একটা ব্যাপার আমাকে খুব বিরক্ত করছিল; ফ্রিজটা খুব বেশী এলোমেলো, বোঝা যাচ্ছিল বাসি খাবারে ভরে উঠছিল। ওরা মাঝে মাঝে আমার ফ্রাইং প্যান ব্যবহার করত; আমিও। কেউ কেউ সেটা ঠিকমত ফেরত রেখে দিলেও একবার কে জানি প্যান ভর্তি করে তেল রেখে দিল দিনের পর দিন। সয্য করা মুশকিল ছিল আমার জন্য কিন্তু আমি ফ্রাইং প্যানটি ওভাবেই রেখে দিলাম। হোস্টেল সুপাভাইজার (আবাং নিজাম ; আবাং অর্থ ভাই) থাকত আমাদের একটা বাড়ির পর। মাঝে মাঝে রাতে এসে একটু মিটিং করে যেতো সবাইকে নিয়ে। এরকম মিটিং -এ একবার ফ্রিজের ব্যাপারটা বলেই ফেললাম সবাইকে। সবাই একমত হলেও কেউ বুঝতে পারছিল না বোধহয় কে ফ্রিজ পরিস্কার করবে। এভাবেই আরো কয়েকদিন চলল। আমি হঠাতই বুদ্ধি করে একটা নোটিস কম্পোজ করে ফ্রিজের গায়ে এঁটে দিলাম। রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়ে আমার দেখা যাবতীয় অসংগতিগুলো তুলে ধরে একটা নির্দেশাবলীও দিয়েছিলাম। রাতে দেখলাম মেয়েরা সেগুলো এক এক করে পড়ছে। পরদিন শনিবার; ছুটির দিন ছিল। একটা লম্বা ঘুম দিয়ে একটু বেলা করে উঠে নাস্তার ব্যবস্থা করতে নীচে নামলাম। যে দৃশ্য দেখলাম তাতে নিজেই হেসে উঠলাম; আমার নোটিস কাজে দিয়েছে। দুজন মেয়ে ফ্রিজে রাখা সব খাবার, প্যাকেট, বোতল বের করে ফেলেছে। আমি দুটো বিস্কিট আর পানি খেয়ে তাড়াতাড়ি ওদের সাথে যোগ দিলাম। অনেক পচা খাবার, ফলমূল ফেলে দেয়া হলো, ফ্রিজের ভেতরে-বাইরে, প্রতিটা ট্রে, বক্সগুলো পরিস্কার করা হলো। এ ব্যাপারটা আম্মাকে ফোনে বলাতে প্রথমে চিন্তায় পড়ে গেল, এরকম ফ্রিজের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি এই আশংকায়। পুরোটা বলার পর আম্মা আস্বস্ত হলো। নিজদেশের বাইরে গিয়েও আমার মাতবরী স্বভাবের কোন পরিবর্তন হয়নি সেটা আম্মা বুঝতে পারছিল।
মালয়শিয়া আসলে মিশ্র জাতির দেশ। মুসলিম মালয়দের ভুমিপুত্রা বলা হয়। এছাড়া ইনডিয়ান (তামিল) ও চাইনিজ মালয় রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। ইনডিয়ানদের কারনেই হয়ত হিন্দি মুভি এখানে বেশ সাড়া জাগায়, এমনকি মালয়দের মধ্যেও; আর শাহরুখ খান বলতে তো মেয়েরা পুরো পাগল ! শনি, রবিবারে দুপুরবেলা টিভিতে হিন্দি মুভি দেখানো হতো। হোস্টেলের মেয়েরা হিন্দি বুঝতোনা ভাল; ওরা জানত আমি হিন্দি বুঝি তাই হিন্দি মুভি শুরু হলেই আমি সামনে না থাকলে কেউ না কেউ আমাকে ডাকতে যেতই; বলত – আইরিন, হিন্দুস্তানী ...
বসার ঘরে দুটো টিভি ছিল আমাদের ; একটা বড় কিনতু সাদাকালো, অপরটা ছোট তবে রঙিন। সাদাকালো দেখে মন ভরেনা স্বভাবতই, ওদিকে ছোট টিভির একটা বড় সমস্যা ছিল- শব্দ হতোনা। শেষে আমরা দুটো টিভিই একসাথে চালিয়ে রাখতাম, রঙিন টিভি ছিল দেখার জন্য আর সাদাকালো টিভি হলো শোনার জন্য।
প্রতি শনিবার (মাঝে মাঝে রবিবার) বিকালের পর আইসক্রিমওয়ালা টুংটাং টুংটাং করে বাড়ির সামনের রাস্তায় চক্কর দিত। আর আমরা সবাই হুড়মুড় করে বার হয়ে যেতাম আইসক্রিম কেনার জন্য। ব্রেড দিয়ে আইসক্রিম খাইনি আগে কখনও। একটা লম্বা ব্রেডের মাঝে কেটে দিয়ে আইসক্রিম দেয়া; খারাপ ছিলনা কিনতু।
সবদিন মুভি দেখতে ভাল লাগতোনা। তাই বিকালের পর আমরা কয়েকজন মিলে বাড়ির সামনের জায়গাটুকু আর সামনের রাস্তায় নেমে পড়তাম ব্যাটমিন্টন আর ভলিবল খেলার জন্য (জীবনের প্রথম ভলিবল খেলা); দু’একবার ফুটবলও খেলেছিলাম। ওরা আমাকে একটা স্থানীয় খেলা শিখিয়েছিল, নামটা মনে পড়ছেনা এখন। অনেকটা দাড়িয়াবান্ধা ধরনের খেলাটা তখন আমাকে সেই স্কুল জীবনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল বারবার।
ওদের সাথে থাকতে থাকতে অনেক মালয় শব্দই শিখে গিয়েছিলাম। SURIA KLCC(TWIN TOWER SHOPPING MALL[) -র থেকে প্রায় ১৪ রিংগিত দিয়ে মালয় ভাষা শেখার একটা বইও কিনে ফেলেছিলাম। একবার ব্যাটমিন্টন খেলছিলাম; যার সাথে খেলছিলাম মেয়েটা আমার চেয়ে একটু কম বয়সী ছিল, আমাকে বেশীরভাগ সময় সিসটার বলে ডাকত। প্রচন্ড ফর্সা, একটু ছোটখাট, হালকা-পাতলা গড়নের ছিল মেয়েটি। আমি ওর তুলনায় একটু লম্বাই ছিলাম, তাই একটু জোরে আর উঁচু করে মারলেই সেটা সামাল দেয়া ওর জন্য কষ্টকর ছিল। ও খেলতে খেলতেই মালয় ভাষায় আরেকজনকে কিছু বলল। আমি দুটো শব্দ ধরতে পারলাম- আইরিন ও তিংগি ; তিংগি অর্থ উঁচু । বুঝলাম ও কি বলছিল। হেসে আমিই বললাম এবার একটু আস্তে ও নীচু করে খেলব। বেচারী সাথে সাথে লাল হয়ে গেল আর অন্যরা খুব মজা পেয়ে হাসছিল।
টুইন টাওয়ার এতটাই বিশাল আর উঁচু ছিল যে, কুয়ালামপুরের অনেক কোণা থেকেও তা দৃশ্যমান; মনে হয় এইতো সামনের মোড় পার হলেই...। এই হোস্টেলের আমার রুমের বারান্দা থেকেও দেখা যেত। মন খারাপ হলে কিনবা একা একা মনে হলে রাতে বারান্দায় বসে টুইন টাওয়ার দেখতাম ।
মালয়শিয়ায় প্রথমদিনে সাতটার সময়ও বাইরে পরিস্কার আলো দেখে অবাক হয়েছিলাম । পরে ল্ক্ষ্য করে দেখলাম সোয়া সাতটার পর ঝুপ করেই সন্ধ্যা নামে ওখানে। রাতের আবহাওয়াটা আমার কাছে ভীষন রোমান্টিক মনে হত। প্রায় প্রতিদিনই একবার হলেও বৃষ্টি হবেই। একবার এক পশলা বৃষ্টির পর হোস্টেল ফিরছিলাম। কাছাকাছি আসতেই দেখি আকাশে রঙধনু, ঠিক মনে হচ্ছিল বাড়ির পেছনেই । পড়ন্ত বিকালে, অর্ধবৃত্তাকার রঙধনু এতটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল যে আমি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম এক মুহূর্ত। মনে হচ্ছিল হোস্টেলের পেছনে গেলেই রঙধনুর বাকি অংশটা দেখা যাবে...।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৫:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




