
এই গল্পটি একটি ফিকশন ক্রাইম স্টোরী, বাস্তবের একটি ঘটনার ছায়াবলম্বনে লেখা হয়েছে।
১০ মে, ২০১৮। টেকনাফ।
কাউন্সিলর শামসুল আলমের (৪৮) দোতলা বাড়িটি আজ বেশ আলো ঝলমলে।
বসার ঘরে ছোট মেয়ে সুমাইয়া (১২) গণিতের খাতা নিয়ে বসেছে। বড় মেয়ে নীলা (১৭) তার কলেজের বিজ্ঞান মেলার প্রেজেন্টেশন স্লাইড ল্যাপটপে দেখাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে শামসুল আলমের স্ত্রী ফরিদা বেগমের হাঁসের মাংস আর ইলিশ-পোলাও রান্নার সুবাস।
"বাবা, দেখো তো! এই চার্টটা কি আরেকটু ডানপাশে দেব?" নীলা বাবার দিকে চশমা উঁচু করে তাকাল।
শামসুল আলম মেয়ের মাথায় হাত রেখে মৃদু হাসলেন। "না মা, ঠিক আছে। তোর প্রেজেন্টেশন জেলা পর্যায়ে প্রথম হবেই। আর সুমাইয়া, তোর অঙ্ক শেষ হলে বলবি, আজ রাতে দুজনায় মিলে লুডু খেলব।"
"না বাবা, আজ আমি তোমাকে হারাবই!" সুমাইয়া খাতা থেকে মুখ তুলে হেসে বলল।
ফরিদা বেগম ডাইনিং টেবিল থেকে ডেকে বললেন, "তোমাদের খেলা আর পড়া পরে হবে। আগে হাত ধুয়ে টেবিলে এসো। আলম, তুমি আজ সারাদিন কিছু খাওনি, মুখটা শুকিয়ে গেছে।"
শামসুল আলম পরিবারের এই ছোট পৃথিবীটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক গভীর শান্তি অনুভব করলেন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সারাদিন টেকনাফের হাজারও মানুষের সমস্যা সামলানোর পর এই চার দেয়ালের হাসিমুখগুলোই ছিল তার আসল আশ্রয়।
টেবিলে সবাই একসাথে খেতে বসেছেন, এমন সময় শামসুল আলমের ফোনের স্ক্রিনে রফিক নামের এক পরিচিতের নাম ভেসে উঠল।
শামসুল আলম ফোন ধরে বললেন, "হ্যাঁ রফিক, বলো? আমি তো পরিবার নিয়ে টেবিলে বসেছি..."
ওপাশ থেকে অত্যন্ত বিনীত ও শ্রদ্ধাশীল গলায় রফিক বলল, "কাউন্সিলর সাহেব, মাফ করবেন ডিস্টার্ব করার জন্য। বিজিবি ক্যাম্পের নতুন কমান্ডার লে. কর্নেল সাব্বির রহমান সাহেব আপনাকে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছেন। উনি খুব ভদ্র লোক, টেকনাফের সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে পরিচিত হতে চাচ্ছেন। বেশি সময় লাগবে না, ১০-১৫ মিনিট।"
শামসুল আলম চশমাটা পরে স্ত্রীকে বললেন, "ফরিদা, নতুন বিজিবি কমান্ডার ডেকেছেন। লোকটা নাকি বেশ মার্জিত আর ভদ্র। আমি ১০ মিনিটের মধ্যে ঘুরে আসছি, তোমরা খাওয়া শুরু করো।"
নীলা উঠে এসে বাবার জ্যাকেটটা এগিয়ে দিল। "বাবা, তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু! আমার প্রেজেন্টেশনের ফাইনালাইজেশন কিন্তু তোমার সই ছাড়া হচ্ছে না।"
"১০ মিনিট মা, মাত্র ১০ মিনিট।" নীলার কপালে আদরের চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন শামসুল আলম। তিনি জানতেন না, এই হাসিমুখের পরিবারটিকে তিনি শেষবারের মতো দেখে গেলেন।
বিজিবি ক্যাম্পের গেটে পৌঁছাতেই শামসুল আলমকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।
দোতলার এসি রুমে বসে ছিলেন বিজিবি কমান্ডার লে. কর্নেল সাব্বির রহমান। সুপুরুষ, মার্জিত পোশাক, মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি।
"আসুন, আসুন কাউন্সিলর সাহেব!" সাব্বির রহমান নিজে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে শামসুল আলমের সাথে করমর্দন করলেন। "আপনার মতো একজন সৎ ও জনবান্ধব জনপ্রতিনিধির সাথে পরিচয় হতে পেরে সত্যি খুব ভালো লাগছে। চা নেবেন নাকি কফি?"
"ধন্যবাদ কমান্ডার সাহেব। আমি চা-ই খাব," শামসুল আলম আশ্বস্ত বোধ করলেন।
পরবর্তী দশ মিনিট সাব্বির রহমান সীমান্ত এলাকার টেকসই উন্নয়ন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অত্যন্ত সুশীল ও মার্জিত ভঙ্গিতে কথা বললেন। তার আচার-ব্যবহারে কোথাও কোনো অসঙ্গতি বা হিংস্রতার ছাপ ছিল না।
চা শেষ হওয়ার পর সাব্বির রহমান একটি কলম দিয়ে টেবিলে মৃদু টোকা দিলেন। তার মুখের সেই অমায়িক হাসিটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। চোখের মনি দুটো কেমন যেন বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এলো।
"কাউন্সিলর সাহেব," সাব্বির রহমান গলা অত্যন্ত নিচু ও ঠাণ্ডা করে বললেন। "এবার একটু অফ-দ্য-রেকর্ড কাজের কথা বলি?"
"জি বলুন?"
সাব্বির রহমান ড্রয়ার থেকে একটি লাল ফাইল বের করে টেবিলে রাখলেন। "টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকার লেনদেন হয়। আপনার মতো প্রভাবশালী কাউন্সিলর যদি আমার 'স্পেশাল ফান্ডে' মাসে ৫০ লাখ টাকা করে দেন... তবে এই সীমান্তে আপনার যেকোনো ব্যবসা নির্বিঘ্নে চলবে। আর যদি না দেন..."
সাব্বির রহমান ফাইলটি খুললেন। ভেতরে শামসুল আলমের ভুয়া সই করা কিছু মিথ্যা ইয়াবা চালানের কাগজ।
শামসুল আলম স্তম্ভিত হয়ে গেলেন! একটু আগে যে লোকটি এত অমায়িক কথা বলছিল, মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরে লুকানো এক ভয়ঙ্কর দানব বের হয়ে এসেছে!
"এসব কী কমান্ডার সাহেব?" শামসুল আলম ক্ষোভ সামলাতে পারলেন না। "আপনি একজন দায়িত্বশীল অফিসার হয়ে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছেন?"
সাব্বির রহমান মৃদু হেসে একটা সিগারেট ধরালেন। "এটা ব্ল্যাকমেইল নয়, এটাকে বলে 'বর্ডার ট্যাক্স'। আপনি ভদ্রভাবে রাজি না হলে, এই ফাইল কাল সকালে ডিরেক্টরেটে যাবে। আপনি হবেন চিহ্নিত চোরাকারবারি।"
"আমি এক টাকাও দেব না!" শামসুল আলম সোজা দাঁড়িয়ে উঠলেন। "আপনার মতো দুর্নীতিবাজের সামনে আমি মাথা নত করব না। আমি আদালতে যাব!"
সাব্বির রহমান ধোঁয়া ছেড়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন। "আদালত? আপনি বড্ড কাঁচা খেলোয়াড়, কাউন্সিলর। আমার সাথে কথা কাটাকাটি করে আজ পর্যন্ত কেউ আদালতে পৌঁছাতে পারেনি।"
কমান্ডার ইশারা করতেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সশস্ত্র সদস্য ভেতরে ঢুকল। শামসুল আলম বুঝতে পারলেন, তিনি এক সাজানো মরণফাঁদে পা দিয়েছেন।
রাত ১১টা ১৫ মিনিট। মেরিন ড্রাইভ রোড।
বঙ্গোপসাগরের গর্জন আর নিঝুম পাহাড়ি সড়কের মাঝে বিজিবি পিকআপ থেকে ধাক্কা দিয়ে নামানো হলো হাত বাঁধা শামসুল আলমকে।
পকেটের ভেতরে থাকা মোবাইল ফোনে তার আঙুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্পিড ডায়ালে চেপে বসেছে। ওপাশে রিসিভ হয়েছে কল।
বাড়িতে খাবারের টেবিলে বসে থাকা নীলা ফোনে শুনতে পেল সমুদ্রের বাতাসের বিকট গর্জন।
"বাবা? বাবা তুমি কোথায়? তোমার এত দেরি হচ্ছে কেন?" নীলা আকুল হয়ে ডাকল।
কিন্তু শামসুল আলম কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তার ঠিক তিন ফুট সামনে দাঁড়িয়ে সাব্বির রহমান, যার হাতে এখন একটি ৯ এমএম পিস্তল।
"কাউন্সিলর, শেষ সুযোগ। রাজি আছেন?" সাব্বির রহমান পিস্তলের কক করলেন—'ক্লিক'।
শামসুল আলম জানতেন, পকেটের ফোনে নীলা সব শুনছে। তিনি যদি আজ ভয় পেয়ে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন, তবে তার দুই মেয়ে সারাজীবন একজন 'অপরাধীর সন্তান' হিসেবে সমাজ থেকে ঘৃণা পাবে। তাকে সত্যটা রেখে যেতেই হবে।
শামসুল আলম জীবনের শেষ শক্তিতে বুক ফুলিয়ে চিত্কার করে উঠলেন—
"আমি কোনো চোরাকারবারি নই! আপনি আইনের পোশাক পরা একজন খুনি, সাব্বির রহমান! আমার সততা আমি বিক্রি করব না!"
ফোনের ওপার থেকে নীলা বাবার এই চেনা গর্জন শুনতে পেয়ে শিউরে উঠল। "বাবা! কার সাথে কথা বলছ—??"
কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনের স্পিকার চিরে ভেসে এলো দুটি হাড়হিম করা শব্দ—'ঠাস! ঠাস!'
বুকে দুটি তপ্ত গুলি নিয়ে কাদা-বালুর ওপর লুটিয়ে পড়লেন শামসুল আলম। পকেট থেকে ফোনটি ছিটকে বালুতে পড়ল। সাব্বির রহমান বুটের তলায় ফোনটি মাড়িয়ে ভেঙে দিলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিন কিলোমিটার দূরে নীলার মোবাইলের অটো-কল রেকর্ডারে জমা হয়ে গেছে সেই খুনের স্পষ্ট অডিও প্রমাণ।
পরদিন সকালে পত্রিকায় খবর এলো—এনকাউন্টারে চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি শামসুল আলম নিহত।
জুলাই, ২০২৬।
রাজনীতি ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ আট বছর পার হয়ে গেছে। শামসুল আলমের পরিবার আজ নিঃস্ব। তবে সেই রাতের ট্র্যাজেডি আজ আর সাধারণ কোনো গল্প নয়।
পিবিআই স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন উইংয়ের প্রধান কার্যালয়।
ডেস্কে বসে আট বছর আগের সেই 'শামসুল আলম এনকাউন্টার' ফাইলটি উল্টেপাল্টে দেখছেন স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান আহমেদ। সরকারের বিশেষ নির্দেশে এই কোল্ড কেসটি পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে।
আরিয়ানের সামনে বসে আছেন ২৫ বছরের তরুণী আইনজীবী নীলা। তার চোখে এখনো বাবার অন্যায্য মৃত্যুর বিচার পাওয়ার জেদ।
"আরিয়ান স্যার," নীলা টেবিলে একটি এনক্রিপ্টেড পেনড্রাইভ রাখলেন। "৮ বছর ধরে বিজিবি এবং স্থানীয় পুলিশ আমাদের জিডি পর্যন্ত নেয়নি। এই কল রেকর্ডটা আমার কাছে আছে, কিন্তু পুলিশ রিপোর্ট বলছে সেদিন কোনো মোবাইল উদ্ধার হয়নি এবং আমার বাবা নাকি বিজিবিকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলি চালিয়েছিলেন।"
আরিয়ান পেনড্রাইভটি তার ল্যাপটপে প্লাগ-ইন করলেন। তিনি সাধারণ কোনো পুলিশ কর্মকর্তা নন; তিনি স্পেকট্রাম অ্যানালাইসিস এবং ফরেনসিক সায়েন্সের বিশেষজ্ঞ।
আরিয়ান অডিও ফাইলটি একস্ট্যান্ডার্ড সাউন্ড ফিল্টারে ফেললেন। সাউন্ড ওয়েভ স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
"মজার ব্যাপার দেখছেন, নীলা?" আরিয়ান ল্যাপটপের স্ক্রিনে আঙুল দিয়ে দেখালেন। "ঘটনার সময় তৎকালীন বিজিবি রিপোর্ট বলেছিল—শামসুল আলম রিভলভার থেকে ৩ রাউন্ড গুলি চালান এবং জবাবে বিজিবি ২ রাউন্ড গুলি করে। কিন্তু এই অডিওর ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস বলছে—এখানে শুধু একটাই ওয়েপন ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলো ৯ এমএম সরকারি পিস্তল। আর প্রথম গুলির আগে ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা নির্দিষ্ট সাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে।"
"কিসের সাউন্ড, স্যার?"
"কার্টিজ ইজেকশন আর বুটের ঘর্ষণ। সবচেয়ে বড় কথা, আপনার বাবার শেষ কথার ঠিক ১.২ সেকেন্ড আগে যে ভয়েস টিম্বার রেকর্ড হয়েছে, সেটা হলো—’মোবাইলটা খতম কর’।"
আরিয়ানের চোখে এক ঠাণ্ডা দূরদর্শিতা ফুটে উঠল। "এই অডিওটা ৮ বছর ধরে কোল্ড কেস হয়ে ছিল কারণ কেউ সায়েন্টিফিক এভিডেন্স মেলানোর সাহস করেনি। সাব্বির রহমান এখন অবসরে আছেন, ভাবছেন তিনি নিরাপদ। আমরা কেসটা নতুন করে রি-ওপেন করছি।"
আরিয়ান তার টিম নিয়ে সোজা চলে এলেন টেকনাফের সেই পুরোনো মেরিন ড্রাইভের স্পটে।
সাত বছর পর সমুদ্রের পাড়ের ভৌগোলিক পরিবর্তন হলেও আরিয়ান স্যাটেলাইট জিআইএস ম্যাপ দিয়ে ২০১৮ সালের ১০ মে রাতের নিখুঁত কো-অর্ডিনেট বের করলেন।
"বর্ষা," আরিয়ান তার জুনিয়র অফিসারকে নির্দেশ দিলেন, "অফিসিয়াল ময়নাতদন্তের রিপোর্টটা বের করো। ৮ বছর আগে বলা হয়েছিল গুলি দুটো সামনে থেকে চালানো হয়েছিল।"
বর্ষা ফাইল দেখে বলল, "জি স্যার। রিপোর্টে বলা আছে বুক থেকে গুলি ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে।"
"মিথ্যা!" আরিয়ান ব্যালাস্টিক সিমুলেশন সফটওয়্যার অন করলেন। "স্পেকট্রোস্কোপিক অডিও টেস্টে গুলির যে 'ডিসটেন্স ইকো' পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট—শূণ্য রেঞ্জ বা পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালানো হয়েছিল। যদি সামনে থেকে গুলি চালানো হতো, তবে জামায় পোড়া দাগ থাকত। কিন্তু তৎকালীন সুরতহাল রিপোর্টে জামার পোড়া দাগ গোপন করা হয়েছে।"
আরিয়ান এবার ডাকলেন তানভীরকে। "তানভীর, ২০১৮ সালের ১০ মে রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে টেকনাফ বিজিবি ক্যাম্পের মোবাইল টাওয়ারের বিটিএস লগ বের করো।"
তানভীর কি-বোর্ডে হাত চালিয়ে বলল, "আরিয়ান ভাই! সাব্বির রহমানের অফিশিয়াল নম্বর বন্ধ ছিল, কিন্তু তার স্যাটেলাইট ট্র্যাকার হ্যান্ডসেটের লোকেশন রাত ১১টা ১৫ মিনিটে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে মেরিন ড্রাইভের দিকে গিয়েছিল! আর ঠিক ১১টা ২২ মিনিটে ওই লোকেশনেই শামসুল আলমের ফোনের সিগন্যাল চিরতরে ড্রপ করে!"
আরিয়ান ডায়েরিটা বন্ধ করলেন। "ডিজিটাল এভিডেন্স, ব্যালাস্টিক রিপোর্ট আর অডিও ভয়েস ম্যাচিং—তিনটি বিন্দুই এখন এক লাইনে মিলে গেছে। এবার ইঁদুর ধরা পড়ার পালা।"
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনাকীর্ন এজলাস।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন সাবেক লে. কর্নেল সাব্বির রহমান। তাঁর চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এখনো সেই পুরোনো প্রশাসনিক দম্ভ। তাঁর আইনজীবী আদালতে দাবি করছিলেন—"ইয়োর অনার, আট বছর আগের একটি ভুয়া কল রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে আমার মক্কেলকে ফাসানো হচ্ছে। এই অডিওর কোনো আইনি ভিত্তি নেই!"
বিচারক আরিয়ানের দিকে তাকালেন। "তদন্তকারী কর্মকর্তা, এই অডিওটি যে বিকৃত নয়, তার পক্ষে আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে?"
আরিয়ান এজলাসের প্রজেক্টর অন করলেন।
"ইয়োর অনার," আরিয়ান শান্ত কিন্তু শক্ত গলায় বললেন। "আমরা অডিওটির ডিজিটাল ফরেনসিক হ্যাশ ভ্যালু পরীক্ষা করেছি। ২০১৮ সালের ১০ মে রাত ১১টা ২৪ মিনিটে নীলা আলমের মোবাইলে ফাইলটি যেভাবে সেভ হয়েছিল, আজ পর্যন্ত এর ১ বাইট ডেটাও পরিবর্তন হয়নি।"
আরিয়ান প্রজেক্টরে অডিও স্পেকট্রোগ্রাম চালু করলেন।
"কেবল তাই নয়," আরিয়ান বলতে লাগলেন, "অডিওতে ভেসে আসা ’মোবাইলটা খতম কর’ কথাটির ভয়েস ফ্রিকোয়েন্সি আমরা আসামির বর্তমান ভয়েস স্যাাম্পলের সাথে ন্যাশনাল ফরেনসিক ল্যাবে ম্যাচ করিয়েছি। ম্যাচিং স্কোর ৯৯.৮%! এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যালাস্টিক ট্র্যাজেক্টরি রিপোর্ট—যা প্রমাণ করে কোনো গোলাগুলি হয়নি, বরং নিঃশ্বেসবস্থায় পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে শামসুল আলমকে হত্যা করা হয়েছে।"
আদালতের স্পিকারে আবার বাজিয়ে দেওয়া হলো সেই রাতের অডিওটি—
"আমি কোনো চোরাকারবারি নই! আপনি আইনের পোশাক পরা একজন খুনি, সাব্বির রহমান!"
কমান্ডার সাব্বিরের স্পষ্ট হুকুম: "মোবাইলটা খতম কর।"
'ঠাস! ঠাস!'
এজলাসে উপস্থিত সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে গুঞ্জন এবং ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সাব্বির রহমানের হাত কাঁপতে শুরু করল। আট বছর ধরে সাজিয়ে রাখা তার 'এনকাউন্টারের নিখুঁত মিথ্যা' আজ বিজ্ঞানের মেথড আর কোল্ড কেস ইনভেস্টিগেশনের কাছে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
বিচারক হাতুড়ি ঠুকলেন।
"আসামী সাব্বির রহমানের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। আদালত তাকে..."
পরোক্ষভাবে ঘোষিত রায়ের শব্দে কেঁপে উঠল এজলাস।
কোর্টরুম থেকে বের হয়ে এলেন আরিয়ান। বাইরে বিকেলের মিষ্টি রোদ পড়েছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নীলা আর তার ছোট বোন সুমাইয়া অঝোরে কাঁদছে—তবে এ কান্না আর হাহাকারের নয়, এ কান্না আট বছর পর বিচার পাওয়ার স্বস্তির।
আরিয়ান চশমাটা পকেটে রেখে আকাশের দিকে তাকালেন। অপরাধী যতই ক্ষমতাশালী হোক আর কেস যতই পুরোনো হোক না কেন—বিজ্ঞানের যুক্তি, সত্য আর প্রখর তদন্তের সামনে কোনো মিথ্যাই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


