somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নীল দেয়াল.. (ছোট গল্প)

০৫ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১১:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ ইউনিভার্সিটিতে দুটি ক্লাস ছিল।ক্লাস শেষে বাসায় ফিরতেই আম্মু বললেন, তোর নামে একটা পার্সেল এসেছে।টেবিলের উপর রেখেছি।টেবিলের উপর ব্যগটা রেখেই পার্সেলটা হতে নিয়ে নেড়েচচেড়ে দেখলাম।পাঠিয়েছে আবির। আমরা একই ক্লাসে পড়ি।অনেক ভালো বন্ধু। ও মাঝে মাঝেই এমন উপহার পাঠায়।তবে কখনোই তা হাতে দেয় না,ডাক যোগে পাঠায়। এতে নাকি তার একটা আধ্যাতিকতা অনুভূত হয়।এর মাঝে অধিকাংশ সময়েই অপরিচিত বই থাকে,সাথে থাকে নিল রঙের কাগজে লেখা তার কবিতা আর গল্প। গল্পই বেশি থাকে। আজও মনে হয় এমনটিই করেছে পাগলটা।



আবির অনেক আলাদা একজন মানুষ।এটা অবশ্য সে নিজেও মাঝে মাঝে বলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে প্রথম দেখে ই বলেছিল, এই মেয়ে, তোমাকে মানুষ কি নামে ডাকে?
আমি অপ্রস্তুত ছিলাম প্রশ্নের এমন আজগবি ধরন দেখে।বললাম,নাজনীন নাহার।কিন্তু সার্টিফিকেটে মোছাম্মত নাজনীন নাহার দেয়া।শুনে চট করে বলে ফেলল,আমি তোমাকে নাজু বলেই ডাকবো।
আমার নামের এই আচমকা ভাঙন দেখে কেমন অন্যরকম অনুভব হচ্ছিল।তবে প্রতিদিন এই নাম ওর মুখে শুনতে শুনতে একরকম নামেরি প্রেমে পরে গিয়েছি।

আমাদের ক্লাসের অধিকাংশ ছেলের কাছেই আবির অপরিচিত।কেউ তার খবর জানে না ।আর ক্লাসের মেয়েরা মনে করতো,আবিরের অনেক ভাব।তাই তাই তাদের সাথে সে কথা বলেনা।আমি অবশ্য তাকে মাঝে মাঝে বলতাম, তুইযে কারো সাথে কথা বলিস না,আমিও যদি ওদের দলে হতাম,তাহলে তোর এই গল্প, কবিতা কে পড়তো, হুম? সে বরাবরের মতই মুচকি হাসি দিয়ে পার পেয়ে যেত।

ওর একটা মজার বদ অভ্যাস হল সব কিছু থেকেই নিজেকে নির্লিপ্ত রাখা।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর পর সবাই টিচারদের সাথে সম্পর্ক ভালো করার জন্য কত কিছুই না করেছিল।আমিওতো আম্মুর আচারের বাটি এক ম্যামকে গিফট করে দিয়েছিলাম।আম্মু অবশ্য পরে অনেক খুজেছে হারিয়ে যাওয়া বাটিটা।
কিন্তু আবির বুদ্ধু জানেই না আমাদের কত জন টিচার ক্লাস নেয়।

প্রতিদিন ক্লাশের শেষ থেকে দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে,তবে ক্লাসে আসে সবার আগে।জানালার পাশের নারকেল গাছটার দিকে প্রায়ই তাকিয়ে থাকতো।আমি অবশ্য এই ভাবিষ্ট ছেলেটাকে একটু আগ্রহ দেখিয়েই সময় দিতাম।সবসময় তার পাশেই বসতাম।কেমন একটা আকর্ষণ ছিল তার চেহারায়।আর আমাকে দেখলেই বলে উঠতো, নাজু,তুইকি আজকেও ভালো আছিস..
ওর এমন অপরিচিত প্রশ্ন দেখে বোকা বোকা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম কিছুক্ষণ।

মাঝে মাঝে অনেক রাগ উঠতো আবিরের উপর।আমাকে বলে রুপা নাকি অনেক সুন্দর।আর প্রতিদিন একবার হলেও কথা বলবেই রুপার সাথে।রুপা ছাড়া নাকি তাকে কেউ বুঝে না।রুপা তার প্রেমিকা।এটা নির্লজ্জভাবেই বলেছিল একদিন আমায়।
একজন মেয়ের কাছে আরেকজন মেয়ের প্রশংসা করলে যেমন লাগার কথা তেমনটিই হয়তবা লগতো আমার। তবে আস্তে আস্তে এই খারাপ লাগাটা বেড়ে চলছিল।

আবির তার ডায়েরিতে কবিতা, গল্প লিখতো। তার কবিতা গল্পগুলো স্বাভাবিক ছিল না।তার গল্পের চরিত্রগুলো সবসময় একা একা থাকতো।কখনো নিজের কাজ নিজে করতে পারতো না।বাজারে যাওয়া,ঘুরতে যাওয়া,এমনকি বাসেও উঠতে পারতোনা।নিজেকে সবসময় নেগেটিভ হিসেবেই উপস্থাপন করতো। এমন অদ্ভুত গল্প আমি কখনোই পড়িনি। এমন মানুষ হয় নাকি কখনো। আমি তাকে এই ব্যাপারে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম।কিন্তু সে তার বিখ্যাত মুচকি হাসি দিয়েই প্রশ্নের উত্তর থেকে পার পেয়ে যেত।
ওর অনেক গল্প পড়েছি। মাঝে মাঝে মনে হত, সে তার গল্পের চরিত্রের মতই আচরন করছে।

একদিন হঠাৎ কম্পাসে আসতে বলল আবির।তারাহুরো করেই গেলাম।এই ছয় মাসে কেমন একটা মায়া জন্মে গেছে পাগলটার প্রতি।
গিয়ে দেখি সে কাদছে বাচ্চাদের মত। যাওয়ার সাথে সাথেই জড়িয়ে ধরে বলল নাজু,আমার রুপার আজ বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আমারো অনেক কষ্ট হচ্ছিল।রুপাকে কতইনা ভালোবাসতো ছেলেটা।

এর পর থেকে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে শুরু করলো আবির। আমি ভাবলাম অনেক ধাক্কা গিয়েছে মনের উপর দিয়ে।কয়েকদিন গেলে হয়তবা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সে একরকম হারিয়ে গেল।ফোন বন্ধ, বাড়িতে ও নাকি কারো সাথেই কথা বলে না। আমারো অনেক কষ্ট হচ্ছিল।

কিন্তু পাগলটা আজ আবার কি যেন পাঠিয়েছে আমার মন ভোলানোর জন্য।মন ভোলানো আবার কি,ও কি আর কোন মেয়ের মন বুঝে।সেতো একটা বুদ্ধু।

শরৎ চন্দ্রের দেবদাসের সাথে একটা নীল কগজ পঠিয়েছে আবির। কাগজটিতে মাঝখান থেকে কিছু লিখেছে মনে হচ্ছে। সে বলতো,কষ্টের রঙ নাকি নীল।তাই এটা তার প্রিয় রঙ।
কাগজটিতে লেখা-
নাজু, তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এই পাগলটাকে কিছু সময় দেয়ার জন্য।তোকে আজ কিছু কথা বলতে বড় সাধ জেগেছে।
আসলে রুপা বলতে বাস্তবে কেউ নেই। অনেক ছোট থেকেই একা একা থাকার অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিলাম। কখনো খেলাধুলা করতাম না।আমি ভাবতাম খেলাধুলা করলে হয়তবা সময় নষ্ট হবে। কখনো কোন ছেলের সাথে মিশতাম না। আমার ধারোনা ছিল সমাজে অনেক অনেক খারাপ মানুষ থাকে।আর আমি তাদের সাথে মিশলে আমিও হয়তবা খারাপ হয়ে যাব।সকল কিছু থেকেই আলাদা থাকার কারনে মানুষ আমাকে ভদ্র ছেলে বলতো।আর এগুলোই ছিল আমার অনুপ্রেরণা।

আস্তে আস্তে যখন কলেজ শেষ করলাম, তখন নিজেকে আবিষ্কার করতে লাগলাম মরুভূমিতে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায়। আমি একা, আমার আশে পাশে কেউ নেই। আমার মস্তিস্ক নিজে থেকেই অনেক কিছু বানিয়ে আমাকে উপহার দিতে লাগলো। রুপা আমার মস্তৃস্কের বানানো একটি নিউরোবিকাল একশন মাত্র। পরবর্তিতে সে ই আমার নিসঙ্গতার সঙ্গী হিসেবে চলছিল।

নাজু, আমি আজ বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি রে। আমি আর পারছিনা।

তার চিঠিটা পড়া শেষ করতেই আম্মুর মুখোমুখি। আম্মু কাঁদছে, আর বলছে আবির নাকি বাইক এক্সিডেন্টে স্পট ডেট। ওর বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল।
আমি কিছুই ভাবতে পারছি না, ও ক্লান্ত বলে ই কি বিধাতা তাকে নিয়ে গেল??

সমুদ্রকোল, তুরস্ক।

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১২:০৮
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে আগামীকাল ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আগামীকাল অপপ্রচারকারীদের খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে। গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারকে কাবু করার দিন ফুরিয়ে এসেছে। 'কাছিমের মতো গর্ত থেকে বের হয়ে' যারা এতদিন সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্ত-গায়েব-গুম এবং পিওর ও শিওর লাভ

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:১৬


৭ মাসে বাংলাদেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ !!!
এমন রোমহর্ষক, চমকে যাওয়া এবং অন্তরে কাপুনি ধরানোর মতো তথ্য বা কথা বার্তার কোনও মানে হয় ??!!
গরীব পরিবারের শিশুদের কথা বাদ দেই-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারী অফিসারদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০০

দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সরকারী অফিসারদের হাত ধরেই হয়। সেজন্যে, এই পদগুলো যোগ্য মানুষদের হাতে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, গত কয়েক দশকে দেশের টপ ট্যালেন্টদের বেশির ভাগই কোনক্রমেই সরেকারী অফিসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×