somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈশ্বরের রংধনু দেশে : 3

১৭ ই জুন, ২০০৬ সকাল ১০:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঈশ্বরের রংধনু দেশে -3

আট -
-----
বিশেষ দ্্রষ্টব্য 1: নিম্নোক্ত রচনায সাদা, কালো, বাদামি এবংআমি- এই শব্দগুলি মনুষ্য প্রজাতির বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়েছে। গরু, মুরগী, হাঁস কিংবা ছাগলের জন্যে নয়, পড়তে গিয়ে পাঠকেরা যেন দিগভ্রষ্ট না হন, সে কারনেই এই তথ্যের উল্লেখ।
বিশেষ দ্্রষ্টব্য 2: আরেকটু চিন্তাভাবনা করে হিন্দু ও মুসলমান শব্দদুটিকেও উপরিউক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলো।

নয়-
-------
ধরা যাক একটা বৃত্ত।
এই বৃত্তের মাঝখানে আরো দুটি বৃত্ত এঁকে, একেবারে মাঝেরটাকে কালো রংএ, তারপরেরটাকে বাদামি আর তারপরেরটাকে সাদা রংএ রাঙিয়ে নিই। যে ছবিটা উঠে আসবে তার সাথে সাউথ আফ্রিকার যে কোন শহরের তুলনা চলে।
ডারবান, জোহানেসবার্গ, প্রিটোরিয়া, ম্পুমালাঙ্গা ও আরো কিছু ছোট শহর যেগুলো আমি দেখেছি, সবখানেই এরকম। শহরের ভেতরে ঘুপচি কিছু জায়গায়, অথবা শহরের পাশেই অনুন্নত কিছু এলাকায়, এখানে যেগুলোকে বলে "লোকেশান', এসব অঞ্চলে থাকে কালোরা। শহর থেকে একটু দুরে আলাদা টাউনশিপের মত এলাকায় নিজের কম্যুনিটি তৈরি করে নিয়ে থাকে ইন্ডিয়ানরা। আর তাদের চেয়েও আরো দূরে স্বপ্নের মত সুন্দর সব বাড়ি তৈরি করে সেগুলোতে থাকে সাদারা।
অল্প কিছু ব্যাতিক্রম যে নেই তা নয়। অর্থবিত্তের কারনে কিছু কালো হয়ত অভিজাত এলাকায় উঠে আসে। অথবা কিছু গরীব ইন্ডিয়ান হয়ত চলে যায় শহরের পাশের গরীব এলাকায়।
এইখানে বলে রাখা ভালো, সব সাদারাই ধনী কি-না, এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

দশ-
------
নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত সাদারাই ছিল এ দেশের হর্তাকর্তা। ঐ সময়টাকে এঁরা বলে অ্যাপার্থেড, বা বর্নবাদের সময়। সাদারা বড্ড বেশি শোষন চালিয়েছে ঐ সময়টায় কালোদের উপর। আদিবাসী কালোদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম ওরা, তবু এই বাইরে থেকে আসা সাদারাই দেশের শাসনভার পেয়ে গিয়ে, নিজেদের ধন-সম্পদ গড়ে নিয়েছে ইচ্ছেমতো। এবংএই গড়ে নেবার সময়টায় ন্যায় বা অন্যায় মানেনি ওরা, আক্ষরিক অর্থেই গায়ের জোর খাটিয়েছে।
এফ ডবি্লউ সি ক্লার্কের কাছ থেকে ক্ষমতা পাবার পর পরিস্থিতি গেলো পুরো উল্টে। কালোদের সরকার এলো দেশে। কালোরা যেন সব জায়গায় নিজেদের স্থান করে নিতে পারে তার জন্যে শুরু হলো কোটা পদ্ধতি। এটাকে গালভরা একটা নাম দেয়া হলো- ব্ল্যাক এমপাওয়ারমেন্ট। অফিসে লোক নিয়োগে, স্কুল কলেজে ছাত্র কিংবা শিক্ষক বেছে নেয়া, সবতাতেই এক কাহিনি। িক্রকেটের ব্যাপারটাতো একেবারে পুরো বিশ্বের সামনেই ঘটলো!
দীর্ঘকাল ধরে অবদমিত থাকার পরে কালোদের এমন কিছু করার অধিকার জন্মায় কিনা সে প্রসঙ্গ বিতর্ক সাপেক্ষ, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, বর্নবাদ মানে যদি হয় কালোদের শোষন করা, তবে ব্ল্যাক এমপাওয়ারমেন্ট সেই বর্নবাদেরই অন্যরুপ। সেই সময়ে শুধু গায়ের র ংদেখেই মুল্যায়ন করা হোত, এখনো তো তাই হচ্ছে! শুধু তখন সুযোগ পেতো সাদারা, আর এখন কালো।
যখন মনের ভেতর কালোদের প্রতি সহানুভুতি নিয়ে ব্যাপারটা চিন্তা করি, তখন মনে হয় ঠিকই আছে।এত বছর ধরে পিছিয়ে যাবার ক্ষতিটা এভাবে কিছুটা পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করা যেতেই পারে। কিন্তু যখনই মানবতা, অধিকার বা অন্য সব যুক্তি-তর্ক চলে আসে, তখনই আসলে অ্যাাপার্থেড আর ব্ল্যাক এমপাওয়াারমেন্টের মধ্যে আমি কোন পার্থক্য করতে পারি না। মনে হয়, নতুন এক অন্যায়ের মধ্য দিয়ে পুরোনো অন্যায়ের ক্ষতিপুরণ আদৌ কি সম্ভব ?

মজার ব্যাপার, এই দু'টো সময়েই ইন্ডিয়ানরা ছিল মাঝামাঝি অবস্থানে। এটা অবশ্য আমার কথা নয়, আমার বন্ধু কাজানের অভিমত।


এগারো-
------
একেবারে প্রথম দিন ক্লাশে গিয়ে আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। কোথায় গিয়ে বসব ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। ক্লাশরুমে মোট তিনটে সারি, একেবারে বাম দিকে কালোরা, ডানদিকে সাদা আর মাঝখানের সারিতে বসেছে সব ইন্ডিয়ানরা। এমন সুন্দর সুশৃংখল ভাবে ওদের বসে থাকা দেখে আমার মনে পড়ে গেলো, ছোটবেলায় কে কোন বেঞ্চিতে বসবো, সে নিয়ে কি তুমুল ঝগড়াই না হতো স্কুলে। দেশের শিক্ষকরা এক কাজ করলেই পারেন, ধরে বেধে সবাইকে সাদা কালো আর বাদামি রংয়ে চুবিয়ে নিলেই হয়, ঝগড়া থেমে যাবে নির্ঘাত!
সে যাকগে,
নিজের গায়ের রংএর উপর খুব একটা ভরসা করতে পারলাম না, কাছাকাছি মনে হওয়ায় আস্তে করে গিয়ে দাঁড়ালাম বাম দিকের সারিতে। ওরা একটু অবাক হলো, তারপর কি ভেবে ঠেলেঠুলে জায়গা করে দিল।
ক্লাশ শুরু হয়ে গেছে সপ্তাহ খানেক আগে, আমি এসে পৌছেছি দেরিতে, বন্ধুবান্ধবের ভাগ বাটোয়ারা মনে হয় আগেই হয়ে গেছে, আমি হয়ে গেলাম উদ্ধৃত্ত। কোন বন্ধু নেই আমার। দুরদেশে গিয়ে এমন বিপদে পড়ব ভাবিনি। মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াই। পরবর্তী কয়েকটা দিন আমার ঠোকর খেতে খেতে কেটে গেলো। কখনও এখানে কখনো ওখানে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একসময় দেখা গেলো তিনটে গ্রুপেই আমার এক দুজন করে বন্ধু হয়ে গেছে। বলতে মজা লাগছে, ঠিক ছয় মাস বাদে, আমার মনে হলো, ক্লাশে বোধহয় আমার বন্ধু সংখ্যাই সবচে' বেশি !

সাড়ে এগারো-
----------
আমার শেষ মেষ ঠাঁই হয়েছিলো অবশ্য মাঝের সারিতে।
মাঝের সারি, অর্থাৎ, ইন্ডিয়ানদের সাথে।
কিন্তু, আশ্চর্য ব্যাপার, এই মাঝের সারিতেও আবার দুইটি ভাগ ছিল। ইন্ডিয়ান মুসলমানেরা সবসময়ে একসাথে বসত। ওরা ক্লাশে বসে কথা বলত একসঙ্গে, ক্লাশ শেষে বের হয়ে নিজেদের একটা জায়গায় গিয়ে আড্ডা দিত। ওখানে বসেই বাড়ি থেকে নিয়ে আসা খাবার খেত, আবার ক্লাশ শুরু হলে ফিরে এসে একসাথে বসে পড়ত।
গায়ের রংএর পার্থক্যের জন্যে আলাদা বসাটা আমার বোধগম্য হয়েছিলো। কিন্তু র ংমিলে গেলেও হিন্দু আর মুসলমান হবার কারনে মাঝের এই বিভাজনটা আমার হজম করতে বেশ অনেকদিন সময় নিয়েছে। তবু হজম হয়নি বোধহয় শেষ মেষ, বদহজম হয়েছে।
সেই গল্প বলছি শেষে।



(ক্রমশ: )
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০০৬ সকাল ১০:৩২
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা: ইতিহাসের প্রতি অবমাননা।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৪৩

বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা: ইতিহাসের প্রতি অবমাননা।
=======================================
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁরা অমর হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন তোফায়েল আহমেদ। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মহান... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: সব কিছু ভেঙে পড়ে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও - আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের..."

জীবনানন্দ দাশ ''রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলো বরিশালে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বসে লিখেছিলেন। জীবনানন্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার কারণে দিদি হেরেছন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩




আপা এপারের হিন্দুদেরকে স্নেহ করতেন তাতে ওপারের হিন্দু খুশী ছিল। আপা ভারতে বেড়াতে গেলে মোদীর আতিথ্যে আপা খুশী। কিন্তু আপার আতিথ্যে দিদি কোন অবদান রাখলেন না। তাতে হিন্দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×