
এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ফিকশনাল ইনভেস্টিগেটিভ ক্রাইম থ্রিলার। গল্পের সমস্ত চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, স্থান, সাল ও অপরাধের মোটিভ লেখকের কল্পনানির্ভর। বাস্তব কোনো ব্যক্তি, পেশাজীবী বা অমীমাংসিত ঘটনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
আট বছর। শত শত পাতার পুলিশ রিপোর্ট, একাধিক তদন্ত সংস্থার হাতবদল, বিশেষ টাস্কফোর্স এবং একের পর এক ধার্য তারিখ পেছানোর ইতিহাস।
পিবিআই স্পেশাল ক্রাইম সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুমে চার হাজার পৃষ্ঠার ‘ধুলো জমা কেস ফাইল নম্বর-১০৭’ রাখা। স্ক্রিনে দুটি মুখ—শীর্ষ আন্তর্জাতিক করপোরেট অডিটিং ফার্মের প্রধান আরিফ সামাদ এবং ওঁর স্ত্রী, গ্লোবাল সাপ্লাই-চেইনের সিনিয়র ডেটা-রিসার্চার ফারিয়াল পারভীন। ২০১৭ সালের এক বর্ষণমুখর রাতে ওনাদের বনানীর হাই-সিকিউরিটি অ্যাপার্টমেন্টে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান চৌধুরী ওঁর পাতলা ফ্রেমের চশমাটা নাকে ঠিক করলেন। পাশে ওঁর দুই ভরসা—ডেটা অ্যানালিস্ট তাহসিন এবং ফিল্ড ইনভেস্টিগেটর ক্যাপ্টেন ফাহাদ।
“তিনটা বড় এজেন্সি ফেল করেছে, আরিয়ান ভাই,” ফাহাদ টেবিলের ওপর ফাইলটা ফেলার শব্দ করে বলল। “আমরা নতুন কী পাব? এভিডেন্স তো বছর আগেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।”
আরিয়ান ওঁর হাতের রুপালি মেটাল পেনটি দুই আঙুলের ফাঁকে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন:
“অপরাধী রক্ত ধুয়ে ফেলতে পারে, ফাহাদ। কিন্তু লজিস্টিকসের টাইমিং কখনো মোছা যায় না। কে খুন করেছে সেটা পরে দেখব; আগে দেখব আমাদের এত বছর ধরে কোন ভুল গলিতে হাঁটিয়েছে।”
আরিয়ান ফাইল অডিট শুরু করলেন। কেস ফাইলের ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রাথমিক জব্দ তালিকায় ফারিয়ালের ব্যক্তিগত একটা ডায়েরির নোটের স্পষ্ট ছবি ছিল। সেখানে একটি অস্পষ্ট এনক্রিপ্টেড শব্দ লেখা ছিল: ‘S-One / Ledger-7’। তৎকালীন ডিবির কর্মকর্তারা এটাকে নিছক কোনো পেজ নম্বর ভেবে ফাইল চাপা দিয়েছিল। আরিয়ান ডায়েরির সেই কোডনেমটি খাতায় লিখে রাখলেন—S-One।
একই সাথে, তৎকালীন ব্যাঙ্কের একটা আইপি লগের নোটে লেখা ছিল, ফারিয়াল মৃত্যুর তিন দিন আগে একটি এনক্রিপ্টেড ক্লাউড ফোল্ডারে বড় কোনো অডিট ডেটা সিঙ্ক করার চেষ্টা করেছিলেন, যা সিকিউরিটি ফায়ারওয়ালে আটকে গিয়েছিল।
আরিয়ান প্রথম ধাপে সেই রাতের মোবাইল বিটিএস (Base Transceiver Station) ও কন্টাক্ট-লগ অডিট শুরু করলেন। সেখানেই উঠে এলো প্রথম নাম—ফারিয়ালের সাবেক বিজনেস পার্টনার তানভীর রহমান।
তানভীরের মোবাইল লোকেশন সেই রাতে বনানীর ওই ভবনের আশেপাশে দশ মিনিটের জন্য পাওয়া গিয়েছিল। আরিয়ান ওভার-কনফিডেন্ট হয়ে পড়লেন। ওঁর গাণিতিক মন বলল—তানভীরই 'ইনসাইডার'। ফাহাদকে পাঠিয়ে সীমান্ত এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেপ্তার করানো হলো। মিডিয়া জুড়ে তোলপাড় শুরু হলো: ‘দীর্ঘদিন পর চাঞ্চল্যকর ডাবল মার্ডারের আসামি পিবিআই-এর হাতে গ্রেপ্তার!’
কিন্তু জেরার রুমে ৪৮ ঘণ্টা কাটানোর পর যখন তানভীরের ব্যাঙ্কিং ট্রানজেকশন ডিকোড করা হলো, তখন আরিয়ানের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।
তানভীর সেই রাতে ফারিয়ালের কাছে গিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অফশোর শেয়ার বিক্রির ক্যাশ টাকা জমা দিতে, যা ভবনের সিসিটিভি, ক্যাশ কাউন্টার ও ব্যাঙ্কের রসিদের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে গেল। তানভীর নির্দোষ ছিল। আরিয়ানের এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একজন নির্দোষ মানুষের সম্মান মিডিয়ার সামনে ধ্বংস হয়ে গেল।
অফিসে ফিরে আরিয়ান চুপচাপ বসে রইলেন। ওঁর চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন।
“আমি মারাত্মক ভুল করেছি, তাহসিন,” আরিয়ান ওঁর অপরাধবোধে ভরা গলায় বললেন। “আমি ইগোর বশে সহজ এভিডেন্সটা বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম। এই কেসে সহজ বলে কিছু নেই।”
এই ব্যর্থতা আরিয়ানকে এক পরম সতর্কতা ও নম্রতা দিল। তিনি বুঝলেন, এটি স্রেফ একটি খুন নয়; এটি একটি জটিল কনস্পিরেসি।
নিজের ভুল শুধরে নিতে আরিয়ান নজর দিলেন প্রথম ফাইলে থাকা সেই কোডনেম ‘S-One’-এর দিকে। তাহসিন পুরনো সব সিকিউরিটি এজেন্সির পে-রোল ডেটাবেজ সার্চ করে বের করল—‘S-One’ ছিল একটি প্রাক্তন প্রাইভেট প্যারা-মিলিটারি সিকিউরিটি ফার্মের চিফ অপারেটর হাসান মাহমুদ-এর কোডনেম!
হাসানকে যখন নদীর তীরবর্তী এক নির্জন বাড়ি থেকে আটক করা হলো, তিনি পালানোর চেষ্টা করলেন না।
হাসান ধীর গলায় স্বীকার করলেন, “আমি খুন করিনি স্যার। আমি শুধু বাইরের লজিস্টিকস জ্যাম করেছিলাম। কিন্তু ভেতরে ঢুকে অডিট ফাইলগুলো যে উদ্ধার করেছিল, সে হলো গ্লোবাল লজিস্টিকস মোগল শাহরিয়ার কবিরের নিজস্ব পিএস। ফারিয়াল ম্যাডাম আসিফ ভাইয়ের ল্যাপটপে আসল অডিট লেজার রাখেননি... তিনি ওটা একটা এনক্রিপ্টেড আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল অফশোর কাস্টডিতে ট্রাস্ট বন্ড হিসেবে লক করে রেখেছিলেন!”
রাত ১১টা। শাহরিয়ার কবিরের বনানীর বিলাসবহুল পেন্টহাউস।
শাহরিয়ার কবির ওঁর দামী চামড়ার সোফায় বসে সিঙ্গেল মল্ট হুইস্কিতে চুমুক দিচ্ছিলেন। ওঁর পাশে ওঁর দুই প্রখোর আইনি উপদেষ্টা। শাহরিয়ার কবির কেবল একজন ব্যবসায়ী নন; তিনি গ্লোবাল পোর্ট অ্যান্ড লজিস্টিকসের বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।
আরিয়ান ও ফাহাদ রুমে প্রবেশ করলেন। আরিয়ান ধীরস্থিরভাবে শাহরিয়ারের মুখোমুখি সোফায় বসলেন। ওঁর হাতের রুপালি ফাউন্টেন পেনটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
“ইনস্পেক্টর আরিয়ান,” শাহরিয়ার কবির ঠোঁটের কোণে উপহাসের হাসি ফুটিয়ে বললেন। “তানভীরকে গ্রেপ্তার করে যে ভুলটা করলেন, তাতেই তো আপনার তদন্তের পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। এখন আমার ড্রয়িংরুমে কী মনে করে?”
আরিয়ান শান্ত চোখে তাকালেন।
“আমি এখানে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসিনি, মিস্টার কবির,” আরিয়ান বললেন। “আমি এসেছি অডিট রিপোর্ট মেলাতে। আট বছর আগে আসিফ সামাদ যে প্যান-এশিয়ান লজিস্টিকসের অফশোর ফিন্যান্সিয়াল স্ক্যামের ফাইল ধরে ফেলেছিলেন, সেই ফাইলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন আপনি।”
শাহরিয়ার কবির হাসলেন, ওঁর আইনজীবী সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিয়ে বললেন, “ইনস্পেক্টর, উইথ ডিউ রেসপেক্ট, আপনার কথা সম্পূর্ণ ধারণানির্ভর। হাসান মাহমুদ নামে এক সাবেক অপরাধীর স্টেটমেন্ট দিয়ে আপনি আমাদের ক্লায়েন্টকে যুক্ত করতে পারেন না। সেকশন ৩০ অনুযায়ী সহ-আসামির জবানবন্দি একক প্রমাণ হিসেবে আদালতে ১ মিনিটও টিকবে না।”
“আমি জানি, ল ইয়ার সাহেব,” আরিয়ান ওঁর ল্যাপটপটি শাহরিয়ারের দিকে স্লাইড করলেন। “সে জন্যই আমি হাসানের মুখের কথায় আসিনি। আমি এসেছি ফারিয়াল পারভীনের সেই এনক্রিপ্টেড ক্লাউড ট্রাস্ট বন্ডের ফাইনাল সিঙ্ক্রোনাইজেশন নিয়ে, যা অ্যাক্টিভেট করার কোড ফারিয়ালের ডায়েরিতে ছিল।”
শাহরিয়ার চুরুটে এক দীর্ঘ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। ওঁর চোখে সামান্যতম ভয়ের ছাপ নেই।
“অসাধারণ নাটক, আরিয়ান,” শাহরিয়ার বললেন। “কিন্তু আপনি ভুলেই গেছেন, কোনো ক্লাউড ফাইল বা অফশোর ডকুমেন্ট আদালতে লিগ্যালি গ্রহণযোগ্য হতে হলে ওটার চেইন অব কাস্টডি প্রমাণ করতে হয়। আট বছর পর সাইবার রি-কনস্ট্রাকশন করে পাওয়া ডিজিটাল প্রমাণের কোনো ফরেনসিক ভ্যালিডিটি নেই। ওটা স্রেফ ট্যাম্পার্ড ডেটা বলে আমাদের টিম কোর্টে খারিজ করে দেবে।”
আরিয়ান এক মুহূর্ত থামলেন। শাহরিয়ার কবির অত্যন্ত চতুর প্রতিপক্ষ। তিনি আইনের প্রতিটি ফাঁকফোকর চেনেন।
“আপনি ঠিক বলেছেন, মিস্টার কবির,” আরিয়ান টেবিলের দিকে সামান্য ঝুঁকলেন। “ডিজিটাল এভিডেন্স ট্যাম্পার্ড বলা সহজ। কিন্তু যদি আপনার নিজের ব্যাক-ডেটেড অফশোর ব্যাঙ্ক থেকে প্যান-এশিয়ান সিকিউরিটিকে পাঠানো পে-রোলের এনক্রিপশন ফাইল পাওয়া যায়? আপনি ভেবেছিলেন কাজী সামাদ (তৎকালীন ফাইন্যান্স ডিরেক্টর) মারা যাওয়ার পর ওই পে-রোলের হিসাব মুছে গেছে। কিন্তু কাজী সামাদ ওঁর ব্যাংক লকারে একটি সার্টিফাইড ট্রাস্ট বন্ড লিখে রেখে গিয়েছিলেন, যা আজ বিকেলে আমরা রিকভার করেছি। ওটাতে আপনার নিজের ডিজিটাল সিগনেচার করা আছে, যা কোনো সাইবার কোর্ট বাতিল করতে পারবে না!”
শাহরিয়ার কবিরের চুরুটের ধোঁয়া থমকে গেল। ওঁর ঠোঁটের সেই আত্মবিশ্বাসী হাসিটা প্রথমবার উধাও হলো।
“কাজী সামাদ আপনাকে বিশ্বাস করেননি, মিস্টার কবির,” আরিয়ান বরফশীতল কণ্ঠে যোগ করলেন। “তিনি জানতেন ওঁর জীবন ঝুঁকিতে। তাই তিনি ওঁর ইনস্যুরেন্স হিসেবে আপনার ট্রানজেকশন প্রুফ অফিশিয়াল কাস্টডিতে রেখে গিয়েছিলেন। আর হাসান মাহমুদকে আজ বিকেলে যখন ওই পে-রোল দেখানো হয়, সে স্পষ্ট জবানবন্দি দিয়েছে—কোন এনক্রিপশন কোডে ওই রাতে আপনাকে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছিল।”
শাহরিয়ারের দুই পাশের আইনজীবীরা একে অপরের দিকে তাকাল। ওনাদের চেহারার পরিবর্তন স্পষ্ট।
শাহরিয়ার কবিরের হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল। তিনি সোফায় সোজা হয়ে বসলেন। ওঁর কপালে সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু ফুটে উঠল।
“আপনি ভাবছেন আমাকে আটকে আপনি পুরো খেলা শেষ করে দিলেন?” শাহরিয়ার নিচু, বিষাক্ত গলায় বললেন। “আমি স্রেফ একটা পোর্ট সামলাই, আরিয়ান। আপনি যে সমুদ্রে নেমেছেন, ওটার গভীরতা মাপার ক্ষমতা আপনার পিবিআই-এর নেই।”
“সমুদ্রের গভীরতা পরে মাপব, মিস্টার কবির,” আরিয়ান উঠে দাঁড়ালেন। “আপাতত আপনার ডাঙার যাত্রা এখানেই শেষ।”
বাইরে তখন পিবিআই-এর সোয়াত টিমের সাইরেনের বিকট শব্দ।
পরদিন সকালে বিশেষ জজ আদালতে এক নজিরবিহীন পরিবেশ।
পিবিআই স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান চৌধুরী আদালতে ৪৫০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত, নিশ্ছিদ্র চার্জশিট পেশ করলেন। ৮ বছরের দীর্ঘ ও অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটল। নির্দোষ তানভীর এবং ভুয়া আসামিরা সসম্মানে মুক্তি পেল। আর আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও ডাবল মার্ডারের প্রধান মাস্টারমাইন্ড শাহরিয়ার কবিরের স্থান হলো কাস্টডিতে।
মিডিয়া ও আদালতের এই তুমুল কোলাহলের পর, বিকেলে পিবিআই সদর দপ্তরের নিজের নিরিবিলি রুমে ফিরে এলেন আরিয়ান।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। আরিয়ান ওঁর স্টাডি টেবিলের ওপর রাখা আসিফ ও ফারিয়ালের সেই কেস ফাইল নম্বর-১০৭ ড্রয়ারে রেখে লক করে দিলেন। কেস সফলভাবে সমাধান হয়েছে।
তাহসিন এক কাপ কফি নিয়ে ঢুকে বলল, “অবশেষে কেসটা শেষ হলো, আরিয়ান ভাই! পুরো ডিপার্টমেন্ট আপনাকে নিয়ে গর্বিত।”
আরিয়ান চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুছলেন। ওঁর মুখে কোনো অহেতুক আনন্দ নেই। শাহরিয়ার কবিরের শেষ কথাটা ওঁর কানে এখনো বাজছে—“আমি স্রেফ একটা পোর্ট সামলাই... ওটার গভীরতা মাপার ক্ষমতা আপনার নেই।”
আরিয়ান টেবিলের ওপর রাখা পরবর্তী নতুন ফাইলটা টেনে নিলেন। ফাইল নম্বর—১০৮।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



