somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই নাকি বিআইডব্লিউটিসি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং সরকারের ৭১৭ কোটি টাকার ঋণের কিস্তি পরিশোধের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে!

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩৭ কোটি টাকারও বেশি। শুধু তা-ই নয়, একসময় আয়ের মূল উৎস মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আয়ের গ্রাফ কেবল নিচের দিকেই নেমেছে। লোকসান সামাল দিতে তাদের বিলাসবহুল যাত্রীবাহী নৌযান এমভি বাঙালি, এমভি রূপসা, এমভি মধুমতি ও এমভি সুগন্ধাকে এখন ভাসমান হাসপাতালে রূপান্তরের খাতা-কলমে পরিকল্পনা চলছে, সোনারগাঁওকে করা হয়েছে ভাসমান রেস্তোরাঁ, আর ঐতিহ্যবাহী চারটি প্যাডেল স্টিমারের তিনটিই এখন অলস পড়ে আছে।

এখন প্রশ্ন হলো, পদ্মা সেতু চালু হওয়াটাই কি বিআইডব্লিউটিসির এই করুণ পরিণতির একমাত্র কারণ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে সরকারি আমলাতন্ত্রের চরম অনভিজ্ঞতা, অনিয়ম-দুর্নীতি আর বাণিজ্যিক ভিশনের অভাব?

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে প্রভাব পড়েছে—এটা সত্য। কিন্তু তাই বলে কি নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা একদম থমকে গেছে? তা তো নয়! বেসরকারি লঞ্চ মালিকদের দিকে তাকালেই তো আসল সত্যটা আয়নার মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। পদ্মা সেতু চালুর পরও কিন্তু বরিশাল রুটের লঞ্চ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়নি। যদি এই খাত একেবারে অলাভজনকই হয়ে যেত, তবে কিছুদিন আগে বরিশাল রুটে বিশালাকার ও অত্যাধুনিক ‘এম. খান’ লঞ্চটি কেন সার্ভিসে নামানো হতো? বেসরকারি মালিকরা ঠিকই ব্যবসা বুঝে কৌশল বদলে লাভজনকভাবে লঞ্চ চালাচ্ছেন, অথচ সরকারি সংস্থা দিনশেষে লোকসানের জঘন্য অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে।

আসলে মূল সমস্যাটা আমাদের সরকারি সিস্টেমে। সরকারি সংস্থাগুলো যাঁরা পরিচালনা করেন, সেই আমলা বা কর্মকর্তাদের বড় অংশই ব্যবসা বোঝেন না। তাঁরা শুধুই চাকরি করেন, মাস শেষে নিশ্চিত বেতন পকেটে পুরেন। প্রতিষ্ঠান লাভে চলুক কিংবা তলানিতে গিয়ে ঠেকুক—তাতে তো তাঁদের বেতন আটকায় না! এটি যদি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতো, তবে ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে যেকোনো মূল্যে একে লাভে ফেরানো হতো, অথবা অলাভজনক খাতটি বন্ধ করে নতুন সম্ভাবনাময় পথ খোঁজা হতো।

বিআইডব্লিউটিসির অলস বসে থাকা বা ভাসমান হাসপাতাল বানানোর নামে ফেলে রাখা এই মূল্যবান সম্পদগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তার হাজারটা বাণিজ্যিক উপায় আছে। একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া যাক—খুলনা থেকে সুন্দরবনে যেসব বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল পর্যটকবাহী জাহাজ চলে, সেগুলোর সার্ভিস যেমন দারুণ, তেমনই লাভজনক। পর্যটন মৌসুমে এই শিপগুলো খুলনা থেকে পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনে যায়, দুই-তিন দিন অবস্থান করে আবার ব্যাক করে। বিআইডব্লিউটিসির যে বড় বড় আধুনিক জাহাজগুলো আছে, সেগুলোকে ভাসমান হাসপাতাল বানিয়ে ফেলে না রেখে পর্যটন মৌসুমে ঢাকা থেকে সুন্দরবনে রুট করে চালানো যেতে পারে, অথবা চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন রুটে নামানো যায়।

একইভাবে, তাদের পুরনো যে ঐতিহ্যবাহী রকেটগুলো অলস পড়ে আছে, সেগুলোকে ভাসমান রেস্তোরাঁ বা ট্যুরিস্ট ক্রুজে রূপান্তর করে ঢাকা থেকে চাঁদপুর কিংবা মেঘনা নদী পর্যন্ত চালানো যায়। আর বর্ষা মৌসুমে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নিয়ে গিয়ে চমৎকার 'হাউসবোট' হিসেবেও তো পরিচালনা করা সম্ভব! এমনকি সরকারি ব্যবস্থাপনায় যদি একান্তই চালানো সম্ভব না হয়, তবে এই বড় জাহাজগুলোকে উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়া যেতে পারে, কিংবা পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভাসমান আবাসিক হোটেল হিসেবে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব।

সম্প্রতি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের পেছনের আসল কারণ ও অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে দুই মাসের সময় বেঁধে দিয়ে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কেবল কমিটি গঠন আর অজুহাতের সংস্কৃতি দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাঁচানো যাবে না। আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা ঝেড়ে ফেলে বেসরকারি খাতের মতো ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তা ও সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োগ করতে না পারলে, পদ্মা সেতুর দোহাই দিয়ে বিআইডব্লিউটিসিকে একসময় পুরোপুরি ইতিহাসের জাদুঘরে ঠাঁই নিতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×