খুব ছোটবেলায় নয়, একটু বড় হয়েই হঠাৎ গান শেখা শুরু করেছিলাম। বোধহয় তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়তাম। বাসা থেকে দুরে হলেও একসময় একটা একাডেমীতে, হিন্দোল সংগীত একাডেমী, ভর্তি হয়ে গেলাম। আমি খুবই মনোযোগী শিার্থী ছিলাম। একটু শুনেই সুর মনে রাখতে পারতাম, হারমোনিয়ামের উপর সংগীত শিক্ষকের হাতের চালনা মনে রেখে নতুন শেখানো গান শিক্ষক দেখানোর আগেই তুলে ফেলতে পারতাম । এসব কারনেই হয়ত টানা 2/3 বছর আমি প্রথম হয়েছিলাম । তবে ক্ল্যাসিকাল -এ আমার ভয়েসটা একটু হালকাই মনে হত।
এমনি সময় অবলীলায় গাইলেও পরীক্ষার সময় হাত প্রচন্ড কাঁপত। তবে মজার ব্যাপার ছিল, তাল-লয়ে ভুল করতাম না, এমনকি গলা অযথাই শুকিয়ে আসলেও গান থামতনা।
শিল্পকলা একাডেমী, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে আমাদের একাডমী থেকে প্রায়ই অনুষ্ঠান হতো। সেই সুবাদেই শবনাম মুসত্দারী, নাশিদ কামাল, ফেরদৌসী রহমান , এঁনাদের গান সামনা সামনি উপভোগ করার, কিনবা কথা বলার কিনবা ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলাম।
আমি নজরুল সংগীত শিখতাম । জনপ্রিয় নজরুল সংগীত শিল্পী খালিদ হোসেন একাডেমীর শিক্ষক ছিলেন। অসম্ভব মজা করতেন উনি । একটা গান যখন প্রথম শেখাতেন তখন আমাদের বলতেন সুর মনে রাখতে এবং গানের প্রতিটা লাইন কোন সুর থেকে শুরু হচ্ছে অনত্দত সেটা মনে রাখতে। পরবর্তী ক্লাসে আমরা কতটুকু করতে পারলাম সেটা দেখে নিয়ে উনি সেটা শুধরে দিতেন। সঙ্গত কারনেই , খালিদ স্যার গান শুরু করলেই সবার চোখ থাকতো হারমোনিয়ামে উনার হাত কোন কোন সুরকে স্পর্শ করে তা বুঝে নিতে। এখানেও স্যার দুষ্টুমি করতে ছাড়তেন না । গান গেতে গেতে, হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে হঠাৎ করেই উনি চোরা চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে, একহাত দিয়ে এমনভাবে হারমোনিয়ামকে আড়াল করতেন যাতে কিভাবে বাজানো হচ্ছে সেটা আমরা বুঝতে না পারি। আর তা দেখে সারা ক্লাসে হাসির রোল পড়ে যেতো।
প্রতি পহেলা বৈশাখে স্বভাবতই আমাদের একাডেমী থেকেও রমনার ওদিকটায় ভোরবেলা অনুষ্ঠান হতো। আমাদের শিক্ষিকা কলি আপা ফাইনাল রিহার্সেল এর দিন বিশেষ করে মেয়েদের বারবার বলে দিতেন, তোমরা কিনতু খুব সুন্দর করে সেজে আসবে, চুলে ফুল দিবে ...। খালিদ স্যার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এখানেও বলতেন, যারা শাড়ী পড়তে পারোনা তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে, এক মোটা, কালো, লম্বা ,ভুরিওয়ালা ও বিশাল কালো মোচওয়ালা লোক থাকবে, যে সবাইকে শাড়ী পরিয়ে দেবে ...।
এখনও মনে আছে, সেই ভোর চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠতাম। ঘুম জরানো চোখে তাড়াতাড়ি সাজুগুজু করে সাড়ে ছ'টা থেকে সাতটার মধ্যে পৌছে যেতাম ।
আমাদের অনুষ্ঠানটা একটা মহুয়া গাছের নীচে হত। মোটামুটি বড় একটা মঞ্চ হতো, আমরা সবাই তাতে পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই বসে থাকতাম । উপড়ে প্যান্ডেল টানানো ছিল । মহুয়া গাছে বাস করা অদ্ভুত, ছোট ছোট পোকাগুলো থপ থপ করে সেই প্যান্ডেলের উপর পড়ত আর আমরা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম।
যখন ইউনিভাসিটিতে ভর্তি হলাম, সেই সময়টায় হরতাল একটু বেশীই হত। সেমেস্টার পদ্ধতিতে সময়ের সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই ইউনিভার্সিটি মেক-আপ কাস পদ্ধতি শুরু করল। অনেক শুক্রবারেই ক্লাস করতে হয়েছে। এমনকি সন্ধ্যা সময়ও। এসব কারনে শুক্রবারে গানের ক্লাসে যেতে পারতামনা। বাসায় গান প্রাকটিস করাতেও আগের মত সময় দিতে পারতাম না। নতুন নতুন গানগুলো আমার অনুপস্থিতেই শুরু ও শেষ হতে লাগল। এরকমভাবে চলতে চলতে পরীক্ষায় যখন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় থেকে এক সময় পঞ্চমে নেমে এলাম তখন মনটাই খারাপ হয়ে গেল। গানের ক্লাসে বাসা থেকে কেউ না কেউ আমাকে পৌছে দিত । তাদের ব্যসত্দতাও আরেক বাধা হয়ে দাঁড়াল তখন। শেষে বন্ধই করে দিলাম একাডেমীতে যাওয়া।
অনেক বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসলে গান শিখিনি। গাইতে জানার আগ্রহেই শেখা। সেটা আর হয়ে উঠলোনা শেষ পর্যনত্দ। তবে তাতে কি ! স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক আমি। আমার গান গাওয়া তো কেউ থামিয়ে রাখতে পারবেনা। একসময় ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের কান ঝালাপালা করে দিতাম। এখন আমার কিছু কিছু সহকমর্ী কান বন্ধ করে পালিয়ে বাঁচে । সময়ের স্রোতে গলায় সেই কারুকাজ নেই, সুরও তেমন পোক্ত নয়, কিনতু তাতে কি ! আমাকে থামায় কার সাধ্য... ?
যাই হোক, এখন আর সেই ভোর বেলায় বৈশাখী অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া হয়না। তবে, প্রতি বৈশাখেই মনে পড়ে সেই সৃত্মিগুলো । আর আমার সেই হারমোনিয়াম এখনও সেসময়ের সাক্ষী হয়ে আছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



