শহরের এক কোণে কাঁচঘেরা ক্যাফে 'ব্ল্যাক মেমোরিজ'। বাইরে বৃষ্টির ঝিরঝিরে শব্দ, ভেতরে হালকা জ্যাজ মিউজিক। পিবিআই-এর তুখোড় ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান টেবিলের এক কোণে বসে ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন। তাঁর উল্টো দিকে বসা গোয়ালন্দ ঘাটের তরুণ এসআই ফয়সাল। ফয়সালের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, সামনে ছড়িয়ে আছে কিছু ক্রাইম সিন ফটো আর একটা প্লাস্টিকের ছোট ব্যাগ।
আরিয়ান কফির কাপটা নামিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “বলো ফয়সাল, রাজবাড়ী আর ফরিদপুরের সীমানা-দ্বন্দ্ব মিটল? নাকি লাশ দুটোর ঠিকানা এখনো অনিশ্চিত?”
ফয়সাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “পরিস্থিতি জটিল, স্যার। জ্যোতিন বোদ্যিরপাড়া এলাকাটা দুই জেলার একদম বর্ডারে। মা জলি আর তাঁর চার বছরের মেয়ে সায়মার লাশ পাওয়া গেছে এক পুকুরপাড়ে মাটিতে পুঁতে রাখা অবস্থায়। ৪ মে তাঁরা এক আত্মীয়ের বাসায় কুলখানিতে গিয়েছিলেন, তারপর থেকেই নিখোঁজ। স্বামী আকবর হোসেন পাগলের মতো খুঁজছিলেন।”
আরিয়ান চোখের চশমাটা একবার মুছে নিলেন। “আকবর হোসেনের বয়ান কী?”
“আকবর জানিয়েছেন, জলি খুব ধার্মিক ছিলেন। ৪ তারিখ দুপুরে তিনি মেয়েকে নিয়ে বের হন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, জলি এক বাইক আরোহীর সাথে কথা বলে বেশ হাসিমুখে বাইকে উঠলেন। বাইক আরোহীর পরনে রেইনকোট আর হেলমেট ছিল।”
আরিয়ান মুচকি হাসলেন। “স্বেচ্ছায় পরিচিতের বাইকে ওঠা। কিন্তু গর্তটা, ফয়সাল? বৃষ্টির দিনে হুট করে অত গভীর গর্ত খোঁড়া সম্ভব?”
ফয়সাল মাথা নাড়লেন। “না স্যার। পুকুরপাড়ে দাফন করার মতো অত বড় গর্ত খুঁড়তে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগবে। দিনের আলোতে কাজটা কঠিন।”
“তার মানে গর্তটা আগে থেকেই সেখানে ছিল। খুনি জানত সে জলিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।” আরিয়ান হঠাৎ থামলেন। ফয়সালের সামনে রাখা প্লাস্টিক ব্যাগটার দিকে ইশারা করে বললেন, “ওটা কী?”
“এটা সায়মার ছোট একটা হেয়ারব্যান্ড, স্যার। আকবরের বাইকের ফুটরেস্টে আটকে ছিল। আকবর দাবি করেছেন, এটা সায়মা নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর বাইকে বসে পড়ার সময় পড়ে গিয়েছিল।”
আরিয়ানের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটল, যা অনেকটা বিদ্রূপের মতো। “বড় অদ্ভুত, তাই না? নিখোঁজ হওয়ার পর আকবর নিশ্চয়ই তাঁর বাইক বহুবার ধুয়েছেন বা ব্যবহার করেছেন। দশ দিন পর সেখানে ক্লিপটা আটকে থাকা কি একটু বেশিই ‘কাকতালীয়’ নয়? নাকি ওটা খুনি নিজেই সেখানে রেখে দিয়েছিল ভুল করে?”
ফয়সাল ভ্রু কুঁচকালেন। আরিয়ান টেবিলের ওপর ঝুঁকে এলেন।
“ফয়সাল, আকবর একজন জমির দালাল। সীমানা কোথায় তা তাঁর নখদর্পণে। তিনি জলি আর সায়মাকে এমন জায়গায় পুঁতেছেন যেখানে দুই জেলার পুলিশ লড়বে—কে কেস নেবে। এই বিভ্রান্তির ফাঁকে তিনি সময় পাবেন প্রতিবেশী সেই পুকুর মালিককে খুনের দায়ে ফাঁসিয়ে জমিটা লিখে নেওয়ার জন্য। আকবরের হাতের ব্যান্ডেজটা দেখেছ?”
“জি স্যার। দা দিয়ে হাত কেটে গেছে বলেছিলেন।”
আরিয়ান কফির কাপে শেষ চুমুক দিলেন। “দা নয় ফয়সাল। ওটা জলির শেষ লড়াইয়ের চিহ্ন। আর সায়মা? সায়মা কথা বলতে শিখেছিল। সেটাই ছিল তার অপরাধ।”
ফয়সালের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। আরিয়ানের ডিডাকশন চেইন এখন তাঁর চোখের সামনে স্পষ্ট।
“এখন কী করবেন স্যার?”
আরিয়ান শান্ত ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। “ফয়সাল, এবার শুধু প্রমাণগুলো জোড়া লাগানো বাকি। আকবরের বাইকের ইঞ্জিনের খাঁজে যে লালচে কাদা লেগে আছে, ওটা ওই পুকুরপাড়ের দোআঁশ মাটি। আর সায়মার হেয়ারব্যান্ড? ওটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, ওটা আকবরের অবচেতন মনের একটা ভয়ংকর ভুল।”
বাইরে বৃষ্টি তখন থেমে এসেছে, কিন্তু আকাশটা আরও গুমোট। আরিয়ান ক্যাফের বিল মিটিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। ফয়সাল টেবিল থেকে সায়মার সেই ছোট্ট হেয়ারব্যান্ডটা হাতে নিলেন।
দরজার কাছে গিয়ে আরিয়ান একবার পেছনে ফিরলেন। তাঁর ছায়াটা স্ট্রিট লাইটের আলোয় দীর্ঘ হয়ে পড়েছে। তিনি ধীর স্বরে বললেন, “শহরটা কাল সকালে আবার ব্যস্ত হয়ে যাবে ফয়সাল। কেউ জানবে না, আজ এই মাটির নিচে শুধু দুটো লাশ চাপা পড়েনি, চাপা পড়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক—বাবা আর সন্তানের বিশ্বাসও।”
আরিয়ান যখন ক্যাফে থেকে বের হলেন, তখনো ভেজা পিচঢালা রাস্তায় আলোর প্রতিফলন পড়ছে। তিনি কোটের কলারটা তুলে দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটায় মিশে গেলেন। শহর জানত না, আরেকটা পরিবার আজ মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল—কেবল লাশ নয়, বিশ্বাসও।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



