেখা না যায়। কিন্তু ক্যামেলিয়া বলে- না। তোমরা এ নির্মম আচরণটুকু আমার সাথে করোনা। আমার জীবনের অন্তিম সময়গুলো এই জানালার পাশেই আমাকে থাকতে দাও। একজন মৃতপথযাত্রী মানুষের শেষ ইচ্ছেটুকুকে তোমরা সম্মান করো।

গাছের পাতা ঝরা আর মানুষের বেঁচে থাকার সম্পর্ক যেহেতু কেবলি মিছে একটা অলীক ব্যাপার। তাই ডাক্তাররাও আর এ ব্যাপারটা নিয়ে কোনো আগ্রহবোধ করেন না।

রাসেলের শরীরটাও কয়েকদিন থেকে খুব ভালোনা। তারপরও রাস্তায় হেঁটে হেঁটে আঁকা ছবিগুলো বিক্রি করার চেষ্টা করে। কোনোদিন সারাদিন পার হয়ে যায়। একটা ছবিও বিক্রি হয়না। রাসেল ভালো করেই জানে- ওর ছবিগুলোর কোনো মূল্য নেই এই অভিজাত সমাজে। কেউ দয়া করে যদি একটা ছবি কিনে নেয়-সেদিন ওর খাবারের কষ্ট দূর হওয়ার চেয়ে নিজের আঁকা ছবি বিক্রির আনন্দেই ও বারবার শিহরিত হয়। একটা ভবঘুরে অখ্যাত ছবি আঁকিয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ক্যামিলিয়াকে তার ভালোবাসার কথা কেমন করে বলবে। তাই সে কোনোদিন তার সামনেও যায়নি। সাহস করে তার গোপন প্রেমের কথাও বলেনি।এখন শুধু মাঝে মাঝে হাসপাতালে গিয়ে চুরি করে ক্যামিলিয়াকে দেখে আসে। তবে রাসেল একটা কথা খুব ভালো করেই জানে। ওর কোনো ছবির আজ কোনো কদর নেই। কিন্তু ও মৃত্যর পর ওর আঁকা ছবি একদিন পুরো পৃথিবীতে বিখ্যাত হবে। এমনকি গল্পকাররা ওর আঁকা ছবি নিয়ে চমৎকার সব গল্প লিখবেন। ও সত্যিই একদিন নামকরা ছবিয়াল হবে।

গতরাতে প্রচন্ড ঝড়, বৃষ্টি আর তুফান হয়েছে। হাসপাতালের জানালার ভিতর দিয়ে বিদ্যুতের চমকে ঘুমন্ত ক্যামেলিয়া বারবার জেগে ওঠে। প্রচন্ড দমকা বাতাসে জানালার কবাট জোরে জোরে বন্ধ হয়েছে কতবার। ও অনেক কষ্টে জানালার পাশে গিয়ে এবার জানালাটা খুলে। ভয়ে ভয়ে রুগ্ন গাছটির দিকে তাকায়। গতরাতের প্রকাণ্ড ঝড়ে নিশ্চয়ই গাছে আর কোনো পাতা থাকার কথা না। কিন্তু এ যেন বিশ্বাস হয়না- গাছে কী সুন্দর একটি অলৌকিক পাতা দোল খাচ্ছে। জীবনের অন্ধকার ভেদ করে চাঁদের ম্রীয়মান আলোয় দেখা যায় মরা গাছের ডালে একটা পাতা প্রাণের স্পন্দন হয়ে লেগে আছে।মনের ভিতর যেন ছোট একটু আশার কুঁড়ি জেগে ওঠে। সারাটাদিন ওর খুব ভালো যায়। তবে কি ও নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছে আবার। এ যেন বিশ্বাসই হয়না।

পাতাটির দিকে চেয়ে চেয়ে তার সারাটি দিন যায়। একসময় রাত হয়। গভীর রাতে ওর প্রার্থনা আরো গভীরতর হতে থাকে। পরদিন সূর্য্য ওঠার সাথে সাথেই আবার জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। গতরাতেও বেশ ঝড়, বৃষ্টি হলো। আজ নিশ্চয়ই গাছটির শেষ পাতাটি ঝরে যাবে। জীবনের তবে এই শেষক্ষণ আজ। ও জানালা খুলে অবাক হয়ে দেখে- গতকালের পাতার সাথে আজ আরেকটা নতুন পাতার কুঁড়ি। এমন সুন্দর দৃশ্য যেন এই পৃথিবীতে আর একটাও নেই।

এভাবেই প্রতিদিন যায়। একটা, দুটো নতুন পাতা গাছে জন্মাতে থাকে। ক্যামিলিয়া একদিন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে। তারপর, আজ কতদিন হলো। কত মাস গেলো। একদিন দুতলার জানালায় চেয়ে আছে পথের দিকে। চেয়ে থাকতে থাকতে ওর মনটা যেন কেমন বিষণ্ন হয়। সেই নাম না জানা ছবিওয়ালা ছেলেটাকে আর রাস্তায় দেখা যায়না। ছেলেটি ওর বাড়ীর পথ ধরে হেঁটে যেতো । পথে যেতে যেতে অপলক চেয়ে থাকতো ওর জানালার দিকে । আর দৈবাত চোখাচোখি হলে লজ্জায় নামিয়ে নিতো চোখ।

কাজের ছেলেকে ডেকে ক্যামিলিয়া জিজ্ঞাসা করে- আচ্ছা , তুই কি জানিস ? সেই ছেলেটিকে । যে এই পথ ধরে রোজ ছবি ফেরী করে বেড়াতো।

কাজের ছেলেটি বলে- ও ঐ ছবি পাগল আঁকিয়ে ছেলেটা। সেতো তুমি যে হাসপাতালে ছিলে তার বাইরে এক মরা গাছে রাত গভীর হলেই ছবি আঁকতো। প্রচণ্ড বাতাসে প্রদীপ নিভে গেলে চাঁদের আলোতেই চলতো তার সারা রাত জেগে আঁকা। যখন ভোরের আলো ফোটতো ঠিক তখন সে বড় ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরতো । সে এক অদ্ভূত ছবি আঁকিয়ে। রাতের পর রাত গাছে পাতা আর কুঁড়ি এঁকে মরা গাছটিকেই জীবন্ত করে তোলেছিলো। তারপর শুনলাম কোন এক রাতে ছবি আঁকতে আঁকতেই ছেলেটি সেই গাছের নীচেই মারা গেলো। আপু,তুমি যাবে সেই ক্যামিলিয়া গাছটি দেখতে?

- আরিফ মাহমুদ
আটলান্টা, জর্জিয়া।
০২/২৭/২০১৬
(ও হেনরির গল্পের ছায়া অবলম্বনে লেখা)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সকাল ৭:৩১
২০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০১৮ সালের পর ঢাকাতেই ৪টা এক্সপ্রেসওয়ে

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৫৩



একটা দেশের উন্নয়ন কতটা এগিয়েছে, সেটা বোঝার অনেকগুলো উপায় আছে। তবে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই দেশের রাস্তা, সেতু আর যোগাযোগব্যবস্থা। কারণ এগুলোর পরিবর্তন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪



শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দায় কার?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭


সংক্ষিপ্ত রায় সবচেয়ে বড় দায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির। এর মধ্যে ২০০৯–২০২৪ সময়কালের সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×