somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঈশ্বরের ভুল ছায়া: জীবনের ঋণ

১৫ ই মে, ২০২৫ রাত ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১। ময়মনসিংহের শহরটা সকালে কুয়াশার চাদরে মোড়া থাকে। ব্রহ্মপুত্রের ধার দিয়ে হাঁটলে নদীর কুয়াশার গন্ধে মনে হয়—সময়ের বুক চিরে কোনো প্রাচীন কিছু ফিসফিস করছে। এই শহরের প্রাণ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অগণিত রোগীর নিঃশ্বাসে সেখানে জীবন আর মৃত্যুর ভারসাম্য রোজ বদলায়।

ডা. রাফি—সদ্য বিসিএস পাস করা এক তরুণ ডাক্তার, মেডিসিন ইউনিটে তার প্রথম পোস্টিং। উচ্চতায় লম্বা, চোখে গাঢ় এক বিষণ্ণতা, যা যেন কোনো পুরনো জীবনের স্মৃতি বহন করে। তার জন্ম নেত্রকোনায়। মা ছিলেন লোকগানের শিল্পী। বাবার মৃত্যু এক রোড অ্যাক্সিডেন্টে—তখন রাফি দশ বছরের। সেই থেকেই জীবনকে আঁকড়ে ধরার অদ্ভুত ইচ্ছা জন্মায় তার মনে।

২। হাসপাতালের রাত মানে প্যাথেডিনের গন্ধ, জীবনের শেষ আকুলতা, আর পেছনে ফিসফিস করা নার্সদের ক্লান্তি। এমন এক রাতে একজন মা তার জন্মান্ধ ছেলেকে নিয়ে আসে। চোখ পরীক্ষা করতে গিয়ে রাফি ছেলেটির চোখে আঙুল রাখে। হঠাৎ তার শরীর কেঁপে ওঠে, কানে নদীর গর্জন শোনে। তারপর ছেলেটি বলে ওঠে—"আমি দেখতে পাচ্ছি! আম্মু, আলো!"

রাফি চমকে ওঠে। সে জানে, এমন হবার কথা নয়। কিন্তু হল। সেই রাতেই ডায়েরিতে সে লেখে: "আজ আমার হাত দিয়ে কোনো এক অলৌকিকতা ঘটেছে। আমি কি মাত্র একজন চিকিৎসক? নাকি কিছু বেশি?"

৩। দিন পেরোয়। কয়েক সপ্তাহ পর ICU-তে একজন ক্লিনিক্যালি ডেড রোগীকে শেষবার দেখে যাচ্ছিল রাফি। নিঃশ্বাস নেই, হার্টবিট নেই। কেবল মৃত শরীর। সহানুভূতির বশে সে তার ঠান্ডা হাত ধরে। ঠিক তখনই, রোগীর বুক ধকধক করে ওঠে। মনিটরে লাইনের দোলা। জীবন ফিরে আসে।

রাফি স্তব্ধ। তার ভেতরে প্রশ্ন জাগে—এই ক্ষমতা এল কোথা থেকে?

তাকে নিয়ে গুজব ছড়ায়। কেউ বলে, সে কোরআনের হাফেজ, কেউ বলে কোনো হিন্দু তান্ত্রিকের আশীর্বাদে এই শক্তি। একদিন লাইব্রেরির পুরনো বইয়ের স্তূপে সে খুঁজে পায় গ্রিক চিকিৎসক আসক্লেপিয়াসের গল্প, যিনি মৃত্যুকে ঠকিয়ে মানুষ বাঁচাতে পারতেন। দেবতা জিউস তাকে হত্যা করেন এই ক্ষমতার জন্য।

রাফি ভাবতে থাকে—তার ওপরও কি সেই পুরনো অভিশাপ কাজ করছে?

৪। তৃতীয় ঘটনা ঘটে এক বৃদ্ধ কুষ্ঠ রোগীর ক্ষেত্রে। রাফির হাতের ছোঁয়ায় তার ক্ষত শুকাতে থাকে। বৃদ্ধ কেঁদে বলে, "তুই কি ফেরেশতা, বাবা?"

কিন্তু অলৌকিকতার আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

প্রথম সেই ছেলেটি—আলো ফিরে পাওয়া জন্মান্ধ—ব্রহ্মপুত্র ব্রিজ থেকে লাফ দেয়। সুইসাইড নোটে লেখে: "এই পৃথিবী কুৎসিত। অন্ধ থাকা ভালো ছিল। চোখে যা দেখলাম, তা বাঁচার মতো নয়।"

রাফির মাথায় বজ্রাঘাত হয়। হাসপাতালে আলোচনা—ছেলেটি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল। কিন্তু রাফি জানে, সে তাকে ফিরিয়ে এনেছিল অন্ধকার থেকে। এখন ছেলেটি সেই আলোতেই পুড়ে গেছে।

৫। এরপর ICU-র রোগী গলায় দড়ি দেয়। কুষ্ঠ রোগী নিজেকে পুড়িয়ে মারে হাসপাতালের পেছনের বাঁশবাগানে। তিনজন, তিনটি মৃত্যুর কাহিনি, কিন্তু একই কথা রেখে গেছে: _"এই জীবন আমি চাইনি। ফিরে এসে কেবল যন্ত্রণা পেয়েছি।"

রাফি রাতের পর রাত ঘুমাতে পারে না। সে দেখতে পায়, তার হাত থেকে আগুন বেরোচ্ছে স্বপ্নে। ময়মনসিংহের অলিগলি তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। কেউ বলে, সে অভিশপ্ত। কেউ বলে, রক্ষাকর্তা।

৬। ডা. তাহমিনা, মেডিসিন বিভাগের প্রধান, রাফির প্রতি বিশেষ নজর রাখেন। একরাতে তিনি রাফিকে ডেকে বলেন: “তুমি যদি অলৌকিক হও, তোমাকে বোঝা নিতে হবে মানবিক দায়িত্বও। তাদের যারা ফিরেছে, তারা কেন বাঁচতে চায়নি? তুমি কি কেবল শরীর বাঁচাও, না আত্মা? তুমি ঈশ্বর না হয়েও ঈশ্বরের খেলায় নেমেছ।”

রাফি ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। কিছু বলতে পারে না।

৭। শেষ পরীক্ষা আসে তুলিকা নামে এক তরুণীর মাধ্যমে। সে ফুসফুস ক্যানসারের শেষ ধাপে। তীব্র কাশি, শ্বাসকষ্ট, চোখে চরম অবসাদ। তবুও একরকম শান্ত। সে বলে, “তুমি কি সেই ডাক্তার? যে ছুঁয়ে দিলে মানুষ বেঁচে ওঠে?”

রাফি মাথা নাড়ে। তুলিকা বলে, “তুমি আমাকে বাঁচিয়ো না। আমি মরতে চাই, শান্তিতে। এই সমাজে আমার জন্য কিছু নেই। জীবন যদি যন্ত্রণা হয়, তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার মানে নেই।”

রাফি চুপ করে থাকে। পাশে বসে কেবল হাতটা ধরে রাখে—স্পর্শ ছাড়াই। তারপর চলে যায়। পরদিন সকালেই তুলিকা মারা যায়, চোখে প্রশান্তি।

৮। রাফি সেই রাতেই ব্রহ্মপুত্র নদে হাঁটতে যায়। কুয়াশার ভিতর সে দেখতে পায় তার প্রতিচ্ছবি—চোখে আগুনের ছাপ, হাতে ধোঁয়ার রেখা। তার শরীর যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে। চোখে জল আসে।

সেই রাতে সে হাসপাতালের রুমে চিঠি রেখে যায়:

“আমি আর কাউকে ফিরিয়ে আনতে চাই না। যাদের ফিরিয়েছি, তারা কেউ বাঁচতে চায়নি। আমার স্পর্শে যদি জীবনের চেয়ে বড় অভিশাপ আসে, তবে সে শক্তি আমার না থাকাই ভালো। আমি ঈশ্বর নই, আমি হয়তো তার কোনো ভুল ছায়া।”

পরদিন তার নিথর দেহ মেলে ছিল নদীর পাড়ে, ব্রহ্মপুত্রের কাদামাটিতে।

ডা. তাহমিনা চিঠিটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর নিচু স্বরে বলেছিলেন: “সে কোনো ঈশ্বর ছিল না। সে কেবল একজন মানুষ ছিল, যে জীবনকে ভালোবাসতে গিয়েছিল। খুব বেশি।”

শেষ কথা:
এই গল্প শুধু অলৌকিকতা নয়, মানবিকতারও। জীবন ফিরিয়ে আনা যদি সহজ হয়, তবে সেই জীবনের মানে বোঝার দায়ও তার উপর পড়ে। ঈশ্বরের ভুল ছায়া—রাফি, এক মানবিক বিভ্রমের প্রতীক হয়ে রইল।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মে, ২০২৫ রাত ৯:১০
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসী - সাইন্স ফিকশন

লিখেছেন আরাফাত৫২৯, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:১০




১/
বিজ্ঞান একাডেমির প্রধাণ মহামতি গ্রাহাম উনার অফিসের বিশাল জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সময়টা প্রায় শেষ বিকেল। সন্ধ্যার রক্তিম আভা দূর আকাশে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো আকাশটাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৪

ইমাম, মুয়াজ্জিন, কুরআনের শিক্ষক ও দ্বীন প্রচারকদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণের শরয়ী হুকুম

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মসজিদে ইমামতি করা, আযান দেয়া, কুরআন শিক্ষাদান করা কিংবা সাধারণভাবে দ্বীন প্রচারের কাজে বিনিময়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

একাত্তরের ইতিহাস অন্য কিছুর সঙ্গে মিলবে না, সত্যিই?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮


স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, একাত্তর কখনো অন্য কোনো ইতিহাসের সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাধীনতা বলতে আপনি কি বুঝেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৩


২০২৩ সালের কথা। আমরা কয়েকজন মিলে অনলাইনে একজন ইংরেজি স্যারের কাছে কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। একদিন ক্লাস চলছে, স্যার হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ছোটবেলায় যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:১৪



বিশেষ দিন গুলো শাহেদ জামালের জন্য কষ্টকর।
যেমন ইদের দিন শাহেদ কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? তার তো কেউ নেই। এমনকি বন্ধুবান্ধবও নেই। তার এমন'ই পোড়া কপাল মেসেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×