somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

খোরশেদ খোকন
আমার জন্ম টাঙ্গাইলের হামজানি গ্রামে। শৈশব, কৈশোরে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে ছিলাম; বাবার সরকারী চাকুরীর জন্যে। কলেজ ছিল টাঙ্গাইল জেলায়। তারপর পড়াশুনা ঢাবি'র ফিন্যান্স বিভাগ। গত নয় বছর যাবত প্রাইভেট ব্যাংকে কর্মজীবন চলছে। www.facebook.com/khokonz

আত্মকথা-৪: আমার দাদার বাড়ীর কিছু স্মৃতি...

১২ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার জন্ম আশির দশকে টাঙ্গাইলের কালিহাতি থানার দুর্গাপুর ইউনিয়নের কদিম-হামজানি গ্রামে। আমার গ্রামের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা নদীর শাখা নদী। মুল যমুনা নদীটা আমার গ্রাম থেকে ছয় কিলোমিটার দুরে। বাড়ির আঙিনায় পুকুর ঘাট। পুকুর পাড়ে দাদা দাদির হাতে লাগানো স্বদেশি নানান ফলের গাছ। বাড়ির সীমানার পেরলেই সমতল কৃষি জমি। গ্রীষ্মকালে, চাঁদের আলোয় ভরা রাতে আমি আর দাদা আমাদের ঘরের বারান্দায় ঘুমাতাম। দাদা আমাকে নবীদের কাহিনী শুনাতেন। একদিন শুনিয়েছিলেন হাতেম তাইয়ের কথা।

আমার দাদা শিক্ষিত ছিলেন না। দাদার পেশা ছিল কৃষি কাজ। সকালে দাদা গরু নিয়ে কৃষি কাজ করতে মাঠে যেতেন। আমি দাদার সাথে শৈশবে কৃষি কাজ দেখতে মাঠে যেতাম। মনেপড়ে, একদিন জোর করে গরু দিয়ে জমি হাল দেয়ার মইয়ে চড়ে ছিলাম। তারপর যথারীতি, মই থেকে পড়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম। তখন আমাদের একমাত্র ঔষধ ছিল দূর্বা ঘাসের রস। দাদা আমাকে মন্ত্র পড়ে দূর্বা ঘাসের রস পায়ে মেখে, ঝাড়-ফুঁক দিয়েছিলেন। আমার ব্যথা চলে গিয়েছিল।

দাদা তার চাকু দিয়ে আখ টুকরো টুকরো করে কেটে দিতেন, আর আমি ক্ষেতের আলে বসে আখের রস খেতাম। ঘাস ফড়িং আর প্রজাপতির পেছনে ঘুরতাম। একদিন আমি, দাদাকে আকাশে উড়তে থাকা ঘুড়ি দেখিয়েছিলাম। তারপর, দাদা আমাকে কাগজের ঘুড়ি বানিয়ে সেই ঘুড়ি উড়াতে শিখিয়েছিলেন।

আমার জীবনে প্রথম শুনা গান হচ্ছে, লালন ফকিরের “খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়…”। এই গানটি আমার দাদা প্রায়ই জমি চাষ করতে করতে গাইতেন, আমি বুঝতাম না এই গানটার কি মানে…, এই গানটার মানে আমি এখনও বুঝিনা…! আমার দাদাকে আমি সমসময় তুমি করে বলতাম। যদিও আজ তাকে আপনি বলতেই ভাল লাগছে…

আমার জন্ম গ্রামে হলেও আমি থাকতাম টাঙ্গাইল শহরে। স্কুলের পড়াশুনার জন্য শহরে থাকতে হতো। আমার মন সবসময় পড়ে থাকতো গ্রামে, দাদার বাড়ির মাঠ, আকাশ, পাখি, গাছ, পুকুর আর নদীতে।

স্কুলের ছুটিতে আমরা গ্রামে যেতাম নৌকায় চড়ে। সে সময় যন্ত্র চালিত নৌকা ছিলনা। বৈঠা চালিত নৌকায় টাঙ্গাইল থেকে গ্রামের বাড়ি যেতে অনেক সময় লাগতো। মাঝে মাঝে নৌকাটাতে রশি বেঁধে দুই/তিন জন লোক টেনে নিয়ে যেতো। ঘাটে ঘাটে নৌকা ভেড়ানো হতো, লোকজন এক ঘাট থেকে উঠে অন্য ঘাটে নামত। এক ঘাটের লোক অন্য ঘাটের লোকের সাথে কুশল বিনিময় করতো। আমার ভীষণ ভাল লাগতো।

আমার দাদার বাড়ির ঘাটে নৌকা ভেড়ানো হলে আমার একমাত্র ফুপু আর ছোট চাচা এসে আমাকে কোলে তুলে বাড়িতে নিয়ে যেতো। দাদি বাড়ির আঙিনা থেকে আমাদের পথের দিকে চেয়ে থাকতো।

আমার বাবা, আমাদের ভাই বোনদের নদীতে নামতে নিষেধ করেছিল। তাই দুপুরে একপাল ছেলে মেয়ের সাথে পুকুরে গোছল করতাম। আম গাছের ডাল থেকে লাফিয়ে পড়তাম পুকুরের জলে। পুকুরের জলে জবা ফুলের হালকা লাল আর সাদা ফুলেরা ঝুলে পড়ত…

আমার জীবনের প্রথম কষ্টের স্মৃতিটা আজও ভীষণ মনে পড়ে। আমি মানুষের মৃত্যু এবং মৃত্যুর পর যেভাবে কবর দেয়া হয়, সেটা জানতাম না। আশি

একদিন আশি (৮০) বছর বয়সে আমার দাদার মৃত্যু হল। আমি সেদিন গ্রামের বাড়িতেই ছিলাম। গ্রামের ছেলে-বুড়ো সব বয়সের লোকজন আমাদের বাড়িতে এলো। আশেপাশের গ্রামে আমাদের যতো আত্মীয়-স্বজন ছিল, তারাও এলো। বাড়িতে বাচ্চারা আর মহিলারা একটানা কান্নাকাটি করতে থাকল। গ্রামের লোকজন দাদাকে গোছল করিয়ে নতুন সাদা কাপড় পড়াল। আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে সব ধর্মীয়/সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা দেখলাম। তারপর তারা দাদার ইচ্ছে অনুযায়ী তার প্রিয় জমিতে (যে জমিতে তিনি কৃষি-কাজ করে জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন)। সে জমিতে কবর দেয়া শুরু হল।

সবাই দাদাকে কবরে নামিয়ে মুঠো মুঠো মাটি দিতে লাগলো। আমি দাদার কবরে মাটি দেয়া মানতে পারলাম না, সবাইকে থামতে বললাম। ফুপু, চাচাকে বললাম তোমরা লোকদের থামাও দাদা কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনল না।

দাদার মৃত্যুর পর আমি কাঁদি নাই। কিন্তু যখন আমি দেখলাম কেউ আমার কথা শুনল না।
আমি কাঁদতে লাগলাম…এক সময় মাটিতে গড়া গড়ি দিলাম…

আমি আমার দাদার কবরে মাটি দেই নাই…
আমি আমার দাদার কবরে কি করে মাটি দিবো!?
আমার দাদাতো আমাকে কোনদিন কাউকে কষ্ট দিতে শিখায় নাই…!
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের শাহেদ জামাল- ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৮



মাঝে মাঝে খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার সহজ ভাবে ঘটে যায়।
এই যে আমি শাহেদ। শাহেদ জামাল। রমিজ উদ্দীনের ছেলে। আমাকে একটা ঘরে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। ছোট ঘর। ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২



শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৫




১৯৯৭ সাল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।

সেই সময় অডিও ক্যাসেটের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×