somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হলোকস্ট: ইতিহাসের এক অন্ধকারতম অধ্যায়

২১ শে ডিসেম্বর, ২০২৪ বিকাল ৪:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হলোকাস্ট মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। নাৎসি জার্মানির ইহুদি নিধনযজ্ঞ শুধু একটি গণহত্যা ছিল না, বরং এটি ছিল সুপরিকল্পিতভাবে একটি জাতিকে নির্মূল করার অপচেষ্টা।

হলোকস্টের সূচনা ও বিস্তার:

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে হিটলারের ইহুদি নিধনযজ্ঞের সূচনা হয়। পোল্যান্ডের একটি বড় অংশ জার্মানির দখলে নিয়ে সেখানে বসবাসকারী ছয় লক্ষাধিক ইহুদিকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়। তাদের গেটোর অধীনে বন্দী করে অমানুষিক পরিশ্রম করানো হতো, বিনিময়ে সামান্য খাবার দেওয়া হতো। ১৯৪৪ সাল নাগাদ প্রায় চার লক্ষ ইহুদি এই দাসশ্রমে বাধ্য হয়। তাদের নাম পরিচয় কেড়ে নিয়ে শরীরে সংখ্যা ট্যাটু করে দেওয়া হতো।

১৯৪১ সালে রাশিয়া আক্রমণের পর হিটলারের ইহুদি নিধনের পরিকল্পনা আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। তথাকথিত "ইহুদি বলশেভিক ষড়যন্ত্র" নির্মূলের নামে শুরু হয় ব্যাপক গণহত্যা। ১৯৪১ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৪২ সালের শেষ পর্যন্ত প্রায় বারো লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়।

১৯৪২ সালের মাঝামাঝি সময়ে গেটো থেকে ইহুদিদের ধরে মালবাহী ট্রেনে করে ডেথ ক্যাম্পে পাঠানো শুরু হয়। গ্যাস চেম্বার, নির্যাতন, অনাহার, মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট এবং ডেথ মার্চের মাধ্যমে সেখানে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। নাৎসিরা এই গণহত্যাকে ‘দ্য ফাইনাল সলুশন’ বা ‘চূড়ান্ত সমাধান’ নামে অভিহিত করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের মে মাস পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ড চলে।

নিহতের সংখ্যা ও বিতর্ক:

হলোকাস্টে নিহত ইহুদির সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকরা হলোকাস্টের অস্তিত্বই অস্বীকার করে, আবার কেউ কেউ নিহতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করে। তবে মূলধারার ইতিহাসবিদদের মতে, হলোকাস্টে ৪২ থেকে ৭০ লক্ষ ইহুদি নিহত হয়েছিল। বহুল প্রচলিত ৬০ লক্ষ নিহতের হিসাবটি মূলত নাৎসিদের দেওয়া।

হলোকাস্টের তাৎপর্য:

‘হলোকাস্ট’ একটি গ্রিক শব্দ, যার অর্থ ‘গণপোড়ানো’। ইহুদিরা একে হিব্রুতে ‘শোয়াহ’ (niri) বলে, যার অর্থ ‘ধ্বংস’। হলোকাস্টের ফলে ইউরোপের ইহুদি জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং বিশ্বের ইহুদি জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পায়। অসউইচ বন্দী শিবির ছিল হলোকাস্টের সবচেয়ে কুখ্যাত কেন্দ্র, যেখানে প্রায় দশ লক্ষ ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে হত্যা করা হয়।

হিটলারের ইহুদি বিদ্বেষের উৎস:

হিটলারের ইহুদি বিদ্বেষের উৎস নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, শৈশবের কোনো ঘটনা, কেউ বলেন যৌনরোগ, আবার কেউ বলেন কোনো ইহুদি প্রেমিকার প্রত্যাখ্যান তার এই বিদ্বেষের কারণ। তবে সম্ভবত তার উগ্র জার্মান জাতীয়তাবাদই এই বিদ্বেষের প্রধান কারণ।

২০১৫ সালে ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন যে হলোকাস্ট হিটলারের স্ব-প্রণোদিত ছিল না, বরং জেরুজালেমের মুসলিম গ্র্যান্ড মুফতি হাজ আমিন আল-হুসাইনি তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণ এর বিপরীত।

একটি বহুল প্রচারিত মিথ্যা উদ্ধৃতি হিটলারের নামে প্রচলিত আছে: “আমি ইচ্ছে করলে পৃথিবীর সব ইহুদীকে হত্যা করতে পারতাম। কিন্তু কিছু ইহুদী বাঁচিয়ে রাখলাম এ জন্য যে পৃথিবীর মানুষ দেখুক, আমি কেন তাদের হত্যা করেছিলাম।” এমন কোনো কথা হিটলার কখনো বলেননি।

হলোকাস্ট মানব ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। ইতিহাসকে ভুলে গেলে তার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই হলোকাস্টের মতো ঘটনা সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২৪ বিকাল ৪:৩৫
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জামাত কি আদতেই বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে?

লিখেছেন এমএলজি, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

স্পষ্টতঃই, আসন্ন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এবং জামাত। দুই পক্ষের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে যেমন সক্রিয়, একইভাবে ফেইসবুকেও সরব।

বিএনপি'র কিছু কর্মী বলছে, জামাত যেহেতু ১৯৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ম্যাজিস্ট্রেট

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



আমাদের এলাকায় নতুন একটা ওষুধের দোকান হয়েছে।
অনেক বড় দোকান। মডেল ফার্মেসী। ওষুধ ছাড়াও কনজ্যুমার আইটেম সব পাওয়া যায়। আমি খুশি এক দোকানেই সব পাওয়া যায়। আমাদের এলাকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ্‌কে কীভাবে দেখা যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

যে কোন কিছু দেখতে হলে, তিনটি জিনিসের সমন্বয় লাগে। সেই জিনিসগুলো হচ্ছে - মন, চোখ এবং পরিবেশ। এই তিন জিনিসের কোন একটি অকেজো হয়ে গেলে, আমরা দেখতে পারি না। চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে জুলাইযোদ্ধাদের উপর পুলিশের ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।

লিখেছেন তানভির জুমার, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:১৪

জুলাই যারা ঘটিয়েছে, তাদের উপর পুলিশের কী পরিমাণে ক্ষোভ, এটা ইলেকশনে যাস্ট বিএনপি জেতার পরই টের পাবেন।
আমি বলছি না, বিএনপির ক্ষোভ আছে।
বিএনপি দল হিসেবে অকৃতজ্ঞ হতে পারে, কিন্তু জুলাইয়ের উপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাশা : বাংলাদেশের নতুন জাতীয় খেলা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯


"ও শ্যামরে, তোমার সনে একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম, এই নিঠুর বনে। আজ পাশা খেলব রে শ্যাম।" প্রয়াত হুমায়ূন ফরীদির কণ্ঠে ছবিতে যখন এই গান শুনেছিলাম ,তখন কেউ ভাবেনি যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×