somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শক্তির ডোস: মাজেদ কাকুর গল্প

২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০২ সাল, আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। প্রতিদিন, মাদ্রাসার ভ্যান এসে বাড়ি থেকে নিয়ে যেত। তখন জীবনকে খুব সরল মনে হতো৷ যাওয়ার জায়গা নির্দিষ্ট, ফেরার পথও জানা। ভ্যান চালক বদলাত, দিন বদলাত, কিন্তু মাজেদ কাকু এক সময় পর্যন্ত আমাদের নিয়মিত সঙ্গী ছিলেন।
করতোয়া নদীর উপর, চেলোপাড়ার ফতেহ আলী ব্রিজ ছিল উঁচু। ভ্যান উঠানো কষ্ট হতো। আমরা ছেলেরা নেমে ধাক্কা দিতাম। রেললাইন ক্রসিং এলেও একই নিয়ম।
সে সময়, আমরা ভাবতাম গতি মানেই শক্তি। মাজেদ কাকু ধীরে চালাতেন। আমরা বিরক্ত হতাম, বলতাম, “কাকু, জোরে চালান।” তিনি হেসে বলতেন, “শক্তি লাগবে।” ধাক্কা দিয়েও যখন কাজ হতো না; তখন বলতেন, “শক্তির ডোস লাগবে।”
কাকুর কথার ভঙ্গিতে বুঝেছিলাম, তার ডোস ছিল মূলত বিড়ি। আজ সেদিনের কথা মনে হলে হেসেই দায় সারতে পারি না বরং বুঝি, এটা শক্তির গল্প নয়; এটা ছিল এমন এক শরীরের গল্প, যেটাকে প্রতিদিন নিজের সীমা অতিক্রম করে বাঁচতে হতো।
আমার বন্ধু আসাদুল্লাহ মাঝে মাঝে দু-এক টাকা দিত। মাজেদ কাকু সে টাকা দিয়ে বিড়ি কিনে ধরাতেন। ভ্যানের গতি যেন সত্যিই একটু বাড়ত। আমরা অবাক হতাম৷ ভাবতাম ধোঁয়ায় শক্তি আসে৷
বয়সের এই সময়ে এসে বুঝি, কাকুর শক্তি আসত মূলত তার বেঁচে থাকার জেদ থেকে। বিড়ি ছিল তার দারিদ্র্যের বিকল্প ভাষা, যেটা সে নিজেই বিশ্বাস করতে শিখেছিল। সমাজ তাকে শেখায়নি বিশ্রাম, শেখায়নি স্বাস্থ্য; শিখিয়েছে যেভাবেই হোক কাজ থামানো যাবে না।
মাদ্রাসা থেকে বাড়ি পর্যন্ত, আমাদের কাছে পথ ছিল গল্পের আসর। আমরা কথা বলতাম; খেলতাম, যুদ্ধ করতাম । কাকু সেই গল্পে তাল দিতেন। শাসন করতেন৷ ইয়ার্কি মারতেন৷
মাঝে মাঝে মনে হয়, সে গল্পগুলো আমাদের চেয়ে তার বেশি দরকার ছিল। কারণ কথা বলা মানে কেবল সময় কাটানো নয়; কথা বলা মানে নিজেকে মানুষ হিসেবে টিকিয়ে রাখা। তার দারিদ্র্য ছিল নীরব পোশাকে, ভঙ্গিতে, ধীরতায়। দারিদ্র্য সবসময় অভাব হিসেবে ধরা দেয় না; অনেক সময় তা ধরা দেয় অভ্যাস হিসেবে।
যদি কাকুর সাথে আবার দেখা হতো, তবে তার পাশে বসে চা খেতাম; তাকে বিড়ি কিনে দিতাম। অসুস্থ হলে বলতাম, “কাকু, এসব ছাইপাঁশ না খেলেই হয় না?”
রাস্তা-ঘাট-মানুষের ভীড়ে, দর্শন আমাকে শিখিয়েছে সব জীবন সংশোধনযোগ্য নয়, কিন্তু যারা অন্যের ক্ষতি না করে বদঅভ্যেসে জড়িয়ে গেছে সে সব জীবনও অসম্মানযোগ্য নয়।
মাজেদ কাকুর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় বাইশ বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়, চোখ থেকে আধো আধো তার মুখ মুছে গিয়েছে, কান তার কণ্ঠ ভুলিয়েছে, কিন্তু অর্থ রেখে গেছে।
ভ্যানের ভাড়া এবং তার সময় নির্ধারণ সমস্যায় সম্ভবত তিনি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলেন৷
এরপর আমজেদ কাকুর সঙ্গে দেখা। মাজেদ কাকুর পরে ভ্যান চালানোর দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসেছিল। তিনি ছিলেন সরল মানুষ৷ কখনো আমাদের কাছে কিছু চাননি; দুষ্টুমির চূড়ান্ত পর্যায়ে, মাঝে মাঝে বলতেন, "ধূর..!"
প্রায় ষোলো বছর আগে এক মোড়ে হঠাৎ তাঁর সঙ্গে দেখা। আমি চা খাচ্ছিলাম। তিনি দূর থেকে তাকিয়ে ছিলেন। আমি কাছে এগিয়ে বললাম, “কাকু না?”
তিনি সেই চেনা, সরল হাসিটা দিয়ে বললেন, “হ, কেমন আছো বারে?”
তারপর কাকুকে পাউরুটি ও চা খাওয়ালাম। টিউশনি করাতাম বলে, পকেটে তখন কিছু টাকা থাকতো। তাই কাকুকে একটি সিগারেটও কিনে দিলাম।
হয়তো সেটা ছিল আমার নফসের ক্ষুদ্র এক আনন্দ; আর রুহের মৃদু সহানুভূতির এক নিদর্শন। তিনি জীবনে যা কোনোদিন চাননি, তাই তাকে দিলাম৷ তার ছোট্ট আনন্দের সঙ্গী হলাম। সেই ভাঙ্গাচূড়া চেহারা আরও বৃদ্ধ হয়েছে৷ বৃদ্ধ ও সাদাকালো খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির মানুষটি বিদায়ের সময় মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “কাকু, পড়াশোনা করে বড়ো হও!”
শ্রমজীবী মানুষের রুহের গভীর আকুতি, নফসের সীমা ছুঁয়ে যাওয়ার নিঃশব্দ প্রার্থনা। তিনি নিজে ততটা শুদ্ধ নন কিন্তু আমার জন্য চাইলেন৷ বিড়ি খেয়েও মানুষ দোয়া করে৷ আজব দুনিয়া৷ রঙিন ঝলকানির সব দুঃখ৷ মানুষের ভিতরের তালহারা মানুষ৷
পৃথিবীতে মানুষ মানুষকে নানা কারণে মনে রাখে। কেউ উপকারে, কেউ আঘাতে। কিন্তু জীবনের গোড়ার মানুষগুলো আলাদা। তারা আমাদের জীবন পাল্টায় না; তারা আমাদের দৃষ্টি পাল্টায়।
আমাদের বয়স বাড়লে সামনে নয়; পেছনে তাকানোর সাহস জন্মায়। তখন কিছুটা আন্দাজ করা যায়, ইতিহাসে যাদের নাম নেই, তারাই আমাদের কোনো না কোনো ভাবে নৈতিক মানচিত্র এঁকে দিয়েছিলেন। তারা কোথাও লেখা নেই, তবু আমাদের বিবেকের ভেতরে তারা স্থায়ী ঠিকানা করে নিয়েছে।
আজ আমি, আমার জীবনের নানা ঘটনায় স্মৃতিকাতর হই, থেমে যাই, হাসি।
বুঝি, জীবনের সবচেয়ে গভীর দর্শন বই থেকে আসে না; আসে সেইসব মানুষদের কাছ থেকে, যারা আমাদের কোথাও পৌঁছে দেয়নি, কিন্তু এমন সব ঘটনা বা স্মৃতির ফলক এঁকেছেন যে, বয়স না পেকে যাবে কোথায়!

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৮
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্ম, রাজনীতি ও “বেহেস্তের টিকিট”: ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৩২

ধর্ম, রাজনীতি ও “বেহেস্তের টিকিট”: ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ।
-----------------------------------------------------------
ধর্ম ও রাজনীতি এক জিনিস নয়, এক পথে চলে না, এবং এক লক্ষ্যেও পৌঁছায় না। ধর্মের ভিত্তি সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা ও আত্মসংযম। রাজনীতির... ...বাকিটুকু পড়ুন

লিমেরিক

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০১

ধান লাগাতে গিয়ে খোকার একী হল হাল
কাদা জলে হোঁচট খেয়ে চিড়ে গেলো গাল
না পারে আর কইতে
না পারে আর সইতে
টক মিষ্টি যাহাই খাচ্ছে লাগছে সবই ঝাল। ...বাকিটুকু পড়ুন

=আজ হবে দেখা নিশ্চয়ই =

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৫০


জম্পেশ খানা শেষে তোরা করিস চায়ের আয়োজন
আজ একত্রে কাটাবো সময় আমরা প্রিয়জন,
ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে আমরা ক'জন
গল্প আড্ডা আহা সেকি মধুর গুঞ্জরন।

জেনে যাবো কেমন ছিলে, আছো কেমন তোমরা,
কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি চোর হলাম বটে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০২


আজ সকালে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কলিমুদ্দিন দফাদার। পাশের টেবিলে কয়েকজন ব্যবসায়ী নির্বাচন নিয়ে কথা বলছিলেন। তাদের মুখে উদ্বেগ দেখে তিনি বুঝলেন, এটাই তার নিজের মনের প্রতিধ্বনি। ১২... ...বাকিটুকু পড়ুন

Epstein File-মানবতার কলঙ্ক

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮

গত ৩০ জানুয়ারি Epstein Files এর ৩ মিলিয়নেরও বেশি পৃষ্ঠার নথি, ২,০০০ অধিক ভিডিও এবং ১৮০,০০০টি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের সব কুকর্ম ফাঁস করা হয়েছে!
যারা মানবতা, সভ্যতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×