সে সময়টা ছিল বসন্তকাল। আমি পুকুরঘাটে বসে রাতের আকাশে একমনে তাকিয়ে ছিলাম। পুকুর পেড়িয়ে চারপাশে ধানক্ষেত, সরু মেঠোপথ চলে গেছে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে, একটা কালভারটের উপর গ্রাম্য রাখালেরা বসে করুন সুরে গান ধরেছে -
.
সোনা দিয়া বান্ধায়াছি ঘর
ও মন রে ঘুণে করল জর জর...
.
এমন সময় আমার কাঁধে হাত রাখলেন বড়চাচা; বললেন কি দেখিস?
আমি আকাশের দিকে আঙ্গুল উচিয়ে দেখাই, রাতের আকাশের জ্বলতে থাকা একটি উজ্জ্বল তারা।
চাচা আমাকে বলেন, আয় আমরা দুজনে মিলে রাতের তারা দেখি...!
.
উত্তরাধিকার সুত্রে আমরা হচ্ছি কৃষিজীবী মানুষ। দাদা ছিলেন অশিক্ষিত বর্গা কৃষক। দরিদ্র কৃষক হয়েও চারছেলে আর দুইমেয়ে নিয়ে আটজনের একটা বড় সংসার ছিল তার; আমার বাবার মতে সেটা ছিল তাদের রূপকথার জগত...!
.
আমার দাদা মরহুম ঈমান আলী (মৃত্যুঃ ০৫-১০-১৯৮২) এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার অনেক আগেই আমার বাবা পড়াশুনা করে সরকারি চাকরিজীবি হয়েছেন। অন্য চাচারাও দাদার মৃত্যুর পরে চাকরিজীবী হয়েছেন। একমাত্র বড়চাচা সেই যে দাদার সাথে কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন; সেটাকেই পেশা হিসেবে নিয়ে সারাজীবনই কৃষি কাজ করে গেছেন।
.
বড়চাচা ছিলেন আমাদের বংশের সর্বশেষ কৃষিজীবী উত্তরাধিকার। তিনি কৃষিজীবী হলেও ছিলেন শিক্ষিত মানুষ; ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই সংসার সামলাতে পড়াশুনায় ইতি টেনেছিলেন তিনি।
.
তিনি বললেন, ঐ যে সবচাইতে উজ্জ্বল তারাটি দেখা যাচ্ছে ঐটার নাম ধ্রুবতারা। শুনেছি প্রাচীনকাল থেকেই মানে দিক নির্ণয় যন্ত্র আবিস্কারের পূর্বে সমূদ্রে জাহাজ চালানোর সময় নাবিকরা ঐ তারার অবস্থান দেখে অন্যান্য দিক নির্ণয় করতো। মনে রাখবি, ধ্রুবতারা হচ্ছে আকাশের একমাত্র তারা, যাকে এইদেশ থেকে বছরের যে কোন সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়।
.
চাচা বললেন, তুই কি সপ্তর্ষী মন্ডল কাকে বলে জানিস?
আমি বললাম, নাম শুনেছি কিন্তু নিজের মতো করে হিসাবটা মিলাতে পারি না।
তিনি বললেন, সপ্তর্ষী মন্ডল এর প্রথম দুটি তারা যাদের নাম পুলহ এবং ক্রুতু এই দুইটাকে সরলরেখায় বাড়ালে ধ্রুবতারা কে দেখা যায়। এবার ভাল করে তাকিয়ে দেখ, ঐটা হচ্ছে ধ্রুবতারা...
.
আমি বললাম, তুমি আমাকে সপ্তর্ষী মন্ডল নিয়ে আরও বল, আমি তারাদের দেশটা কেমন জানতে চাই।
তিনি বললেন, সপ্তর্ষী মন্ডল বিষয়টা রুপকথার মতোই, উওর-পূর্ব আকাশের দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকালে দেখতে পাবি বিরাট একটা প্রশ্নবোধক চিন্হ, এই উজ্জল জ্বল জ্বল করতে থাকা চিন্হটাই হচ্ছে সপ্তর্ষী মন্ডল। প্রাচীন আরবী পণ্ডিতদের মতে এটি দেখতে বড় একটা ভাল্লুকের মতো। আর প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিতদের মতে এটা দেখতে একটি ময়ূরের আকৃতি। মনে রাখবি, সপ্তর্ষী হচ্ছে তৃতীয় বৃহত্তম তারামন্ডল। পশ্চিমের চারটি তারা দিয়ে ভাল্লুকের শরীর এবং পূবের তিনটি তারা দিয়ে ভাল্লুকের লেজ কল্পনা করা হয়...।
.
চাচা বললেন, ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র মতে সপ্তর্ষী মন্ডলের সাতটি তারার নাম দেয়া হয়েছে সাতজন মূনীর নামে; তারা হলেন ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য, অত্রি, অন্গিরা, বশিস্ঠ, অরুন্ধতী আর মরীচি। নামগুলোর মর্মকথা অন্য একদিন বলবো, ঠিক আছে...
.
মনে রাখবি, সপ্তর্ষিমন্ডল সারা বছর ধ্রুবতারার চারদিকে ঘোরে। সপ্তর্ষিমন্ডলের প্রথম দু’টি তারাকে (পুলহ, ক্রতু) যোগ করে সরলরেখা কল্পনা করলে ঐ সরল রেখা সব সময়ই ধ্রুবতারার দিকে নির্দেশ করে, আয় আমরা একমনে ধ্রুবতারা দেখি...।
---
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬; দুপুরে আমার সেই বড়চাচা মারা গেলেন। বাবা মা আর আমি তিনজনে টাঙাইল রওনা হলাম। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল; ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের পথে রাস্তা আর ফুরাতে চাইল না!
.
আত্মীয়স্বজন বার বার ফোনে জানতে চাইল আমরা কতদূর এগিয়ে আসতে পেরেছি; অবশেষে আমরা গ্রামের বাড়ী পৌছালাম রাত্রি পনে আঁটটায়।
জানাজা পেলাম না; দাফনের সুযোগটা পেলাম। নিজের দুই হাতে মুঠো ভর্তি মাটি নিয়ে আমি বড়চাচার কবরে দিলাম...।
অচেনা কবরে চিরদিনের জন্য রেখে এলাম, আমি আমার বড়চাচাকে...।
.
প্রকৃতির কি আজব খেলা;
এখন সময়টা চলছে সেদিনের মতোই বসন্তকাল...!
আমি পুকুর ঘাটে বসে রাতের আকাশে একমনে তাকিয়ে আছি।
পুকুর পেড়িয়ে চারপাশে ধানক্ষেত, সরু মেঠোপথ চলে গেছে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে, আমি একা বসে আছি...আজ আর আমার সেই বড়চাচা নেই...
আমার বুকফাটা কান্নার দিকে ধ্রুবতারা...অবাক চেয়ে আছে...!

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



