somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

লোকমানুষ
ফুটপাতের ধুলোয় লেপা এক টুকরো রোদ, বাসার কোণে জমে থাকা অলস সকালের মতো। জীবনের হিসাব নিকাশে পেন্সিলে-টানা অঙ্ক, কখনো হার, কখনো জয়— সবই সামান্য এক ইতিহাস। এই তো আমার গল্প, সবার মতোই অসম্পূর্ণ, তবু স্বাদে ভরা।

শূন্য সোফার রুম এবং হারানো এক আলোকবর্তিকা

২৬ শে মে, ২০২৬ রাত ১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



জানালার কাচে তখনো বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো আলতো করে টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও প্রকৃতির বুকে যে উন্মাতাল তাণ্ডব চলল, তাকে একরকম রূপকথা বলেই ভ্রম হয়। দমকা ঝড়ো বাতাস, মেঘের গুরুগুরু গগনবিদারী গর্জন, আর সাথে বুক কাঁপানো দুই-একটি বজ্রপাত -সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিল এই আধঘণ্টায়।

তারপর হঠাৎ করেই শান্ত। আকাশ তার রাগ ঝেড়ে এখন হালকা, শান্ত। ঘরের কোণে জমে উঠেছে একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া, যা গায়ে লাগলেই কেমন যেন একটা আলসেমি জড়িয়ে ধরে। মন বলে, এই চমৎকার ঠান্ডা আবহে কম্বলটা গায়ে টেনে দিয়ে একটা লম্বা, নিটোল ঘুম দেওয়া যাক। কিন্তু চোখ বুজলেই কি আর ঘুম আসে? কিছু কিছু আবহাওয়া আসলে ঘুমের চেয়ে বেশি জাগিয়ে তোলে ভেতরের মানুষকে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্মৃতির ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তাকে তুলে ধরে মনের দৃষ্টিতে।

যেমন আজ এই বৃষ্টির শেষলগ্নে এসে বুকটা কেমন যেন হুঁ হুঁ করে উঠল। খুব মনে পড়ছে আম্মাকে।

আসলে ‘ইদানীং মনে পড়ছে’ বলাটা ভুল হবে। আম্মা চলে যাওয়ার পর থেকে জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যেখানে তার ছায়া আমি খুঁজে না। এখন প্রতিটা ছোটোখাটো কাজেই আম্মা অবধারিতভাবে চলে আসেন। কোনো একটা কাজ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি, ‘আচ্ছা, আম্মা থাকলে তো কাজটা এভাবে করতেন না, তিনি হয়তো অন্য কোনো সহজ উপায়ে করে দিতেন!’ কিংবা কোনো জিনিস অগোছালো দেখলে কানের কাছে যেন মায়ের সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, ‘এটা এখানে রাখছিস কেন? ঐখানে রাখ।’ অথবা কোনো কাজে আটকে গেলে মনে হয়, আম্মা থাকলে ঠিকই এই সমস্যার কোনো সমাধান বলে দিতেন। এই রকম হাজারো হাবিজাবি, টুকরো টুকরো ভাবনা এখন আমার একাকিত্বের সঙ্গী।

তবে আজকের এই ঝড়-বৃষ্টির রাতটা যেন আম্মার স্মৃতিকে বড্ড বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। আম্মাকে আমাদের চেনা-পরিচিত সবাই খুব সাহসী এক নারী হিসেবেই জানত। যে কোনো বড়ো বিপদ বা কঠিন পরিস্থিতি তিনি এত ঠান্ডা মাথায় সামাল দিতেন যে, অবাক হতে হতো। দেখে মনে হতো, তার কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন এক অদ্ভুত জাদুবলে সবটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অদৃশ্য কেউ একজন এসে তার হয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতো, এই পাহাড়সম সাহসী মানুষটারও একটা দুর্বল জায়গা ছিল। ঝড়-বৃষ্টির সময় আম্মাকে আমার বড্ড ভীতু মনে হতো। যদিও তিনি মুখে কখনো ভয়ের কথা স্বীকার করতেন না, চোখে-মুখেও ভয়ের কোনো রেখা ফুটতে দিতেন না, তাও একজন সন্তানের চোখ তো! মায়ের ভেতরের চাপা অস্থিরতাটুকু আমি ঠিকই টের পেতাম।

সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফোটে, আবার পরক্ষণেই চোখটা ভিজে আসে। বজ্রপাত শুরু হওয়া মাত্রই নিয়ম করে এলাকার বিদ্যুৎ চলে যেত। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার আগেই আম্মা তড়িঘড়ি করে এসে বসতেন আমাদের ড্রয়িংরুমে, যেটাকে আমরা বলতাম ‘সোফার রুম’। সোফার রুমে বসেই উচ্চকণ্ঠে বাড়ির সবাইকে ডাকতেন, ‘কই রে তোরা, সব এখানে আয়!’

আম্মার ডাক শোনামাত্রই আমরা যে যেখানে থাকতাম সবাই মিলে টর্চ, চার্জার লাইট কিংবা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সেই সোফার রুমে গিয়ে জড়ো হতাম। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অন্ধকার ঘরটা আলো আর মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠতো। এরপর শুরু হতো এক তুমুল আড্ডা। বাচ্চারা আলো-আধারেই নিজেদের মতো খেলা শুরু করে দিতো, চিৎকার করত, ঝগড়া করতো আবার খুনসুটিতে মেতে উঠত।

আম্মা কখনো কখনো সোফায় কিংবা মেঝেতে বসতেন। বাকিরা যে যার সুবিধা মতো জায়গা করে বসতো। তারপর আম্মা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করতেন। কত গল্প বলতেন, কত মানুষকে নিয়ে বলতেন, কত-কত সময়কে নিয়ে বলতেন। কী ছিলো না তার সেই টুকরো টুকরো কথায়! আমি সাধারণত সেসব আড্ডায় খুব একটা কথা বলতাম না, নিজের মতো এক কোণে বসে আম্মার গল্প শুনতাম, বাচ্চাদের আনন্দ দেখতাম, মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে রাখতাম, আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে আম্মাকে একটু দেখতাম। অন্ধকারের মাঝেও আম্মার হাসিমুখটা দেখতে বড্ড ভালো লাগত।

আম্মা শুধু আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন এমন না, বরং ঝড়ের মাঝেই মোবাইলে কাছের-দূরের আত্মীয়, পরিচিত সব মানুষকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতেন। কে কেমন আছে, কার বাড়ির চাল উড়ে গেল কি না, কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো কি না -এমন সব খোঁজ-খবর নেয়া চলতো। পুরো ঘরটা তখন এক অদ্ভুত ওমে, ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকত। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির হুংকার তখন আর আমাদের ছুঁতে পারত না।

আজ আম্মা নেই, দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। প্রকৃতিতে আজও ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে চারদিক আগের মতোই অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের আর সেই সোফার রুমে একত্রে বসা হয় না। সত্যি বলতে, এখন আর ওভাবে বসতে ইচ্ছেও করে না। যে মানুষটাকে কেন্দ্র করে আমাদের সেই অন্ধকারের উৎসব জমে উঠত, সেই মানুষটাই যখন নেই, তখন সোফার রুমের ওই শূন্যতাটুকু বড্ড বেশি কামড়ে ধরে। সবার হৃদয়ে আলো জ্বালানোর মানুষটাই আজ অন্ধকার ঘরে একাকী নিদ্রা যাপন করছে।

মাঝে মাঝে এই রকম দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির রাতে বুকের ভেতরটা বড্ড বেশি হাহাকার করে ওঠে। তীব্র ইচ্ছে জাগে, সব ফেলে এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই ছুটে যাই আম্মার কবরের পাশে। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, যেভাবে একসময় সোফার রুমে এক কোণে বসতাম। আম্মার মাটির বিছানার পাশে বসে বলি, ‘আম্মা, ডরাইয়েন না। এই বৃষ্টি একটু পরেই থাইমা যাইবো।’

কিন্তু সময় আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার বেড়াজালে আটকে সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হয় না। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগে, আর আমি একা ঘরের বিছানায় শুয়ে স্মৃতির কম্বল মুড়ি দিয়ে আম্মাকে খুঁজি।

আম্মা ভালো থাকুক তার এই দীর্ঘ নিদ্রায়। পৃথিবীর কোনো ঝড়, কোনো মেঘের গর্জন কিংবা কোনো বজ্রপাত আর কখনোই যেন তাকে বিচলিত না করতে পারে। অনন্তকাল পরম শান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে থাকুক নিশ্চিন্তে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মে, ২০২৬ রাত ১:২৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আদর্শের মুখোশ, নাকি অনলাইন প্রোপাগান্ডা: 'ন্যায়পরায়ণ' সাজার আড়ালে আসল রূপ কোনটা?

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২২



ধর্ম, নৈতিকতা আর আদর্শের মুখোশ পরে যখন ভেতরে ভেতরে চরম অবক্ষয় চলে, তখন সাধারণ মানুষ হিসেবে মুখ বুজে মেনে নেওয়া কঠিন!
ধর্ষণের অভিযোগ এআই (AI) দাবি করা কিংবা অনৈতিক ঘটনাকে ‘দ্বিতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সুখী শিক্ষার্থীরাই ভালো শিক্ষার্থী, ওরাই সবচেয়ে মেধাবী

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৩৮

​আজকের প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা ‘মেধা’ শব্দটিকে জিপিএ-৫, গোল্ডেন মেডেল কিংবা পরীক্ষার খাতার নম্বরের ফ্রেমে বন্দি করে ফেলেছি। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কোচিং, প্রাইভেট আর মুখস্থ বিদ্যার যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মওলা

লিখেছেন আরমান আরজু, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:১৪

মাহরাম নয়, এমন পুরুষকে কি একজন স্ত্রীলোক নিজের স্তনের দুধ পান করাতে পারবেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২১

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সাহলা বিনতে সুহাইল নবী করীম ﷺ-এর নিকট এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট সালেমের আসাটা আবু হুযাইফা ভালো মনে করছেন না। নবী বললেন:... ...বাকিটুকু পড়ুন

লুচ্চামি আর যৌন হতাশা এক বিষয় না।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২


সম্প্রতি জামায়াতের এক লুচ্চা এমপি-র অন্তত দুইজন তরুণী নিয়ে কট খাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তিনি তরুণী নিয়ে হোটেল, কোচিং সেন্টারে রুম ডেট করতেন। নেটিজেনরা তার এই লুচ্চামি এমনভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×