বারো-
------
আমি যে হলটায় থাকি, সেখানে কালোদেরই প্রাধান্য বেশি। অনেক দুরের লোকেশান থেকে পড়তে আসা ছেলেমেয়েরা থাকে ওখানে। হু, ঐ শব্দটা ঠিকই লিখেছি, ছেলে এবংমেয়েরা থাকে। একই হলে।
দু তিনদিন অবশ্য আমি টের পাইনি ব্যাপারটা। একদিন, দুপুরে ক্লাশ থেকে ফিরে খুব হাসফাঁস লাগছিলো, কোমরে টাওয়েল পেঁচিয়ে গেলাম বাথরুমে। গোসল করব। বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা মেয়ে, বাথরোব পড়া, মাত্র গোসল সেরেছে। আমার হাত থেকে ঠক করে সাবান পড়ে গেল। এ দেশে আবার কারো সাথে দেখা হলে কুশল জিজ্ঞেস করতে হয়, মেয়েটা সে কারনেই আমাকে হাসি দিয়ে বলল, হাই! আমি মনে মনে বললাম , হায় হায়! ভুল করে কোথায় চলে এলাম! সাবান কুড়োতে কুড়োতে সেই হাসির প্রত্যুত্তরে একটা হাসি দিলাম (ওটাকে ভেংচি বললেও আমি মোটেও মাইন্ড করবো না )। তারপর এক দৌড়ে সোজা বাইরে! দেড়তলার রুম থেকে বের হয়ে দোতলার বাথরুমে যেতে যেতে আমি কি করে পথ ভুল করলাম সেটা মাথায় এলো না কিছুতেই!
অবশেষে বুঝেছিলাম, এখানে নর-নারী উভয়েরই বসবাস!
পরেরবার আর সাবান পড়েনি হাত থেকে, আমার ভেংচিগুলোকেও হাসি বলে চেনা যাচ্ছিলো তারপরে ।
তের-
-------
আমি হলে থাকি শুনেই আমার ইন্ডিয়ান বন্ধুরা সব আঁতকে উঠেছিলো! বলো কি- কি সর্বনাশ , এমন একটা ভাব তাদের চোখে মুখে। দুয়েকজন কাছে এসে একটু আপন স্বরে জিজ্ঞেসও করেছিল- তোমার ভয় করে না?
না, আমার ভয় করতো না। বরং বেশ মজাই লাগতো।
হল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় হলের সব ছাত্ররা টিভি রুমে গেছি, এই প্রথম সবার সাথে দেখা। আমি ঢুকবার আগে খুব চেঁচামেচি হচ্ছিল, ঢুকতেই সব থেমে গেলো। ভীষন অস্বস্তি নিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি, সব চেয়ার ভরে গেছে, বসার জায়গা নেই। একজন কি মনে করে আমাকে চেয়ার ছেড়ে দিল, ধন্যবাদ জানিয়ে বসলাম ওখানে। খানিকপর শুনি, প্রায় ফিসফিস করে আমার পাশের জন আমাকে জিজ্ঞেস করছে, তুমি বোধহয় আমাদের হলে একমাত্র ইন্ডিয়ান, তাই না?
আমি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললাম, না, ভুল বলেছ, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, ইন্ডিয়ান নই।
ওর মুখের মেঘ কেটে গেল বলে মনে হল, বাম পাশের জনকে খানিকটা ঘোষনার ভঙ্গিতে বলল, হি ইজ ফ্রম ওভারসীজ ।
নিজের দেশের বাদামি চামড়াদের যে ওদের ভারি অপছন্দ, তা ভাল করে টের পেলাম আরো কিছুদিন পরে।
প্রতিদিন ঘুম ভেঙ্গে দেখি হল ধোয়া-মোছা হচ্ছে, খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতে সেসব করছেন ভয়ানক মোটা একজন কালো মহিলা। ততদিনে শিখে গেছি, ছেলেদের কুশল জানতে হয় " হাউজিট ব্রু " বলে, , যা কিনা ব্রাদারের অপভ্রংশ, আর বয়স্ক মহিলাদের ক্ষেত্রে ওটা হয়ে যায় "মামা'। নাহ, মায়ের ভাই নয়, এই মামা মানে হলো মা, অথবা মা গোত্রীয়।
সেই ক্লিনার মহিলার সাথে যতবারই দেখা হতো, আমি হাসিমুখে সম্ভাষন জানাতাম। কিন্তু কখনো সেই হাসি ফেরত পাইনি।
একবারতো মাত্রই মুছে নেয়া মেঝেতে ভুল করে পা দিয়ে ফেলায় আমাকে ভীষন ভাবে বকা খেতে হলো,অনেক স্যরি বলেও পার পেলাম না।
আমি কিছুতেই বুঝছিলাম না, আমার উপর এমন রাগের কারন কি!
মালদ্্বীপের বন্ধু সুমাইস আর আলি-কে জানালাম এ কথা! ওরা এখানে আছে তিন বছর হয়ে গেল, অন্য হলে থাকে। আমার কথা শুনেতো হাসতে হাসতেই শেষ। বলল, তোমারও একই অবস্থা হয়েছে? তারপর সুমাইস আমাকে বুদ্ধি বাতলে দিল, কোন এক ফাঁকে তুমি ঐ মহিলাকে জানিয়ে দিও যে তুমি বাইরে থেকে এসেছ, এখানকার ইন্ডিয়ান নও,তারপর দেখ কি হয়!
হলো, কাজ হলো, একেবারে জাদুমন্ত্রের মত!
একবার সুযোগ পেয়ে তাঁকে কথাচ্ছলে বুঝিয়ে দিলাম আমি ভিনদেশি। তারপর থেকেই দেখি তার কথাবার্তা বদলে গেল! খুব হাসিখুশি ব্যবহার আমার সাথে, আর মাঝে সাঝেই ফাঁক পেলে সেকি খোশগল্প! তার স্বামীটা যে একদম অকর্মার ধাড়ি, কিন্তু ছেলেটা খুব ভালো, একেবারে মায়ের মতন হয়েছে- এসব কিছুই আর আমার জানতে বাকি রইলোনা!
চৌদ্দ-
-----
কাজান লাখান আর ইয়াকুব সোনি, আমার খুব ভাল বন্ধু ওরা দুজনে।
কাজান আমাকে লক্ষ্মীপুজার দাওয়াত দিয়েছিলো। ওর বুয়া, মানে বাবার বোনের বাড়িতে পেয়ি ংগেষ্ট হিসেবে থাকে। ওর দুপুরের খাবার হিসেবে মাঝে মাঝে পরোটা বানিয়ে দেয়, সাথে সব্জি। ওর বুয়ার বাসার সবাই নিরামিষভোজী। কিন্তু কাজানের খুব মাংস পছন্দ এই নিয়ে খুব দু:খ করে ও।
শুনেটুনে আমি একবার সাহস করে ওকে বললাম, চল, মাংস রেঁধে খাওয়াব তোমাকে। আমার রান্না দেখতে খুব একটা সুন্দর হয় না, কিন্তু চোখটা বন্ধ করে মুখে দিলেই খুব একটা খারাপও লাগে না!
ও খেয়ে খুব খুশি হয়েছিলো।
আর ইয়াকুব হলো আমার গ্রুপমেট। একসাথে ল্যাবে যাই। খুটখাট প্র্যাকটিক্যাল করি। বেশ ভালো ছেলেটা, আর মজার। জুম্মার নামাজের দিন ভার্সিটির ভেতরের খুব সুন্দর মসজিদটাতে একসাথে নামাজ পড়ি আমরা। ইয়াকুব, শোয়েব, আহমাদ, ইসমাইল সবসময় একসাথে থাকে। ওরা সবাইই খুব ভাল।
ক্লাশে আমি বসি লিসোথো-র প্যাট্রিক কাও-র সাথে। কখনো কখনো কাজানের পাশেও বসি। অথবা ইয়াকুবের পাশে। অথবা পাশাপাশি তিনজন। ঠিক পাশাপাশি নয়, ঠিক বামেই হয়ত কাজান বসেছে, তো ডান দিকে দু'তিনটে চেয়ার বাদ দিয়ে ইয়াকুব আর অন্যরা। এরকম। ক্লাশে খুব বেশি কথা হতো না। লেকচার শুনত সবাই মন দিয়ে। লেকচার শেষ হলেই আবার দে ছুট দে ছুট! কেউ ল্যাবে, কেউ লাইব্রেরিতে, অথবা কেউ বারান্দায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া। ল্যাবে আর লাইব্রেরিতে যাবার সময় ইয়াকুব যেত আমার সাথে। ওখানে কাজ শেষে ফিরে যেত ও ওর বাসায়। আমি রুমে গিয়ে বসলে একটু পরে কাজান মোবাইলে মিসকল দিত। বাইরে এসে সিকিউরিটি ডোর খুলে দিতাম আমি। বাড়ি ফিরবার আগ পর্য্যন্ত ওখানে বসেই আমার সাথে গল্প করত।
একদিন, ল্যাব থেকে আমি আর ইয়াকুব ফিরে আসছি। আমার হলের দিকে হাঁটছি। ছোট প্যাসেজটা পার হতেই দেখি কাজান আসছে, বোধহয় আমার হলের দিকেই। আমি হাত ইশারায় ডাকলাম ওকে। ও কাছে এলো। আমি তখনো কথা বলছি ইয়াকুবের সাথে। কাজান পাশে দাঁড়ানো। হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম ওরা নিজেরা কোন কথা বলছে না। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাপার কি বলোতো, তোমরা কথা বলছ না কেন? কেউ কাউকে চেন না নাকি?
ইয়াকুব হেসে বলল, না চিনি তো আমি, ক্লাশে দেখেছি, তোমার নামটা যেন কী?
ক্লাশ শুরু হবার ঠিক আট মাস পরে আমি আমার দু'জন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে পরস্পরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম ! ওদের একজন হিন্দু, আরেকজন মুসলমান! এবংওরা দু'জনেই ইন্ডিয়ান !
পনের-
------
ছোটবেলায় আকাশের তারা দেখতাম মুগ্ধ হয়ে। মনে হত, অসংখ্য আলোর ফুল ফুটে আছে সারা আকাশে। একটার পাশে আরেকটা, জ্বলছে , নিভছে ।
বড় হয়ে জেনেছি, ওরা নাকি আসলে পাশাপাশি নেই। নিজেদের ভেতরে ওদের মধ্যে কয়েক কোটি আলোকবর্ষের দুরত্ব। এত দূর থেকে দেখি বলেই খুব কাছাকাছি দেখায়।
আসলে, ছেলেবেলাটাই খুব ভালো ছিল। নিষ্পাপ মুগ্ধতাই ছিল তখন, অন্য কিছু নয়।
এই যে এখন বড় হয়ে আমি, আকাশের রংধনু দেখেও মুগ্ধ না হয়ে বসে বসে ভাবি, এই রংগুলো কি সত্যি পাশাপাশি, নাকি নিজেদের মধ্যে অসীম দুরত্ব ওদের? তারাদের মতো?
মুগ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে এই ভাবনাটুকু মনে আসার দু:খবোধটাই অনেক বড় হয়ে যায় তখন, মন খারাপ করে দেয়। সত্যিই।
( ক্রমশ: )
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০০৬ সকাল ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




