ধানের খড়, পাটের খড়ি আর গাছের মরা ডাল জ্বালিয়ে আগুনের উত্তাপ হাতে-পায়ে মেখে শুকনো মুড়ি আর খেজুরের গুড় আয়েশ করে খাচ্ছিল নাফিস; এমন সময় পাশের গ্রামের রসুল চাচা তার বাড়ীর সামনে দিয়ে যাচ্ছিল ক্ষেতে নিড়ানী দিতে। তাকে দেখে দাড়ালো তারপর বলল, কি বাবাজি কেমুন আছো?
.
নাফিস বলল, জি চাচা; আস-সালামুওয়ালাইকুম...। ভাল আছি।
রসুল চাচাঃ তা, বাবাজী তোমার বাবায় কেমুন আছে?
নাফিস বলল, জি চাচা, বাবা ভালই আছে। আপনে?
রসুল চাচাঃ আমি ভালাই আছি। তা, খবর কিছু শুনছো! বিকালে গেরামে নাকি একটা সালিশ হইবো?
নাফিস বলল, জি না, চাচা। আমি কিছু শুনি নাই।
তারপর রসুল চাচার সালিশের গল্প এগিয়ে চলল...গল্পটি এমন...
.
দুই মাসে আগে এই পাড়ার হারিস মিয়ার ছেলে সামসু মিয়া মধুপুর থেকে লাবনী নামের মেয়েটিকে বিয়ে করে আনে। বিয়ের পর সামসু মিয়ার ইচ্ছা ছিল ঢাকায় গিয়ে সংসার করবে কিন্তু বাঁধা হয়ে দাড়ালো বয়স্ক মা আমেনা বেগম আর বাবা হারিস মিয়া। তারা কিছুতেই শহরে গিয়ে থাকতে পারবে না। এদিকে সামসু মিয়া ঢাকায় বেবি-ট্যাক্সি চালিয়ে যা আয়-রোজগার করে তাতে দুইটা সংসার চালানো কঠিন। এমন অবস্থায় সামসু মিয়া সপ্তাহে পাঁচদিন ঢাকা আর দুইদিন গ্রামে অবস্থান করে সংসার ধর্ম পালন করছিল।
.
এক বিকেলে বদর মণ্ডলের বড়ছেলে সুমন মণ্ডল কলেজ থেকে বাড়ী ফিরছিল সাইকেল চালিয়ে। পথের পাশেই হাজীবাড়ীর বড়পুকুরে সেই সময় স্নান করছিল সামসু মিয়ার নতুন বউ লাবনী। কামরাঙা গাছের আড়ালে দাড়িয়ে উঠতি বয়সী সুমন মণ্ডল লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল রক্তজবার পাতার আড়ালে লাবনীর লাবন্য আর তার শরীরের ঢেউ।
.
নিজেকে সামলে নিয়েছিল সুমন মণ্ডল; কিন্তু সেদিনের সেই দৃশ্য তার রাতের ঘুম আর পড়ার মনোযোগ কেড়ে নেয়। সে আস্তে আস্তে তার লোভের জিহ্বার কাছে পরাজিত হতে থাকে। পরাজয়ের শেষ সীমানায় এসে সামসু মিয়ার ঢাকায় থাকার সুযোগে সুমন প্রেম নিবেদন করে লাবনীকে।
.
লাবনী প্রথমে সুমন মণ্ডলের প্রস্তাবে আতংকিত বোধ করে, তারপর নাছোঁরবান্দা সুমনের উপহার, নরম কণ্ঠের কথা আর নতুন স্বপ্নের প্রতিশ্রুতির ফাঁদে নিজেকে নিজেই হারিয়ে ফেলে। ঘটনা এগিয়ে যায়; এগিয়ে যেতে যেতে একদিন রাতের আঁধারে সুমন গিয়ে কড়া নাড়ে লাবনীর ঘরে...।
.
টিনের ঘরের একরুমে লাবনী আর অন্যরুমে ছিল শশুর-শাশুড়ি। রাতে লাবনী আর সুমনের প্রেমলীলা ভালই চলছিল কিন্তু মাঝরাতে কাজের মাঝখানে ব্যঘাত ঘটায় সিঁদকাটা চোর। চোরের আওয়াজে ঘুম ভেঙে লাবনীর শশুর হারিস মিয়া চিৎকার করে উঠে...কে? কে?।
.
এদিকে সেই চিৎকারে সুমনের চোরের-পুলিশ-পুলিশ-মনটা ভাবে তাকে উদ্দেশ্য করেই কেউ চিৎকার দিয়ে বলছে, কে? কে? সুমন তার পড়নের নীল সার্ট, সাদা লুঙ্গি আর বাটার স্যান্ডেল জোড়া রেখেই প্রাণ বাঁচাতে উলঙ্গ হয়েই দেয় দৌড়...।
.
তারপর রাত ভোর হতেই মানুষের চোখে-মুখে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। তারা বুঝে যায়, এ বাড়ীর নতুন বউয়ের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক আছে এমন কেউ এসেছিল গতরাতে। তারা নীল রঙের সার্ট, সাদা রঙের লুঙ্গি আর বাটার স্যান্ডেল জোড়া মনোযোগ দিয়ে দেখে; তারপর নিশ্চিত হয়, যে লোকটা গতরাতে এসেছিল সে অবশ্যই মণ্ডল বাড়ীর কেউ হবে...।
.
সবাই বুঝতে পারে, নীল রঙের সার্টটা হচ্ছে কলেজ পড়ুয়া সুমন মণ্ডলের, সাদা রঙের লুঙ্গিটা হচ্ছে বদর মণ্ডলের আর বাটার স্যান্ডেল জোড়া হচ্ছে বদর মণ্ডলের ঘরজামাই মানে সিদ্দিক মণ্ডলের...।
.
এবার গ্রামের দুর্বল মনের মানুষেরা শক্ত চিন্তায় পড়ে যায়; আগামীতে যে বিচার হতে যাচ্ছে, যেখানে বিচারকের নিজের পড়নের সাদা লুঙ্গি, তার ছেলের নীল সার্ট আর ঘর-জামাইয়ের বাটার স্যান্ডেল তাদের চিন্তার নিউরনে উপহাসের অনুরণন ঘটাতে থাকে...।
.
ন্যায় বিচার প্রত্যাশী হারিস মিয়া; একবার লাবনীর দিকে; একবার সাদা লুঙ্গির দিকে, একবার নীল সার্টের দিকে আর একবার বাটার স্যান্ডেলের দিকে চক্রাকারে তাকাতে থাকে; সে এখন ভেবেই পাচ্ছে না, কার বিচার চায় সে? কেন বিচার চায় সে?
...
© খোরশেদ খোকন। ০৭/০১/২০১৬
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




