somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

লোকমানুষ
ফুটপাতের ধুলোয় লেপা এক টুকরো রোদ, বাসার কোণে জমে থাকা অলস সকালের মতো। জীবনের হিসাব নিকাশে পেন্সিলে-টানা অঙ্ক, কখনো হার, কখনো জয়— সবই সামান্য এক ইতিহাস। এই তো আমার গল্প, সবার মতোই অসম্পূর্ণ, তবু স্বাদে ভরা।

মৃত পায়রার জয়

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একটা হাত উঠে আছে আকাশের দিকে। কালো, শক্ত, বিজয়ের ভঙ্গিতে দুটো আঙুল ছুঁয়ে গেছে শূন্যতাকে। সেই আঙুলের বাঁধনে গোঁজা একটা সাদা পায়রা। দূর থেকে দেখলে বুকটা একবার নেচে ওঠে- আহা, শান্তি এসেছে বুঝি! যুদ্ধ থেমেছে, রক্ত থেমেছে, কেউ একজন হাতে তুলে নিয়েছে শান্তির চিহ্ন।

কিন্তু কাছে গেলে বুক ধক করে ওঠে।

পায়রাটার চোখ নেই, তার জায়গায় একটা নিষ্ঠুর ক্রস। ডানা দুটো নেতিয়ে পড়ে আছে, যেন এইমাত্র আকাশ থেকে খসে পড়ল। আঙুলে বাঁধা সাদা সুতোটা এখনো কাঁপছে বাতাসে। কোনো একদিন এই সুতো বেঁধেছিল আশাকে, আজ সে বেঁধে রেখেছে একটা লাশ।

এই একটা ছবিতেই যেন লেখা আছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে করুণ সত্য।

যুদ্ধ আসে ঝড়ের মতো। যা কিছু গড়ে উঠেছিল বছরের পর বছর ধরে- একটা বাড়ি, একটা সংসার, একটা শৈশবের হাসি; এক লহমায় তা মিশে যায় ধুলোয়। মা তার সন্তানকে খুঁজে পায় না, সন্তান তার মায়ের কবরটুকুও চিনতে পারে না। যে উঠোনে বসে দাদু গল্প শোনাতেন, সেই উঠোনে আজ শুধু ভাঙা ইটের স্তূপ আর নীরবতা, সীমাহীন নীরবতা।

আর এই সব হারানোর পর, যখন কামানের গর্জন থামে, তখন কেউ একজন এসে বলে- আমরা জিতেছি!

জিতেছি? কী জিতেছি??

গাজার ধুলোমাখা রাস্তায় যে বাবা তার মেয়ের ছোট্ট জুতোজোড়া বুকে চেপে ধরে বসে থাকেন, ইউক্রেনের বরফঢাকা মাঠে যে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকেন প্রতিটা সন্ধ্যা, সুদানের ধ্বংসস্তূপে যে শিশু তার খেলার সাথীকে আর কোনোদিন ডাকতে পারবে না; তাদের কাছে “জয়” শব্দটা কি আদৌ কোনো অর্থ বহন করে? নাকি এই শব্দটাই এখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর এক উপহাস, যা মানুষের কান্নার ওপর দিয়ে হেঁটে যায়?

মানুষ বহুকাল ধরে পায়রাকে বেছে নিয়েছে শান্তির প্রতীক হিসেবে, কারণ পায়রা উড়ে যায়- সীমানা মানে না, কাঁটাতার মানে না, কেবল আকাশের দিকে ছুটে যায় মুক্তির নেশায়। কিন্তু যখন সেই পায়রাকে মৃত অবস্থায় হাতে তুলে ধরে বলা হয়- “এই দেখো, শান্তি এসেছে”; তখন সেটা আর প্রতীক থাকে না, হয়ে ওঠে একটা উপহাস।

কারণ মৃত পায়রা উড়তে পারে না। সে কোনো বার্তা বয়ে নিয়ে যায় না, কারও কাছে পৌঁছায় না। সে শুধু পড়ে থাকে, নিথর, নিঃশ্বাসহীন- ঠিক যেমন যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিটা “শান্তিচুক্তি” পড়ে থাকে কাগজের পাতায়, অথচ মানুষের বুকের ভেতরে দগদগে ক্ষতটা রয়েই যায়।

একটা যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে হাত মেলানো হয়। কিন্তু যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছেন, তার কাছে সেই হাসি কি পৌঁছায়? যে শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেই ইটপাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বপ্নগুলো কি আর কোনোদিন জেগে ওঠে?

শান্তি যদি সত্যিই আসত, তবে তা আসত কান্না মুছে দিয়ে, ঘর ফিরিয়ে দিয়ে, হারানো মানুষগুলোকে বুকে টেনে নেবার মাধ্যমে। কিন্তু যুদ্ধ শুধু নিতে জানে, বিমিময়ে সে কিছুই ফেরত দিতে জানে না। এমনকি শেষে যে শান্তির কথা বলা হয়, সেই শান্তিটুকুও সে দিতে পারে না। সে শুধু একটা মৃতদেহ ধরিয়ে দেয়, আর বলে- এই নাও, এটাই তোমার প্রাপ্তি।

লক্ষ্য করে দেখুন, ছবির হাতটা কালো, শক্ত, যেন লোহার তৈরি। অথচ প্রতিটা হাতই একদিন কোমল ছিল। এই হাতই হয়ত একদিন সন্তানের কপালে চুমু এঁকে দিত, প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটত সন্ধ্যার আলোয়। যুদ্ধ প্রথম সুযোগেই সেই কোমলতাকে কেড়ে নিয়েছে। মানুষকে বাধ্য করেছে কঠিন হতে, নির্মম হতে, বেঁচে থাকার জন্য নিজের ভেতরের ভালোবাসাটুকু চাপা দিতে।

তারপর একদিন, সেই বদলে যাওয়া হাতেই তুলে ধরা হয় বিজয়ের চিহ্ন। অথচ কেউ প্রশ্ন করে না- এই হাত কতটা হারিয়েছে নিজেকে ফিরে পাওয়ার আগে? কতটা ভালোবাসা পুড়ে ছাই হয়েছে এই একটা মুহূর্তের জন্য, যেখানে মানুষ দাঁড়িয়ে বলছে- দেখো, আমি জিতেছি!

যুদ্ধ কোনোদিন শান্তি দেয় না। যুদ্ধ শুধু জানে কীভাবে কেড়ে নিতে হয় মানুষ, ঘর, শৈশব, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। আর যখন সব কেড়ে নেওয়া শেষ হয়, তখন সে সান্ত্বনা হিসেবে হাতে ধরিয়ে দেয় একটা প্রতীক, একটা মিথ্যে জয়ের স্মারক- যা আসলে ফাঁপা, যার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই।

সেই মৃত পায়রাটার দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয়- এটাই তো যুদ্ধের আসল চেহারা। সে বিজয়ের নামে দাঁড় করিয়ে দেয় একটা শূন্যতা। সে হাতে তুলে দেয় শান্তির খোলস, কিন্তু আত্মাটা রেখে দেয় নিজের কাছে, চিরদিনের জন্য।

আর তাই, যতদিন না আমরা বুঝব যে যুদ্ধ কখনো জয়ী করে না, শুধু হারায়- ততদিন পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে কোনো না কোনো হাত এভাবেই তুলে ধরবে একটা মৃত পায়রা, আর তাকেই ভুল করে ডাকবে শান্তি বলে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৩০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২২



ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে
==================================
পিঠ ছুঁয়ে নামা মেঘবরণ তার লম্বা কালো চুল,
তারই মাঝে লুকিয়ে হাসে একটি সাদা ফুল।
চোখ দুটো তার ডাগর ডাগর, অবাক করা আলো,
দুষ্টুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রবাদ প্রবচন ও আলী ভাইয়া, জী এস ভাইয়া, খায়রুলভাইয়া ও সত্যপথিকভাইয়াদের পোস্ট..... এই আমি অপ্সরা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২২


এই অপ্সরা শুধু একটা নিকই না। জীবনের একটা অংশের নাম। জীবনটা শুরু হয়েছিলো যবে থেকে তার পর ৫/৬ বছর থেকেই জীবনের নানা ক্ষনের নানা মানের উদ্দেশ্য বিধেয় ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

Somewhereinblog.net: বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ থেকে ডিজিটাল পাবলিশিং এ পরিনত করে সাবলম্বি করার লক্ষ্যে একটি খসড়া প্রস্তাবনা ।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯


একজন নিয়মিত ব্লগার হিসেবে প্রতিদিনই লক্ষ্য করি, Somewhereinblog.net (সামু) বাংলা সাহিত্য, অভিজ্ঞতা ও তথ্যভিত্তিক লেখার এক বিশাল আর্কাইভে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি কঠিন বাস্তবতাও সামনে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অটো কে বন্ধ করা যাবে না।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫১




অনেক দিন আগের কথা। ২০১৫ সালের ঘটনা। তখন আমি মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়ায় থাকি এবং অনার্সে পড়াশোনা করি। পড়তাম পাশের উপজেলা সোনারগাঁওয়ের সোনারগাঁও সরকারি কলেজে। প্রতিদিন কলেজে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×