রুয়ান্ডা থেকে আসা একজনের সাথে ভালো পরিচয় হয়েছিল আমার। কেমন করে যেন আমাদের রান্নার সময় মিলে গিয়েছিল। প্রায় প্রতিদিনই কিচেনে দেখা হতো আমাদের। গল্প করতে করতে সময়টা কেটে যেত। ও আমার মসলার গন্ধের প্রশংসা করত, আমি ওর দেশ নিয়ে হাজারো প্রশ্ন করতাম।পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছিলো ওর। আমাকে বলেছিল 15 দিন পরেই ও দেশে ফিরে যাবে। এখানকার সার্টিফিকেটের খুব দাম রুয়ান্ডায়, নিশ্চিন্তে খুব ভালো একটা চাকরি পেয়ে যাবে।
একদিন সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙ্গায় তাড়াহুড়া করে ক্লাশে ছুটছি, হল-এর নোটিশ বোর্ডে দেখলাম ওর ছবি সাঁটা, তার নীচে ছোট করে কী যেন লেখা। পড়ার সময় ছিল না, ভাবলাম হয়ত রেজাল্ট ভাল করেছে, বা এরকম কিছু, নোটিশ বোর্ডে প্রায়ই এসব কারনে অনেকের ছবি আসে। ক্লাশ শেষে ফিরবার পথে, ওকে কনগ্র্যাচুলেট করতে হবে এরকম একটা ভাবনা মাথায় নিয়ে নোটিশটা পড়ে দেখি, কাল রাতে মারা গেছে ও!
শহরে গিয়েছিল বাজার করতে, ছিনতাইকারীরা ঘিরে ধরে মোবাইল ফোনটা নিতে চাইছিল, ও সম্ভবত একটু গড়িমসি করেছে, ছোরা বসিয়ে দিয়েছে পেটে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সাথে সাথেই, মারা যায় ঘন্টাখানেক পর।
বুকের ভেতর ভীষন কষ্ট হচ্ছিলো আমার, সেদিন কিচেনে গিয়ে রান্না না করে ফিরে এসেছি। বারবার মনে হচ্ছিল, রুয়ান্ডায় একটি পরিবার এখন হয়ত খাবার টেবিলে বসে আনন্দ করছে, তাদের ছেলে ফিরে আসবে ক'দিন পরে। একটি চেয়ার হয়ত খালি পড়ে আছে পরিবারের একজন সদস্যের ফিরে আসার অপেক্ষায়।
ওরা কেউই জানে না, ঐ চেয়ারের সাথে সাথে একজন মায়ের বুকও আজ খালি হয়ে গেল।
*
ডারবান সমুদ্র সৈকতটা খুব সুন্দর। ওখানে আমাদের দেশের রিকশার খানিকটা বড় ও ঝলমলে সংস্করন দেখে আমি খুশি হয়ে উঠেছিলাম। অগণিত ট্যুরিষ্ট কত আগ্রহ নিয়েই না চড়ছে ওটায়!
সৈকতের উপর দিয়ে কেবল্ল কারে করে পুরো সৈকত ঘুরে আসা যায়। সে এক দারুন অভিজ্ঞতা!
সৈকত থেকে জেটি-র মত করে বাঁধানো কাঠের পুল সমুদ্রের অনেক ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। ওটার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে চিৎকার করতে ইচ্ছে করতো, "আয়্যাম দ্য কি ংঅব দ্য ওয়ার্ল্ড!'
মাথার ওপরে গোল হয়ে উড়তে থাকা সাদা পুতুলের মত পাখিগুলোকেও খুব মিস করি এখন। চমৎকার একটি অকাশ আর আবহাওয়া, পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন সংমিশ্রন নেই যেন আর!
জোহানেসবার্গ এয়ারপোর্টের নাছোড়বান্দা কুলিকে পাঁচ ডলার বকশিশ দিয়ে যখন এ দেশে পা রেখেছিলাম, তখনো কি আমি জানি,ঠিক 367 দিন বাদে আমি যখন ফিরতি প্লেন ধরব, পৃথিবীর সবচে' সুন্দর দেশটিকে ছেড়ে যাবার বেদনায় আমার নিজেকে আহত মনে হবে!
*
কেবলই মনে পড়ে যায.....
শরীফ, আলী আর সুমাইসের কথা। আমার চেয়ে মাত্র দু'বছরের বড় সুমাইস। ওর গার্লফ্রেন্ডের ছবি দেখালে আমি খুব প্রশংসা করেছিলাম, " কি আশ্চর্য সুন্দর চোখ তোমার বান্ধবীর!' ওর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল। বেচারা অনেকদিন পর্যন্ত লজ্জায় আমাকে জানাতেই পারে নি ওটা আসলে ওর বিয়ে করা বউ।
নিলোশনি আর মালভির্ন, এই অদভুত ভালো পরিবারটিকেও কখনো ভুলবো না আমি। প্রতিটা মূহুর্তে ওরা আমাকে আপন করে নিয়েছিল ওদের অসীম ভালোবাসা দিয়ে..।
অথবা সেই ছোট্ট ছেলেটির কথা, ইফতারের আগে আগে সবাইকে লুকিয়ে যে পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে দিয়েছিল আমায়,আর কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল, " কাউকে বলো না কিন্তু, আমার কাছে আর বেশি চকলেট নেই।'
ম্পুমালাঙ্গা-র কোন এক ছোট্ট গ্রামের সেই সাদাসিধে মানুষদের কথাও খুব মনে পড়ে। আমরা ক'জন বাঙ্গালি ওখানে যাবার পর ওরা, ওদের বাচ্চারা কাছে এসে হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিল আমাদের। এই আশ্চর্য রংএর প্রানীগুলো আসলে মানুষই কি না, তাই দেখছিলো বোধহয়!
আরো মনে থাকবে সিশি-র কথা, আমারই পাশের রুমে থাকতো, আমার জীবনে দেখা অন্যতম ভালো মানুষ। ফিরে আসবার আগে ও আমাকে বলেছিল, " আমি তোমার মঙ্গলের জন্যে আমাদের ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো।'
আচ্ছা, ইহুদীদের ঈশ্বর বুঝি আমাদের থেকে আলাদা?
প্রতিটি ধর্ম বা বর্ণের মানুষদের জন্যে কি আলাদা ঈশ্বর আছেন?
তাঁদের বর্ণও কি আমাদের মতনই আলাদা?
মানুষেরই মতন তাঁদেরও কি রংধনু আছে?
সাদা, কালো অথবা বাদামী ঈশ্বর?
অথবা হিন্দু, মুসলিম কিংবা ইহুদী ঈশ্বর?
আমার জানা নেই।
আমি শুধু বিশ্বাস করি, এটা বুঝে নেবার দায়িত্ব মানুষেরই।
( সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




