অবশেষ নামক ঘর থেকে বহুদূরে যাব। কে থাকছে সেখানে সে গল্প করার প্রয়োজনীয়তা নেই। দেখিয়ে দিতে চাই না অন্য কারো ছায়া, খেলেধুলে বেলা শেষে, অন্য বোলচাল ধরতে বলি এনজেলকে। এখন সহ্য হয় সব নাভিশ্বাস ত্রাহি, রাজেন্দ্রপুর, আমার রাজেন্দ্রপুর - একটা পরিপূর্ণ আস্বাদের দিবস। সবচেয়ে বড় কথা আজ খাবি খেতে খেতে এখানে এলেও পহেলা বৈশাখ যে! বনবাতাসী বলে, ভালই হলো পহেলা বৈশাখে জিলাপী খাওয়াও হলো!
বাকীবিল্লাহর হাতের কাগজের ঠোংগা থেকে একটা যমজ জিলাপী তুলে জলি মুখে দেয় এবং পরক্ষণেই গরমে জিভ পুড়ে ফেলে। তারপরে হাসতে হাসতে বলে, বৈশাখী তাপে জিভ গেলোরে!
বাজারের গুড়ের জিলাপি খেতে মাছিদের ওড়াউড়ি ছেড়ে কাঁচা রাস্তা ধরে পৌছে যাই স্কুল শিক্ষকের বাসায়। বিপ্লবী মানুষেরা নাকি সবসময় আড়ালে আবডালে থাকে, জ্ঞানীদের বিষয়েও এমন কথা শোনা যায়। নিমন্ত্রনকারীকে আমার তেমনই মনে হলো। বনবাতাসীর চেহারায় ক্লান্তি স্পষ্ট। দুপুরের আহার পরিবেশনে আরো কিছুটা দেরী হবে, সে অবসরে বনবাতাসী সামনের রুমের বিছানায় এলিয়ে দেয় শরীর। চোখ বুঁজে পড়ে থাকে। আমি কাছে গিয়ে বসি। জিজ্ঞেস করি, মাথা ধরেছে?
সে চোখ না খুলেই বলে, তাহলে কি করবে?
আমি ভেবে পাই না কি করা যায়। তার জন্য ডিসপ্রিন কিনে ওয়ালেটে নিয়ে ঘুরছি। কিন্তু সে কথা মনে থাকে না। বলি, মাথায় হাত বুলিয়ে দেই!
বনবাতাসী হেসে ওঠে। তাহলে তো বেশী বেশী মাথা ধরাতে হবে!
অন্যেরা ভেতরের ঘরে হৈচৈ করে জিলাপী খায় আর টিভি দেখে। আমি বনবাতাসীর পাশে বসে মাথায় হাত রাখি। কপোলে হালকা চুমু খাই। অবাক হয়ে ভাবি, এতদূর ভ্রমণে তার আরো অসুস্থ্য হয়ে পড়ার কথা, আগের দিনগুলোতো নিদেনপক্ষে কয়েক বালতী বমি তো হতোই!
নারায়নগঞ্জের পাগলাতে একবার ঘনঘন বনবাতাসী আর আমাকে যেতে হয়েছিল। বনবাতাসীর মা'র কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল তাদের একজন রিলেটিভ। কিন্তু ফেরত দেয়ার সময়ে সে টাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। বনবাতাসী তখন চাকুরীতে সবে ঢুকেছে। সারাদিন পরিশ্রমের পরে মাঝেমাঝে তাকে সেখানে গিয়ে টাকার জন্য তাগাদা দিতে হতো। আমিও যেতাম তার সাথে। গুলিস্তান থেকে নারায়নগঞ্জের বাসে উঠতেই তার মাথা ব্যাথা শুরু হতো। আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে পথটুকু পাড়ি দিতো। তার চুলে হাত বুলিয়ে আমি স্পর্শিক আনন্দোলোকের অভিযাত্রী হয়ে যেতাম। বনবাতাসীর চুল থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ আসে, যে গন্ধ শুকে আমি বলে দিতে পারি সে কতক্ষণ আগে গা ভিজিয়েছে, অদ্ভুতভাবে আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো অবেলার কালেও। তখন পোনে এক ঘন্টার যাত্রাকালিন সময়ে বনবাতাসী কোন কথা বলতো না, নিশ্চুপ হয়ে থাকতো রাস্তার জ্যাম, ধুলো আর শব্দের শ্বাপদ আগ্রাসনে।
বনবাতাসী এখন অনেক বেশী সংহত। নিজেকে ফিরে পেয়েছে দুর্দমনীয়ভাবে। শরীরের উপরে নির্ভরতা বেড়েছে ও সামলে উঠেছে। চোখের পাওয়ারফুল চশমা লেসিকারের কল্যাণে যাদুঘরে জমা পড়েছে। বনবাতাসী শুয়ে থাকে, আমি সময়ের ফাঁক গলে হারিয়ে যাই প্রথম দিন ধানমন্ডী লেকের এম্পোথিয়েটারে। তখন আপনি ভার্সেস তুমির দিন। বনবাতাসীকে আমি বলেছিলাম, আমি এখনও একা, সে বলেছিল, আমারও কোন ঝামেলা নেই। মনপবনে তুলে দেই সময়ের শিথিলতা। তোমাকে আস্তে আস্তে তৈরী করবো। প্রথমে দরকার প্রযুক্তির সাথে পরিচয়। বনবাতাসীকে বলি, আচ্ছা, তুমি কম্পিউটার শিখতে না লার্নে?
লার্ন নামে একটা এনজিওর স্কুলে মাস্টার্স পড়ার সময় কিছুদিন কম্পউটারের অফিস প্রোগ্রামটা শেখাতাম। বনবাতাসী সে এনজিওর লেডিস হোস্টেলে থাকতো।
আমার প্রশ্নে সে নীরব থাকে। তারপরে হাসতে হাসতে বলে, আপনি শেখাতেন বলে লার্নের কম্পিটার ক্লাসে যেতাম না!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




