somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈশ্বরের রংধনু দেশে : 2

১০ ই জুন, ২০০৬ বিকাল ৪:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঈশ্বরের রংধনু দেশে : 2

চার।

একজন আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, তোমাদের দেশে নাকি চুরি করলে চোরদের ধরে হাত কেটে দেয়?
ততদিনে আমি আরো অনেক উদ্ভট প্রশ্ন শুনে ফেলেছি। তবু এটা শুনে অবাক হয়ে পালটা জিজ্ঞেস করলাম, কক্ষনোই না! এরকম আজব কথা কে বলেছে তোমাকে?
ছেলেটা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আমি দেখলাম কি যেন ভাবছে সে। খানিক পর মাথা দোলাতে দোলাতে গম্ভীর স্বরে বলে, আমি বাজি ধরে বলতে পারি, এখানে আসবার আগে তুমি ভেবেছ, এলে নিশ্চয় দেখতে পাবে এখনো এখানে রাস্তা ঘাটে বাঘ-সিংহ ঘুরে বেড়াচ্ছে!
আমি শুনে হা হা করে হেসে ফেলি। কথা তো ঠিকই। আফ্রিকা শুনলে আজো আমার প্রথম জংগলের কথাই মনে পড়ে। এখানে না এলে আমি কারো মুখে শুনে কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না যে এরা এত উন্নত হয়ে গেছে!

পাঁচ।

আমার জানালা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায় ....., ঘুম থেকে উঠেই তাই জানালা দিয়ে একবার আকাশ দেখে নিই।
ভীষন সুন্দর এই ক্যাম্পাসটা। শহরের একপাশে পাহাড়ের উপর ইউনিভার্সিটি। শহর থেকে খুব সহজেই দেখা যায় পাহাড়ের উপর মাথা উঁচু করে থাকা বিলডিংগুলো। দারুন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। প্রথম এসে সত্যিকার অর্থেই এখানকার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। ক্লাশ শেষে হেঁটে বেড়াতাম পুরো ক্যাম্পাস। আর যখন ট্যাক্সিতে করে ভার্সিটি থেকে শহরে যাই, উঁচু-নিচু রাস্তাগুলো যাওয়ার সময় বুকের ভেতর কাঁপন ধরে যায়।অনেক উপর থেকে একেবারে ঝপ করে নীচে নেমে আসে। যেন বা রোলার কোষ্টার!
আমার 'হল'টাও তাই। পাহাড় কেটে এমন করে বানানো যে মজার একটা ব্যাপার হয়। হলের যে দু'টো গেট, তার একটা দিয়ে ঢুকলে সোজা দোতলায়, আরেকটা দিয়ে একতলায় যাওয়া যায়। অর্থাৎ, একতলা দোতলা যেদিক দিয়েই বের হই না কেন সামনে রাস্তা পড়বে। আর আমার রুমটা ঠিক মাঝামাঝি। মানে দেড় তলায়।
হলের ঠিক সামনেই বিশাল একটা গাছে কিছুদিন ধরেই নীল রঙের ফুল ফুটছে। সকালে ক্লাসে যাবার সময় দেখি, সামনের রাস্তায় ফুলগুলো এমনভাবে ঝরে পড়ে থাকে, যেন মনে হয় খুব সুন্দর নীল রঙের একটা কার্পেট বিছানো।
আমার সবচেয়ে ভালো লাগে লাইব্রেরির সামনে বসে থাকতে। ওখান থেকে পুরো শহরটা দেখা যায়।
তারচেয়ে বড় কথা, সমুদ্্র দেখা যায় ওখান থেকে!

ছয়।

বন্ধুদের বলেছি, দেশের বাইরে পড়তে আসতে চাইলে টোফেল করার আগে যেন রান্না শিখে নেয়। ওরা হাসে। কিন্তু এটা যে কি পরিমান সত্যি কথা, তা ভূক্তভোগিরাই জানেন। প্রতিদিন পেঁয়াজের ঝাঁজের সাথে নাকের জল আর চোখের জল এক করে ফেলি। অনেক কষ্টে হাত খানিকটা কেটে আর অনেকটা পুড়িয়ে যখন রান্না করি, দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা আসলে। রান্না শেসে পাতিলের ভেতরের বস্তুটার দিকে তাকিয়ে প্রায়শ:ই দ্্বিধায় পড়ে যাই, এটা আসলে কি?মুরগির মাংস না চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি? নাকি শবে বরাতের হালুয়া?
দু:খের ব্যাপার, এতগুলো নাম মনে এলেও শেষমেষ কোন কিছুর সাথেই আর মেলাতে পারি না। সেই নাম না জানা বস্তুটি খেয়েই পেট ভরাই প্রতিদিন। তারপর বিছানায় শুয়ে ভরা পেটে হাত বুলোতে বুলোতে ভাবি, যাক বাবা, বিয়ের পরে বউ রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গেলে অন্তত: না খেয়ে থাকতে হবে না!

সাত।

ক্লাস, প্রোজেক্ট আর ল্যাব মিলিয়ে ব্যস্ততায় কেটে যায় সময়। দম ফেলবার ফুরসত নেই। নেই মন খারাপ করার সময়ও। তবু মনের কি আর আগামাথা থাকে? হুট করে আবিষ্কার করি, আম্মুকে মনে পড়ছে ভীষন, বাসার সবার কথা- নানুর কথা। ছোট ভাইটার লেখা চিঠি পড়ে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ি আর অবাক হয়ে ভাবি, এত সুন্দর চিঠি লেখা কে শেখালো ওকে?
এত সুন্দর ক্যাম্পাস, তবু কার্জন হলকে মনে পড়ে খুব। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের অতি পুরনো লাল দালানটাকে যতটা কাছের মনে হয় এখনো, এখানকার অত্যাধুনিক বিলডিংগুলোকে ততটা আপন মনে হয় না কেন জানি!
কোথায় পাবো সেই প্রাণ প্রিয় বন্ধুদের এখানে, যাদের হাতে হাত রেখে দু:খ ভুলে যেতাম? অথবা অমর একুশে হলের রাতজাগা সেইসব ক্ষণ! সুন্দর নীল ফুলগুলোও কিছুতেই ভুলাতে পারে না ঢা.বি.-র সেই আগুনরঙা কৃষঞচূড়ার স্মৃতি!
লাইব্রেরিতে পড়া শেষ করে রাত করে হলে ফিরবার পথে তাই মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াই ওখানটায়, যেখান থেকে সমুদ্্র দেখা যায়। রেলিংয়ে ভর দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকি সত্যি, তবে সমুদ্্রটাকেই দেখি কি না, তা আমি নিজেও আসলে ঠিক করে বলতে পারবো না।


( ক্রমশ: )
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০০৬ বিকাল ৪:০৬
৩১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"নিজেদের কেলেঙ্কারিই যখন নিরাপদ নয়, প্রধানমন্ত্রী কতটা নিরাপদ"

লিখেছেন রিয়াজ হান্নান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৭


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রিয় তারেক রহমান রাহিমাহুল্লাহ,আপনাকে সবার আগে বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি আপনার আশেপাশের লোকেরা কেলেংকারির সাথে জড়িত,এরা আবার ইলিয়াসের আগেই নিজেকে নিজে এক্সপোজ করে দেয়।

এরা নিজেরাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৫২

নেপাল সেনাবাহিনীর সম্মানসূচক জেনারেল পদমর্যাদা সম্প্রতি ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের কিছু সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি করেছে ।
গত ১৭ আগস্ট নেপালের রাজধানী... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলাপী এখন বাসে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২০


দেশে আজ থেকে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকা সহ আরও তিনটি বড় শহরে এই বাস চলবে। খবরটা শুনে মনে হলো, দেশ যেন হঠাৎ করেই এক ধাপ আধুনিক হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বহু দিন পর বন্ধু"

লিখেছেন সনজিত, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


বহু বছর পর হঠাৎ তোর সঙ্গে দেখা।
প্রথমে চিনতেই পারিনি।
তারপর একচিলতে হাসি-
মনে হলো,
সময় আমাদের চেহারা বদলেছে,
কিন্তু শৈশবের মুখটা এখনো একই রয়ে গেছে।

চোখের কোণে ক্লান্তির রেখা,
চুল অর্ধেকটা সাদা রং,
কাঁধে সংসার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×