চোখে রোদ পড়তেই ভুরু দুটো কুচকে উঠলো ঝিমলীর। আরমোড়া ভেন্গে পাশ ফিরতে ফিরতেই মায়ের ডাক কানে আসে, কিরে আর কত ঘুমাবি ? অফিস যাবিনা আজ ? বালিশটা চেপে ধরে ঘুম ঘুম বিরক্তি জড়ানো গলায় ঝিমলী উত্তর দিলো , উফ মা , কালই না তোমাকে বললাম আজ দেরি করে অফিস যাবো , একটা আ্যপোয়েন্টমেন্ট আছে সকালে, ক্লায়েন্ট মীটিং , ওটা শেষ করে এরপর যাবো। এখন চেচিয়ে আমার আরামের ঘুমটা নষ্ট করোনা তো । মা আর কথা বাড়ালোনা, তার মেয়েটাকে তো তার থেকে বেশী আর কেউ চেনেনা , নিজের ইচ্ছার বাইরে ওকে দিয়ে কিছু করানো একেবারেই অসম্ভব। কারো কথা না কানে নিয়ে অনার্স পাশ করেই হুট করে চাকরী নিয়ে নিলো।আর এখন মাস্টার্সের ক্লাস আর চাকরী দুটো সামলাতে মেয়ের জান ওষ্ঠাগত, তবু কি নিজের জেদ ছাড়বে ! আর অদ্ভুত স্বভাব হয়েছে মেয়েটার, স্বাভাবিক সবকিছুই যেন চোখের বিষ , চাকরী দেখেশুনে যেটা নিলো সেটা বেদম খাটুনি আর একরাশ টেনশন। আর পন্ডিত মেয়ের কথা হচ্ছে যেখানে থ্রিলিং নেই, মাথা খাটানো নেই, ডমিনেশন নেই, কমপিটিশন নেই সেটা হবে ডিসটিলড ওয়াটার টাইপ জায়গা , আর ওরকম জায়গায় বসে বসে মাস মাস টাকা নেবার কোনো ইচ্ছা তার নেই। জব নাকি তার কাছে ফান হতে হবে, এই ফান ফান নিয়েই মেয়েটা যেন আর বড় হয়ে উঠলোনা এখন পর্যন্ত।
এক চোখ খুলে মিটমিট করে ঝিমলি মায়ের দিকে তাকালো , হালকা পায়ে ঘুরে ঘুরে রাজ্যের জামাকাপড় গুলো গুছাচ্ছেন আর নিজের মনেই বিড়বিড় করছেন। একটু হেসে আবার চোখ বন্ধ করলো সে, জানে , মা এখন কি কি আওড়াচ্ছেন মনে মনে। গোত্রছাড়া মেয়ের মা হয়ে সারাক্ষন যে তাকে নিয়ে উনি চিন্তায় থাকেন সেটা তো সে ভালো করেই জানে। আসলে মা তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। সারাদিন কি কি করেছে , সবটুকু মা কে উগরে না দেয়া পর্যন্ত সে নিজেই সস্তি পায়না। চোখ বন্ধ করে মনে মনে আজকের সারাদিনের প্ল্যানটা ছকে নিল ঝিমলি। ১০ টার দিকে বের হয়ে সটান চলে যাবে গুলশান এ , অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আজ শেভরনের মার্কেটিং ম্যানেজার সারাহ ম্যামের আপো নিতে পেড়েছে সে। যে করেই হোক এবছরের বিগ্ঞাপনের টেন্ডার টা তার চাইই চাই। সারা বছর না করে হলেও ১৫ থেকে ২০ লাখের আ্যড দেয় তারা। কোনভাবে তার আ্যড এজেন্সীতে যদি কাজটা ম্যানেজ করে তুলে নেয়া যায় , তাহলেই কেল্লা ফতে। ভাবতেই মজা লাগছে জবে ১ বছর সিনিয়র শুভর ব্যাপারটা কেমন লাগবে। আসছে পর থেকেই দেখছে ভাইয়াটা সারাক্ষন নজরদারি করছে তার আ্যচিভমেন্টগুলো। মাঝেমধ্যে চান্স পেলেই ঠেস দেয় এসবকিছুই নাকি মেয়ে হবার কারনে এতো জলদি সে আ্যচিভ করতে পারছে। ছ্যাহ্ ! হিংসুটে একটা ! মেয়ে হবার জন্য কোনো এক্সট্রা খাতির কোথাও সে পায়নি, বরং আরো অনেকের সাথে রীতিমত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে কাজগুলো যোগাড় করে সে। মূলত তার কমুনিকশেন মেথোড টাই এখানে মূখ্য। যাক, এসব এদের বোঝানোর সময় তার নেই। যা ইচ্ছা তা ভাবতে থাকুক।
ভাবতে ভাবতেই শুনতে পেলো , ডাইনিং রুমে তার সুরে ফোনটা বাজছে। এতো সকালে কার ফোন কে জানে ! মা ফোনটা ধরেছে, গলা তুলে জিগ্ঞেস করছে কাকে যেন কখন আসবে। নাহ , আর ঘুম হবেনা, বোঝা হয়ে গেছে। বিছানায় উঠে বসতেই আয়নায় চোখ গেলো , একরাশ উমরো ঝুমরো চুল , ফোলা ফোলা গাল আর ছোট্ট থুতনি , শুকনো নয়, বরং বেশ মোটার ধাতই তার। চেষ্টা করেও ভাত খাওয়া থামাতে পারেনা সে। যাকগে , ভুতের বাচ্চা তো নয় দেখতে , এটা ভাবতেই মৃদু হাসি ফুটে উঠলো মুখে। অফিস কলিগ রিয়াজ, দেখতে লোকের চোখে বেশ হ্যান্ডসাম, তবে তার কাছে খুবই মাকালু টাইপ লাগে। এতো ফরসা কোনো ছেলেকে দেখলেই তার টিকটিকির কথা মনে পড়ে যায়। কয়দিন ধরেই বোকা টা মনের চিন্তা এবার সবার সামনেই প্রকাশ করতে শুরু করে দিয়েছে। হাবাটা এটাও বুঝছেনা যে সবাই ওকে নিয়ে মজা করছে। ধেত্ মানুষ প্রেম-ভালোবাসা এসব ফালতু চিন্তা ভাবনায় কেনযে এতো টাইম নষ্ট করে। বারবার বলেও ঝিমলি তাকে বোঝাতে পারেনি যে সে একেবারেই রিয়াজকে বিশেষ চোখে দেখেনা। এরপরো যদি এমন পাগলামি কেউ করতে চায় , করুকগে, তার দায় ঝিমলির নাকি !ইস...!
কিরে , বিছানা না ছেড়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে একা একা এমন হাসছিস কেনরে ?? মার অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে একঝলক হাসি ছুড়ে দিয়েই বললো, সকালে কি খাবো ?? মার রাগ রাগ গলায় এবার অভিমান ঝলকালো, ওহ মার সাথে কথা বলার সময় খালি খাবারের কথাই মনে হয়, মা যেন আর কিছুর জন্য না তাইনা ! হিহিহিহি...উঠে যেয়ে মাকে এবার জড়িয়ে ধরলো ঝিমলি, আরে তুমি তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড , সবই তো তোমাকেই আগে বলি। মার রাগটা এবার হাসিতে রুপান্তরিত হলো, হয়েছে, আর আল্লাদি করতে হবেনা। জলদি যাও ফ্রেশ হয়ে নাও, একটু পরই বাবা চিতকার শুরু করে দেবে খাবার টেবিলে সময়মত না দেখলে।
চলতেই থাকবে .....!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


