১/১১ এর পরের বাংলাদেশ চিত্র ভিন্ন। রাজনীতিতে মাইনাস টু ধারণার উদ্ভব হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনা ও খালেদাকে বাদ দিয়ে তাদের দুটো দলকে সংস্কার করার চিন্তা শুরু হয়। তবে একই সাথে এরশাদকে বিয়োগ করে রওশন নিজেকে চেয়ারপারসন হিসাবে ঘোষণার মাধ্যমে সম্ভাবনাটা উল্টে এখন প্লাস থ্রিতে রূপান্তরিত হবার সুযোগও হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ বিগত ছাব্বিশ বছর যাবত প্রধান সরকার বিরোধী নেতা হিসাবে নারীকে দেখে এসেছে, তবে পশ্চিমবঙ্গ দেখেছে বিগত একদশক ধরে। মমতা বন্দোপাধ্যায় আর আমাদের তিনজনের মধ্যে গুণগত পার্থক্য আকাশ পাতাল। মমতা যেখানে নিজের নাম নিজে তৈরী করেছেন, আমাদের প্লাস থ্রি সেখানে বুর্জোয়াদের ক্রীড়ানক হিসাবে কেবল লিজেন্ডারী নামের গৌরব পেয়েছেন। মমতার যোগ্যতার সাথে খালেদা-হাসিনার তুলনা অবশ্য ভিন্ন প্রসংগ, বাঙালির নারী নেতৃত্ব সমীক্ষায় সেটা কাজে লাগতে পারে কিন্তু এখানে একদম অপ্রাসাঙ্গিক।
প্রসংগ হচ্ছে ১/১১ এর পরের বাংলাদেশের সরকারী কর্মকান্ডের জবাবদিহিতা একমাত্র সৃষ্টিকর্তার সমীপে নির্ধারিত হয়েছে। জনগণের কথা বলার কোন সুযোগ নেই। বস্তুতপক্ষে যে জনগণ কথা বলে অনিয়মের বিরুদ্ধে একসময় তাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ নেতা হয়ে ওঠে এবং অনেক জনগণের প্রতিনিধত্ব করে। ১/১১ পরবর্তী বাংলাদেশ ব্যবস্থায় এই কথা বলার মানুষ হয়ে উঠেছে প্রান্তিক মানুষেরা। কিন্তু সংঘবদ্ধতার অভাবে তাদের কথা হারিয়ে গেছে, সরকার বিধাতার কর্ণগোচরে প্রবেশ করেনি। যেমন গেছে গুলিস্থানে হকার হত্যার বিষয়ে জনগণের দৃষ্টিপাত। সরকারকে দায়বদ্ধ করার যে জনগণীয় চাঁপ তা থেকে বেশ রিলাক্স থাকতে দেখা গেছে প্রশাসনকে। এবং অতপর তা হারিয়ে গেছে।
আরো একটা বিষয় স্পষ্টতই জনগণের কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করেছে। বারডেমে কর্মবিরতী পালনকারী ডাক্তার ও ভূক্তভোগী রোগীদের ভোগান্তী কিভাবে দেখা হয়েছে এবং সরকার সে বিষয়ে কতটুকু ভূমিকা পালন করতে পেরেছে তার পুরো চিত্রটা অস্পষ্ট। কর্মবিরতী পালনকারী ডাক্তারদের অধিকারের বিষয়টা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত অধ্যায় হলে বলার কিছু ছিল না; কিন্তু পুরো বিষয়টাতে যখন জনগণকে পাঠাবলী হতে হয় তখন আর তা দ্বিপক্ষীয় থাকে না। সরকারকে এই দায়িত্বটুকু স্বরণ করিয়ে দেবার জন্য জনগণের শক্তিশালী প্রতিনিধি দরকার ছিল। কিন্তু দেশ তো এখন সুশীল সুশীল কাজের সেবায় নিয়োজিত, কে শুনবে জনগণের এই সামান্য (?) কষ্টের কথা। তিনচারদিন যাবৎ দূরদূরান্ত থেকে মুমূর্ষ রোগীরা এসে যখন হাসপাতালের করিডোরে বিনা চিকিৎসায় অবহেলায় মরতে থাকে তখন সরকারের স্যাটেলাইট চ্যানেলে মৃত্যুর কালারফুল দৃশ্যবলী দেখা ছাড়া আর কোন দায়িত্ব নেই ভাবার অবকাশ থাকে না।
আজকের বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে পাল্টে যাওয়া চিত্র। তবে এই চিত্র অষ্পষ্ট নির্মাণের; অশক্ত অবস্থানের শংকা ও ১/১১ পূর্ববর্তী সাদৃশ্যতা আনয়নের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয় না। আবারও পশ্চিম বঙ্গের প্রসংগ চলে আসে। সিপিএম এর রাজ্যভর যে সমস্ত অবৈধ কর্মকান্ড চলে তার সোচ্চার প্রতিবাদ দেখতে পাই মমতার কণ্ঠস্বরে; আর বাংলাদেশের জনগণ ঘুমাচ্ছে মরফিন খেয়ে যেন দুঃস্বপ্ন না দেখতে হয়। বড় আশা ঘুম ভেঙে দেখবে ভোজবাজির মত দেশটা পাল্টে গেছে অদৃশ্য হাতে; কিন্তু এই ঘুমের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আমাদের প্রতিরোধের শক্তি যে চিরতরে বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে তার খবর কি কেউ রেখেছে?
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০০৭ বিকাল ৫:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



