somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কোবিদ
সত্যই সুন্দর

৬৯ সালের আইয়ুবশাহী পতন আন্দোলনের পথিকৃৎ শহীদ আসাদের ৭২তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

১০ ই জুন, ২০১৪ সকাল ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান একজন শহীদ ছাত্রনেতা, শহীদ আসাদ নামেই যিনি বেশি পরিচিত। যাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান আরো বেগবান হয়েছিল। শহীদ আসাদ ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনে পথিকৃৎ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের তিন শহীদদের একজন, অন্য দু'জন হচ্ছেন - শহীদ রুস্তম ও শহীদ মতিউর। ১৯৬৯ সালে আইয়ুবশাহীর পতনের দাবীতে মিছিল করার সময় তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হন। গণঅভ্যুত্থানের মহান জাগরণ এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মৃত্যুকালীন সময়ে আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এম.এ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। আজ ছাত্রনেতা শহীদ আসাদের ৭২তম জন্মবার্ষিকী। আইয়ুবশাহী পতন আন্দোলনের পথিকৃৎ শহীদ আসাদের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচছা।


শহীদ আসাদ ১০ই জুন, ১৯৪২ইং সালে নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার ধনুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শহীদ আসাদ এর পুরো নাম আমানউল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। বাবা আলহাজ মাঃ মোহাম্মদ আবু তাহের বি এ বি টি এবং মাতা মতি জাহান খাদিজা খাতুন। ছয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আসাদ ছিলেন চতুর্থ। তার বড় ভাইয়ের নাম ইঞ্জিনিয়ার রশিদুজ্জামান। আসাদের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। তারপর পাঠশালা ও প্রাইমারী। শৈশবকাল থেকে আসাদ পড়াশুনায় মনোযোগী ছিলেন। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলা, কবিতা আবৃতি, মাছধরা ও বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেয়া বেশ পছন্দ করতেন। প্রাইমারী পড়াশুনা শেষে ১৯৫৪ সালে তাঁর বাবা মাঃ মোহাম্মদ আবু তাহের তাঁকে শিবপুর হাইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ও মুরারী চাঁদ মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কলেজ জীবনে তিনি পড়াশুনার পাশাপাশি কলেজের যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হতে থাকেন। এ সময় তিনি তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠন পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে এবং ১৯৬২ সালের মহান শিক্ষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ১৯৬৬ সালে বি.এ এবং ১৯৬৭ সালে এম.এ ডিগ্রী অর্জন করেন।


এই বৎসরেই আসাদ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং কৃষক সমিতির সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষাণী'র নির্দেশনায় কৃষক সমিতিকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে শিবপুর, মনোহরদী, রায়পুরা এবং নরসিংদী এলাকায় নিজেকে নিযুক্ত করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত প্রাণ আসাদুজ্জামান শহীদ আসাদ তৎকালীন ঢাকা হল (বতর্মান শহীদুল্লাহ হল) শাখার পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে এবং পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপসু-মেনন গ্রুপ), ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৪ জানুয়ারি, ১৯৬৯ইং তারিখে ছাত্রদের ১১-দফা এবং বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা দাবীর সাথে একাত্মতা পোষণ করে ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, যাতে প্রধান ভূমিকা রাখেন শহীদ আসাদ। ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৯ইং সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ছাত্ররা দেশব্যাপী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ডাক দেয়। ফলে গভর্নর হিসেবে মোনেম খান ১৪৪-ধারা আইন জারী করেন যাতে করে চার জনের বেশী লোক একত্রিত হতে না পারে।


পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ২০ জানুয়ারী, ১৯৬৯ইং তারিখ দুপুরে ছাত্রদেরকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পার্শ্বে চাঁন খাঁ'র পুল এলাকায় মিছিল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন আসাদুজ্জামান। পুলিশ তাদেরকে চাঁন খাঁ'র ব্রীজে বাঁধা দেয় ও চলে যেতে বলে। কিন্তু বিক্ষোভকারী ছাত্ররা সেখানে প্রায় এক ঘন্টা অবস্থান নেয় এবং আসাদ ও তার সহযোগীরা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। ঐ অবস্থায় খুব কাছ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে এক পুলিশ অফিসার গুলিবর্ষণ করে। তৎক্ষণাৎ গুরুতর আহত অবস্থায় আসাদকে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।


হাজারো ছাত্র-জনতা আসাদের মৃত্যুতে একত্রিত হয়ে পুণরায় মিছিল বের করে এবং শহীদ মিনারের পাদদেশে জমায়েত হয়। কেন্দ্রীয় প্রতিরোধ কমিটি তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ২২, ২৩ ও ২৪ জানুয়ারী সারাদেশে ধর্মঘট আহ্বান করে। ধর্মঘটের শেষ দিনে পুলিশ পুণরায় গুলিবর্ষণ করে। ফলশ্রুতিস্বরূপ আসাদের মৃত্যুতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সরকার দু'মাসের জন্য ১৪৪-ধারা আইনপ্রয়োগ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালের ১৫ জানুয়ারী তারিখের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদ দিবস হিসেবে পালনের জন্য পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন ঐদিন পূর্ণ দিবস হরতাল আহ্বান করে। প্রতি বছর জানুয়ারির ২০ তারিখে শহীদ আসাদের দেশমাতৃকার সেবায় মুক্তি এবং স্বাধীনতার লক্ষ্যে তার মহান আত্মত্যাগ ও অবদানকে বাঙ্গালী জাতি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ও গভীর শ্রদ্ধায় শহীদ আসাদ দিবস পালন করে থাকে।


বাংলাদেশের অনেক জায়গায় জনগণ আইয়ুব খানের নামফলক পরিবর্তন করে শহীদ আসাদ রাখে বিশেষতঃ জাতীয় সংসদ ভবনের ডান পার্শ্বে অবস্থিত আইয়ুব গেটের পরিবর্তে আসাদ গেট রাখা হয়। এছাড়াও, আইয়ুব এভিন্যিউ'র পরিবর্তে আসাদ এভিন্যিউ এবং আইয়ুব পার্কের পরিবর্তে আসাদ পার্ক নামকরণ করা হয়। ১৯৭০ সালে ১ম শহীদ আসাদ দিবসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকে জনগণ "ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের স্মারক ও অমর আসাদ" শিরোনামে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করে যেখানে আসাদ গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। শিবপুর ও ধনুয়া এলাকার স্থানীয় লোকজন ১৯৭০ সালে শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজ নামে একটি মহাবিদ্যালয় এবং ১৯৯১ সালে আসাদের নিজের গ্রাম ধনুয়া'য় স্থানীয় অধিবাসীরা "শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস স্কুল ও কলেজ" প্রতিষ্ঠা করে।


আসাদের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য গণজাগরণ। ১৯৯২ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরী বিভাগের গেটের উত্তরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের বা ডাকসু'র উদ্যোগে আসাদের স্মৃতিকে অমর ও অক্ষয় করে তুলতে এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে জাগ্রত রাখতে গণজাগরণ নামে নির্মিত হয় আসাদের স্মৃতিস্তম্ভ। শিল্পী প্রদ্যোত দাস এ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৯২ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়া ও আসাদ স্মৃতি পরিষদের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী'র উপস্থিতিতে এ ভাস্কর্য উদ্বোধন করেন শহীদ আসাদের বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার রশিদুজ্জামান।


কোন কোন মৃত্যু ইতিহাস হয়ে যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জনস্রোতের উদ্বেল জোয়ার আনে। আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদ, যিনি আসাদ নামেই সর্বাধিক পরিচিত, তাঁর মৃত্যু এমনি এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল ৬৯’-এর গণ-অভ্যুত্থানে। আসাদ এবং ৬৯’-এর গণ-অভ্যুত্থান এক অখন্ড সত্বা। আজ ছাত্রনেতা শহীদ আসাদের ৭২তম জন্মবার্ষিকী। আইয়ুবশাহী পতন আন্দোলনের পথিকৃৎ শহীদ আসাদের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচছা।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১৪ সকাল ১১:৩৮
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×