somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফরাসি সাহিত্যক, রাজনীতিবিদ এবং মানবাধিকার কর্মী ভিক্টর হুগোর ১২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২২ শে মে, ২০১৪ সকাল ৯:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ঊনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী কবি, রোমান্টিসিজমের অগ্রদূত ফরাসি সাহিত্যক ভিক্টর হুগো। সারা বিশ্বে ভিক্টর হুগোর পরিচিত এক অসাধারণ ঔপন্যাসিক হিসেবে।কবি হিসেবেও অনেকে তাকে জানেন। কিন্তু তার মেধা অনেক দিকেই পরিব্যাপ্ত ছিল, যা আজো শিল্পবোদ্ধাদের চিত্তাকর্ষণ করে অনন্য মহিমায়। ফরাসি এই লেখক ছিলেন একাধারে সাহিত্যক, রাজনীতিবিদ, এবং মানবাধিকার কর্মী। তাঁর সময়ের বহু তরুণ লেখকের মত হুগোও গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন রোমান্টিসিজম নামক সাহিত্যিক ধারার অগ্রপথিক এবং ১৯ শতকে ফ্রান্সের প্রখ্যাত চরিত্র François-René de Chateaubriand দ্বারা। হুগো যৌবনে এ প্রতিজ্ঞাও করেছিলেন যে, তিনি হয় চ্যাটুব্রায়েন্ডের এর মত হবেন অথবা কিছুই হবেন না। Chateaubriand এর মত হুগোও রোমান্টিসিজমের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যান। তার রচনায় এরকম অকালপক্ব আবেগ এবং বাগ্মীতার কারণে অল্প বয়সেই সাফল্য এবং খ্যাতি অর্জন করেন হুগো। ১৮২৬ সালে প্রকাশিত Odes et Ballades বইটিই তাঁকে একজন মহান কবি, সুরকার এবং গীতিকার হিসেবে সবার কাছে উন্মোচিত করে দেয়। ১৮৮৫ সালের আজকের দিনে প্যারিসে মৃত্যুবরন করেন এই সাহিত্যিক। আজ তাঁর ১২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ফরাসি সাহিত্যক, রাজনীতিবিদ, এবং মানবাধিকার কর্মী ভিক্টর হুগোর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


(কেশোর ভিক্টর মারি হুগো)
ভিক্টর মারি হুগো Victor-Marie Hugo ১৮০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের বেসানকনে জন্মগ্রহণ করেন। যিনি ভিক্টর হুগো নামে সমধিক পরিচিত। তার পিতার নাম যোসেফ লিওপল্ড সিগিসবার্ট হুগো এবং মাতা সোফি ট্রেবাচেট। যদিও হুগো তাদের বৈধ সন্তান ছিলেন না। ভিক্টরের বাবা ছিলেন নেপোলিয়ানের সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বাবার চাকরির সুবাদে তাদের পরিবারটি কখনোই একজায়গায় স্থায়ী ছিল না। এর ফলে শৈশবেই হুগোর ভ্রমণজনিত অভিজ্ঞতা বেশ হৃদ্ধ হয়। রিপাবলিকানিজমের সমর্থক হিসেবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি এবং একই কারণে নির্বাসনেও যেতে হয় তাকে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক আর অনন্য চিত্রকর্ম দিয়ে বিশ্বজয়ের মালা পরেছিলেন কালজয়ী এই ফরাসি লেখক। অল্প বয়সেই সাহিত্যের বিশাল দুনিয়ায় পেয়েছেন অগাধ পরিপক্বতা। ১৮২২ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্য ভলিউম ‘ওড অ্যাট পজেসিস ডাইভার্স’ থেকে সহজেই তা অনুমেয়। ১৮২৩ সালে ২১ বছর বয়সে তার প্রথম উপন্যাস-‘দি হ্যান্ড আইল্যান্ড’ প্রকাশিত হয়। ১৮২৬ সালে প্রকাশিত ‘ওড টু ব্যালাডস’ তার কাব্য প্রতিভার অনন্য প্রকাশ। এর প্রতিটি ছত্রে বিকশিত হয়েছে জীবন বাস্তবতা, নিসর্গ প্রেম আর মানবিক সৌন্দর্যের অনুভূতি। ১৮৩০ সালে তিনি তার বিবেক সত্তার তাড়নায় লিখেন ‘হাঞ্চ ব্যাক অব নটরডেম’। সামাজিক দায়বোধের চেতনা থেকে লিখে ফেলা এই উপন্যাস তাকে এনে দেয় বিশ্বজোড়া খ্যাতি। এরপর লিখেছেন বিশ্ব সাহিত্যের ক্ল্যাসিক উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’। সমাজের চতুর্কোণে লুকায়িত ঘনীভূত অপরাধ, সামাজিক সমস্যা, মানুষের জীবন বিড়ম্বনা, অপরিমেয় প্রাণ প্রাচুর্য আর উত্থান-পতনের এক মহা উপাখ্যান এই-‘লা মিজারেবল’। লা মিজারেবল রচনা করতে গিয়ে তাঁকে জীবনের ১৭ বছর সাধনা করতে হয়েছে। ১৭ বছরের প্রচেষ্টায় ১৮৬১ সালে এই মহাকাব্যিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। সে কারণেই এই গ্রন্থ যুগের পর যুগ পাঠকের কাছে মহাসম্পদ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। উপন্যাসটিকে এখনও বিশ্বসাহিত্যের এক কালজয়ী সম্পদ মনে করা হয়। তার অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে ‘টয়লার্স অব দ্য সি’ এবং ‘দা ম্যান হু লাফস অন্যতম’। সাহিত্য সমালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন ‘ফিলোসফি অব লিটারেচার’।


১৮২৯ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যেই তার পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এদের মাঝে ‘লা রিয়েন্টালিস’ এবং ‘লা ভক্স ইন্টেরিয়রস’ আলোড়ন তোলে ইউরোপের কাব্য জগতে। বিপ্লবী চিন্তার অনুগামী হয়েও ভিক্টর হুগো রোমান্টিক সাহিত্যধারাতে অবগাহন করেছেন অনায়াসে। রোমান্টিসিজমের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে সঠিক নির্যাস বের করে আনতেন অপূর্ব দক্ষতায়। তার কাব্য সঙ্কলন লা-কনটেম্পেশন্স এবং লা লিজেন্ডে ডেস সাইফলস তাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফরাসি কবির স্বীকৃতি পেতে সাহায্য করেছে। চিত্রকর ও চিত্র সমালোচক হিসেবেও ভিক্টর হুগো ছিলেন সমান পারদর্শী। এঁকেছেন কমবেশি চার হাজার চিত্রকর্ম। একজন চিন্তানায়ক হিসেবে অবদান রেখেছেন রাজনীতি, দর্শন, নীতিবিদ্যা এবং সমকালীন সাহিত্য সমালোচনায়। এমন ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি আর মননসিদ্ধ প্রজ্ঞা আজো সাহিত্যিকদের অনুপ্রাণিত করে যায়। মাইকেল এইচ হার্ট তাকে অনায়াসে জায়গা দিয়েছেন বিশ্বের সেরা একশ’ মনীষীর মাঝে। কাব্য, উপন্যাস, সংগীত, চিত্রশিল্প, দর্শন এবং সাহিত্য সমালোচনায় তার মতো এমন সর্বতোমুখী প্রতিভা-বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ভিক্টর প্রভাবিত করেছেন আলবয়ার কামু, ফিউদর দস্তয়ভস্কি, চার্লস ডিকেন্সের মতো কিংবদন্তি সাহিত্যিকদের।


সারাজীবন রাজনীতি সচেতন ছিলেন ভিক্টর হুগো। যৌবনে রাজতন্ত্রে বিশ্বাস হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি প্রজাতন্ত্রের পাবলিকানিজমের সমর্থক হিসেবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং একজন কট্টর সমর্থকে পরিণত হন। তৎকালীন হালের রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিষয়বস্তু নিখুঁতভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে তার লেখনিতে। রাজনৈতিক মনোভাবের কারণে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। হুগো ১৮৫১ সালে ব্রাসেলসে নির্বাসিত হন এবং নির্বাসনে কাটাতে হয় জীবনের ২০ টি মূল্যবান বছর। পরবর্তীকালে ফ্রান্সে ফিরে এলেও তাঁকে কারাগারে কাটাতে হয়েছিল শাসকদের সঙ্গে মতানৈক্য হওয়ার কারণে। বহু চড়াই-উতরাই চলে তাঁর জীবনে। কিন্তু লেখার ক্ষেত্রে তাঁর উত্থান বিবেচনা করলে দেখা যাবে, তিনি শুধু ওপরেই উঠেছেন। পার্লামেন্টারিয়ান হয়েছেন একাধিকবার। অন্যদিকে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন সমগ্র জীবন। জীবনের শুরুতে প্রচণ্ডভাবে ক্যাথলিক খ্রিস্টান হিসেবে তাঁকে নিকটজনেরা দেখেছে। প্রথমে তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ক্যাথলিক, তারপর নিষ্ক্রিয় ক্যাথলিক এবং সবশেষে ক্যাথলিকবিরোধী।


১৮৮৫ সালের ২২ মে ৮৩ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেন রোমান্টিসিজমের এই মহাকাব্যিক প্রতিভা। আজ তার ১২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। বিখ্যাত ফরাসি কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কূটনীতিক, মানবাধিকার কর্মী এবং ফ্রান্সের রোমান্টিক আন্দোলনের প্রবক্তা ভিক্টর হুগোর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০১৪ সকাল ৯:১০
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।

লিখেছেন ইমরান আশফাক, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৩

আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৯


আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×