আমাদের মতো জলবায়ু আর ইতিহাসের মার্যাদায় বড় হওয়া বাঙালি জাতির কাছে ইলিশ কেবল একটি রূপালি রঙের মৎস্যকূলের সদস্য নয়; এটি এক অনুপম আবেগের প্রতীক, একটি সামাজিক আভিজাত্য।
নতুন জামাই প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় হাতে অন্তত এক জোড়া চকচকে রূপালি ইলিশ ঝুলিয়ে না নিয়ে গেলে যেন মান থাকে না। ওদিকে শ্বশুরমশাইও জামাইকে আপ্যায়ন করতে গিয়ে বাজারের সবচেয়ে বড় ও তাজা ইলিশটি কেনার জন্য পকেটের শেষ সম্বলটুকু উজাড় করে দিতে দ্বিধা করেন না। দুর্গাপূজা এলে আমাদের ভৌগোলিক সীমান্তের ওপাশের বন্ধুদের জন্য এই ইলিশ হয়ে ওঠে 'পদ্মা কূটনীতি'র ট্রাম্পকার্ড। আমরা নিজেরা না খেয়ে, দেশের বাজার অগ্নিমূল্য রেখেও ওপার বাংলায় ইলিশ পাঠিয়ে আনন্দ পেতাম—আহা, কূটনীতি বলে কথা!
কিন্তু হঠাৎ আবহাওয়ার এমন উল্টো বাতাস শুরু হলো যে, সেই রাজকীয় ‘জাতীয় মাছ’ এখন ভারত আর মিয়ানমার থেকে আমদানি করতে হচ্ছে!
সম্প্রতি প্রকাশিত এনবিআরের এক চমকপ্রদ খবরে চোখ আটকে গেল। গত সোয়া এক বছরে নাকি ভারত থেকেই কয়েক লাখ কেজি ইলিশ ঢুকেছে আমাদের দেশে। এমনকি কোনো কোনো আমদানিকারক নাকি মাত্র ‘৫৭ টাকা কেজি’ মূল্যে ভারত থেকে ইলিশ আনার কাগজ জমা দিয়েছেন! যে দেশে বাজারে গিয়ে ১ কেজি ওজনের ইলিশের দিকে তাকালে বিক্রেতার হাঁকানো দাম শুনে চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হয়, সেই দেশে ৫৭ টাকা কেজি দরে ভারত থেকে ইলিশ আসাটা এক ঐতিহাসিক স্যাটায়ার বললেও কম বলা হয়!
অবশ্য ব্যবসায়ীরা মন খারাপ করে খোলাস করেছেন—এই ইলিশ নাকি আমাদের রুপালি পদ্মা-মেঘনার সুস্বাদু ইলিশ নয়। এটি আরব সাগরের গুজরাটি ইলিশ। সাইজে ছোট, স্বাদে ক্ষীরের বদলে শুঁটকির স্বাদ আর বেশিরভাগই নাকি ডিম ছেড়ে দেওয়া ক্লান্ত মাছ। তাই দামে এত সস্তা! অর্থাৎ, ভারতের বাঙালিরা যে ইলিশের আসল স্বাদ পাওয়ার জন্য ওপার থেকে আমাদের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে, সেই একই স্বাদের কাঙাল হয়ে আমরা এখন ভারত থেকে সস্তা গুজরাটি মাছ আনছি!
বিষয়টি দেখতে দেখতে আমাদের সেই ঐতিহাসিক ‘চা-শিল্পের’ রূপকথার কথা মনে করিয়ে দেয়। একসময় এই বাংলা ছিল চা উৎপাদনের স্বর্গরাজ্য। বিশ্বজুড়ে প্রিমিয়াম মানের চা রপ্তানি করে আমরা গর্বে বুক ফুলাতাম। তারপর কী হলো? অভ্যন্তরীণ ব্যাপক চাহিদা, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক নীতি আর উৎপাদনের চেয়ে আমদানির ওপর ঝোঁকের কারণে চা রপ্তানিকারক দেশ থেকে আমরা হয়ে গেলাম অন্যতম চা আমদানিকারক দেশ।
আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের ভাগ্যরেখাও কি তবে সেই চায়ের পথেই হাঁটা শুরু করল?
নদীতে পলি জমে নাব্যতা হ্রাস, অবাধে জাটকা নিধন, কারেন্ট জালের মহোৎসব, সাগরে মাফিয়াদের অনিয়ন্ত্রিত ট্রলিং আর জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় রুপালি ইলিশ কি তবে আমাদের নদীগুলো থেকে সত্যি সত্যই পালিয়ে যাচ্ছে?
দুর্গা পূজার আগে পশ্চিমবঙ্গের মাছ ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরের মতো এবারও বিনীত আর্জি নিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দরজায় কড়া নাড়ছেন—"দাদা, কিছু ইলিশ পাঠান!" কিন্তু আমাদের দেশের বাজারে বর্তমানে সাধারণ মানুষের পক্ষে সাধারণ মানের ইলিশ কেনাও যেখানে বিলাসী স্বপ্ন, সেখানে আমরা আর কাকে কী পাঠাব? নিজের পাতের মাছটাই তো এখন গুজরাট কিংবা মিয়ানমারের ওপর ভরসা করে কোনোমতে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।
যেই ইলিশ দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজকীয় ভাব নিতাম, এখন ভারত থেকে কেজিপ্রতি ৫৭ টাকা দামের পেপারওয়ার্কের ইলিশ এনে সেই অভাব পূরণ করতে হচ্ছে—এর চেয়ে বড় স্যাটায়ার আর কী হতে পারে!
আমরা দিন দিন কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি? এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছর পর হয়তো আমাদের বলতে হবে—"পদ্মার ইলিশ এখন ইতিহাস, বাজারে যেটা ঝুলছে, ওটা গুজরাটের উপহার!"
প্রকৃতি ও নদীগুলোকে বাঁচানোর জন্য কার্যকর ও কঠোর বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ এখনই না নিলে—চায়ের মতো আমাদের প্রিয় ইলিশও কেবল জাতীয় প্রতীকের পাতায় আর রেস্তোরাঁর ইতিহাসের অ্যালবামে ছবি হয়েই রয়ে যাবে।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




