পার্ট : [লিংক=যঃঃঢ়://িি.িংড়সবযিবৎবরহনষড়ম.হবঃ/শড়হভঁংরধংনষড়ম/ঢ়ড়ংঃ/28694893]এক[/লিংক] ও [লিংক=যঃঃঢ়://িি.িংড়সবযিবৎবরহনষড়ম.হবঃ/শড়হভঁংরধংনষড়ম/ঢ়ড়ংঃ/28694897]তিন[/লিংক]।
3।
বাবা চিরকালই খুব নির্বিবাদী মানুষ ছিলেন। শহরের একমাত্র সরকারী কলেজে পড়ান। সারা দিনের পর বাসায় ফিরলে মাঝে মাঝে দুএকজন ছাত্র তার কাছে টিউশান নিতে আসে, তিনি তাদেরকে ঘন্টা দুই সময় দেন, তারপরে পেপার নিয়ে বসে পড়েন - একেবারে রাতের খাওয়ার আগে পর্যন্ত- যতক্ষন না মা তাঁকে তার ঘরে ডেকে পাঠান।
বাবা ও মায়ের মধ্যে নাকি একসময় গভীর প্রেম ছিল - এ কথা আমার কেন যেন বিশ্বাস হতে চায় না। মা বিছানায় শোয়া থাকলেও ভীষন ছটফটে স্বভাবের মানুষ। প্রায় সারাক্ষণই কথা বলে যাচ্ছেন- অথবা কাজের বুয়াকে এটা ওটা বলে যাচ্ছেন। সেই তুলনায় বাবা একেবারেই মৃদুভাষী। কেমন করে যে তাদের মিল হলো!
বাবা মা প্রায়শই বসে বসে অনেক গল্প করেন। গল্প মানে- মা একাই বলে যেতে থাকেন, বাবা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন সেসব। মানুষের চোখ থেকেও যে কখনো ভালবাসা ঝরে পড়ে, এ ব্যাপারটা তখন বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম। প্রায় প্রতিটি কথার মৃদু স্বরে জবাব দিতেন - কিন্তু গলার স্বরেও সেটা টের পাওয়া যেত।
আমার পনের বছর বয়সে যেদিন মা মারা যান- বাবা সেদিন একদম স্থির হয়ে বসেছিলেন সারাদিন। বারান্দার এক কোনায় চেয়ার পেতে। আমাদের নিকট আত্মীয়স্বজনেরা এসে মায়ের দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন, বাবাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়নি।
সারাদিন একঠায় বারান্দায় বসে থেকে- সন্ধ্যার পরে তিনি প্রথম কথা বলে ওঠেন। ক্লান্ত স্বরে আমাকে ডেকে বলেন, আজকের পেপারটা একটু দিয়ে যাবি আমাকে?
আমি সেদিন কোনো এক ফাঁকে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি - মাকড়সাটি নেই আর ওখানে। তারপরে আর সেটাকে কখনো দেখিনি আমাদের বাসায়।
4।
বৃষ্টি ঝরতে থাকে। একটু বাড়ে, আবার কখনও কমে যায়। ভিজে চলা দাঁড়কাকের মতন জি্ষসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে আমরা ক'জন প্রায় ধ্যানমগ্ন মানুষ এই গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে থাকি। দীপু আমার কাঁধে হাত দিয়ে থাকে, এইটুকু স্পর্শকেও যেন ভীষন প্রয়োজনীয় মনে হয় তার। সামনে তাকালে কেবলই অবিরাম বৃষ্টি, চেয়ে থাকার কোন মানে হয় না, তবু আমরা সবাই নিদারুন আলস্যে সেদিকেই তাকিয়ে থাকি। খানিকটা দূরে, প্রায় অস্বচ্ছ অবয়বের অজানা অচেনা কিছু লোক নির্বিকার মনোযোগে মাটি খুঁড়ে চলেছে। তাদের মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু কান পাতলে ঝুপ ঝুপ করে একটা ভোঁতা আওয়াজ পাওয়া যায়। আমি সেই আওয়াজের প্রতি আরও বেশি মনোযোগি হই, অল্প প্রচেষ্টার পরেই সেটাও আমার কাছে সুরময় হয়ে ওঠে, আর তখন আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়।
মা চলে যাবার পরে বুকের মধ্যে একটা শূন্যতার মত তৈরি হয়েছিলো। ঠিক সেই সময় মনে হয়েছিল সেটা আসলে কখনৈ পূরণীয় হবার নয়। কিন্তু তেমনটা হলো না আসলে। কলেজে থাকার সময়টা বা যতক্ষণ বন্ধুদের সাথে থাকা হয়, মাকে মনে পড়তো না। বাড়ি ফিরলেই শুধু একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগতো। আমাদের বাড়ির চেহারাও তেমন একটা বদলালো না। সেই পুরোনো বুয়াই বহাল রইলেন। শুধু বাচ্চা মতন একটা ছেলেকে এনে রাখা হলো ছোটখাট ফাই-ফরমাশ খাটার জন্যে।
বাবার সাথে দেখা হওয়া কমে গিয়েছিল আরও। তিনি আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। আরও বেশি পত্রিকা-প্রিয়। দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। বাবার কয়েকজন বন্ধু এসে তাকে নিয়ে নানা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইতেন, বাবা তেমন একটা পাত্তা দেন নি সেসবে। দু'একজন মুখ ফুটে আবার বিয়ে করার কথাও বললেন, কিন্তু বাবার চোখের পলক পড়ছে বলে মনে হয়নি কখনও।
বছর গড়িয়ে যায়।
আমি তখন সদ্য যুবক। প্রিয়তির সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে ততদিনে। ক্লাশের ফাঁকে খানিকক্ষণ কথা বলা, অথবা কথা না বলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা, সবই আমার কাছে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। রিকশায় পাশাপাশি বসলে যখন আমাদের দুজনের গা ছুঁয়ে থাকে, আমি কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাই। ততদিনে গাঁজা টানাও শিখে গেছি। কিন্তু গাঁজার ঘোরের চেয়েও আমার কাছে প্রিয়তির গা ছুঁয়ে থাকাটা আরো বেশি মধুময় মনে হয়।
একদিন ক্লাশ শেষে - আমরা দুজন বসে আছি। প্রিয়তি কি একটা গল্পের বই পড়ছে আমার সাথে কথা না বলে । আমি সেটা টুক করে কেড়ে নিতে চাইলাম, ও দিলো না, সেটাকে চেপে ধরলো একদম বুকের সাথে। আমি আবারও জোর করতে যেতেই কি যে হলো, আমার হাতের দুটো আঙুল হঠাত্ ওর বুক ছুঁয়ে গেল। দু'জনেই একটু চমকে উঠলাম- তারপর -কিছুই হয়নি - মত করে ও আবারও বই পড়া শুরু করলো। কিন্তু আমার মধ্যমা আর তর্জনীর চমক তখনো কাটেনি। আমি অবাক দৃষ্টিতে আমার আঙুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম- কি আশ্চর্য একটা সুখানুভুতি সেখানে।
সেদিন রিকশায় করে ফিরবার সময় কেউ কোন কথা বলিনি।
বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়েছি- আর খানিক পর পর হাত চোখের সামনে তুলে আঙুল দুটোকে দেখেছি। হঠাত্ খুব বেশি আপন মনে হচ্ছিল ঐ দুটোকে, এমনকি ভাত খাবার সময় যখন খাবার মুখে তুলছিলাম, বারবার মনে হচ্ছিল, এই দু'জন বেশি কষ্ট পাচ্ছে না তো!
রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না সেদিন। বিছানায় এপাশ ওপাশ শুধু একসম খুব তৃষ্ঞা পেলে উঠলাম পানি খেতে। রান্না ঘরে যাবার প্যাসেজটায় এসে দাঁড়াতেই হঠাত্ গোঙানির মত একটা শব্দ শুনলাম যেন। আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে বুঝার চেষ্টা করলাম কোত্থেকে আসছে সেটা।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে বুঝতেই দেখি বাবা বের হয়ে আসছেন হন্তদন্ত হয়ে, এ পাশে আলো না থাকায় আমাকে দেখেন নি - ঘাম দেয়া শরীরে ছুটতে ছুটতে চলে গেলেন নিজের ঘরে। আমি খানিকটা এগিয়ে রান্না ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম- আমাদের কাজের ছেলেটা উঠে বসে হাঁটুতে মুখ গুজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। পাশেই পড়ে থাকা লুঙিটায় চোখ মুছছে শুধু একটু পর পর।
এরকম করেই ঠিক একদিনে দুবার আমার পৃথিবী বদলে গেল।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০০৭ ভোর ৫:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



