
আমার নাম তৃশান। সবে তো স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। আজ আমার খুব আনন্দ! বাবা-মা, দিদি আর দাদু-দিদুন মিলে আমরা মস্ত বড় একটা নৌকায় ঘুরছি। দিদি বলছিল এই জায়গাটার নাম জবলপুর। বাতাস যখন আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিল, মা হাসিমুখে ছোট মাসিকে ভিডিও কলে সবকিছু দেখাচ্ছিল। মা বলছিল, "দেখো তৃশান, পানিগুলো কত সুন্দর!" আমি খুব খুশি ছিলাম। ফেরার পর বন্ধুদের এই দারুণ গল্পের কথা বলব ভেবেই রোমাঞ্চ হচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল। শান্ত বাতাস এক মুহূর্তে বিষাক্ত ঝড় হয়ে উঠল। সুন্দর পানিগুলো এখন পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে নৌকার ওপর আছড়ে পড়ছে। নৌকাটা খুব জোরে দুলছিল। দিদি ভয় পাচ্ছিল। মা আমাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চারপাশের মানুষগুলো চিৎকার করছিল। সবাই কাঁদছিল।
নৌকার ভেতরে যখন কালচে পানি ঢুকতে শুরু করল, বাবা আর দাদু খুব অস্থির হয়ে কিছু একটা খুঁজছিলেন। বাবা একটা লোহার তালা ভেঙে লাল রঙের কিছু জ্যাকেট বের করলেন। মায়ের কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। মার চোখে জল। মা বিড়বিড় করে বলছিল, "ভয় নেই তৃশান, আমি আছি তো।"
নৌকাটা যখন একদিকে কাত হয়ে গেল, মা তাড়াহুড়ো করে আমাকে একটা জ্যাকেট পরাতে চাইলেন। কিন্তু পানির ঝাপটায় মা পারছিলেন না। সময় খুব কমে আসছিল। শেষে মা নিজের গায়ের জ্যাকেটটা খুলে তার চেইনটা বড় করে টেনে দিলেন। তারপর আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিজের জ্যাকেটের ভেতর ঢুকিয়ে নিলেন।
আমি মায়ের গায়ের ওম পাচ্ছিলাম। মার হৃদপিণ্ডটা খুব জোরে ধকধক করছিল। মা আমাকে দুই হাতে বুকের সাথে একদম মিশিয়ে ধরলেন। চারদিকে খুব অন্ধকার। প্রচণ্ড শব্দ। কিন্তু মায়ের জ্যাকেটের ভেতর আমি বেশ নিরাপদ বোধ করছিলাম। মা আমার কানে কানে শুধু একটাই কথা বলছিলেন, "চোখ বন্ধ করো বাবা, কিচ্ছু হবে না।"
আমি চোখ বন্ধ করলাম। মায়ের গায়ের সেই পরিচিত ঘ্রাণ আর বুকের ওমটুকু নিয়েই আমি একটা লম্বা ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ঢেউগুলো আমাদের আর আলাদা করতে পারল না। কারণ, মা আমাকে ছাড়েনি। মা আমাকে শক্ত করে আগলে রেখেছিল।
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম... কিন্তু মা তখনও জেগে ছিল—আমাকে আগলে। এমনকি যখন দেবদূতের মতো কিছু মানুষ আমাদের পানি থেকে তুলল, তখনও আমি মায়ের বুকের সেই ছোট্ট ঘরটাতেই পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




