somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সৌদির আকাশে সংঘাতের কালো মেঘ আর প্রবাসীদের পুরনো বন্দিদশা: আমাদের শ্রমবাজারের নতুন সংকট

১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাইরে যুদ্ধাবস্থা, রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে হুতিদের লাগাতার ড্রাফট-মিসাইল হামলা, আর অন্যদিকে সৌদি আরবগামী ফ্লাইটগুলো একে একে বাতিল বা স্থগিত—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে আবারও এক মারাত্মক অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক এক খবরে জানা গেল, রিয়াদের বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অনেকে। এই প্রাণঘাতী ঘটনার পর থেকেই ঢাকা থেকে রিয়াদ ও জেদ্দাগামী ফ্লাইটগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ বা স্থগিত হয়ে গেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য বলছে, সরাসরি ও ট্রানজিট রুটের অন্তত ৬১টি ফ্লাইটে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে, যার ফলে আটকে গেছেন প্রায় সাড়ে আট হাজার যাত্রী।

ছুটিতে দেশে আসা কর্মীরা যথাসময়ে কাজে ফিরতে না পেরে বিমানবন্দর ঘুরে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, চাকরি হারানো এবং সংসার নিয়ে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন হাজার হাজার রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

আমাদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল স্তম্ভটিই হলো মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, যার সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে সৌদি আরব। অন্যান্য বড় শ্রমবাজার বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় দেশটির ওপর আমাদের নির্ভরতা এখন এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে, সেখানে সামান্য ভূরাজনৈতিক ধাক্কা লাগলেই পুরো দেশের অর্থনীতিতে কম্পন শুরু হয়। বিএমইটির পরিসংখ্যান তো সেই আশঙ্কাজনক চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে, আর একাই সৌদি আরবে যাওয়ার হার কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ!

সবচেয়ে লজ্জার ও আশঙ্কার বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারগুলো আমাদের হাতছাড়া হয়ে এখন চলে যাচ্ছে নেপালের মতো দেশের দখলে। অথচ কূটনৈতিক ব্যর্থতা আর বিকল্প বাজার তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে আমরা আজও একটি মাত্র দেশের ওপর অন্ধের মতো নির্ভর করে আছি।

এই সামগ্রিক সংকটের বাইরেও আমাদের প্রবাসী ব্যবসায়ীদের মানসিকতা নিয়েও কিছু গভীর আত্মোপলব্ধির সময় এসেছে। সৌদি আরবে আইনের বড় ধরনের যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে অনেক আগেই। এখন বিদেশি নাগরিকেরা সেখানে চাইলে নিজস্ব কোম্পানি খুলতে পারেন, নিজ নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারেন এবং ব্যবসা ও সম্পদে তাঁদের শতভাগ স্বাধীন আইনি মালিকানা বজায় থাকে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের দেশের বহু মানুষ যারা বছরের পর বছর ধরে সেখানে সুনামের সাথে ব্যবসা করছেন, তাঁরা আজও সেই পুরনো 'কফিল' বা স্পন্সর পদ্ধতির শেকল ছাড়তে পারছেন না। যেমন ধরুন, আমার এক চাচাতো ভাই বা আত্মীয়স্বজনের কথাই। তাঁরা সৌদিতে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করেন এবং বেশ ভালো অবস্থানে আছেন। তাঁদের সাথে কথা হলে তাঁরা সাফ জানিয়ে দেন—“আমরা এখানে বসে কফিলের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাবো, যাওয়ার সময় কাঁঠালের ময়লাগুলো তাকে দিয়ে দেবো! আমাদের এতো ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কি?”

তাঁরা হয়তো সাময়িক স্বস্তি পাচ্ছেন এই ভেবে যে কফিলের আশ্রয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সহজ, কিন্তু তাঁরা এটা বুঝতে পারছেন না যে একটি স্বাধীন কোম্পানি গঠন করলে নিজের বৈধ ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, নিরাপদে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা যায় এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে সেই ব্যবসার উত্তরাধিকার ও স্থায়ী আইনি মালিকানার সুযোগ করে দেওয়া যায়। পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ কফিল প্রথার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে চিরকাল ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার দিন এখন আর নেই। সৌদি সরকারের বর্তমান আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকে কাজে না লাগালে দিনশেষে আমাদের প্রবাসীরাই সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।

আজ একদিকে যুদ্ধ আর হুতিদের হামলায় আমাদের প্রবাসীদের জীবন হুমকির মুখে, অন্যদিকে শ্রমবাজারের অব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক মানসিকতার জড়তা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে যেমন অবিলম্বে বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে বিশেষ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি বা আটকে পড়া কর্মীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, তেমনই আমাদের প্রবাসীদেরও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও নিরাপদ আইনি কাঠামোর আওতায় ব্যবসা পরিচালনার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চাকা সচল রাখেন এই প্রবাসীরাই। তাঁদের এই মেধা, শ্রম আর রক্তঝরা বৈদেশিক অর্জনকে সুরক্ষার জন্য যদি এখনই একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এক গভীর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে আমাদের।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি হল অথর্ব আর ইডিয়েটদের দল। বর্তমানে এদের দেশ পরিচালানার করার কোন যোগ্যতা ই নেই।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:২৩

রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেয়াটা নিন্দনীয় কিন্ত তার বিচার হবে কিসে? রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলায়?? রিমান্ডে নিয়ে?

চৈতালি চক্রবর্তী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সে আইন বুঝে। প্রায় প্রতিদিন জুলাই, আবু সাইদ, বাংলাদেশ সব কিছু সম্পর্কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিতে আতঙ্ক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫০


দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×