অনেক অনেক আগের কথা। এক গাঁয়ে বাস করত এক অতি অতি অলস লোক; বয়েস তার অনেক, কিন্তু কিছুতেই সে কোন কাজ করবেনা!! সারাদিন গাঁয়ের এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াবে, এর ওর ব্যাপারে নাক গলাবে, যেখানে তাকে কেউ পাত্তা দেয়না সেখানে গিয়েও অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করবে। এমন অকর্মা হলে কি হবে, ঠিকই সে বিয়ে করেছে, তবে একটিই, আর তার ছেলেমেয়েও আছে গোটা ছ'য়েক। এটা ওটা দিয়ে কষ্টে-শিষ্টে লোকটার দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিল। কিন্ত,ু যখন তার বড় মেয়েটির বিয়ে দেবার বয়স হলো, তখনই বেচারার আপাত সুখী জীবনে একটা ছেদ পড়ে গেল।
মেয়েদের বিয়ের বয়স হলে মায়েদের তোড়জোড় বাড়ে, বাবাদের প্রতি গলার স্বর উঁচু হয়। লোকটির বউয়ের ক্ষেত্রেও তার বিপরীত হলোনা। বউয়ের বকাঝকা আর সহ্য করতে না পেরে লোকটি মনেমনে ঠিক করল যে েবার সে কাজকর্ম কিছু একটা করবেই। হাজার হোক, যখন সে শ্বশুর হবে তখন তো তার মান-ইজ্জত বলে একটা ব্যাপার আছে! যেই ভাবা সেই কাজ। লোকটি গেল মহাজনের কাছে ধার আনতে, ব্যাবসার জন্য পুঁজি লাগবে বলে। মহাজনও দরাজ দিলে ধার দিল, কাগজে কলমে পড়িয়ে রাখল কতদিনের মধ্যে ধার শোধ করতে হবে এসব। হাতে একগাদা টাকা পেয়ে লোকটার মন ফুরফুরে, সোজা চলে গেল হাটে। বউয়ের জন্য শাড়ী, ছেলেমেয়ের জন্য শখের এটাওটা, নিজের জন্যও কিছু। কোনদিন তো আর কাউকে কিছু দিতে পারিনি! আজ না হয় একটু বাজে খরচই করলাম, লোকটা ভাবল মনে মনে। বাড়ী ফেরার পর বাড়ীতে বয়ে গেল আনন্দের উৎসব, লোকটার আজ নিজের গলার স্বরই বাড়া! বউটাও কেমন নরম নরম সুরে কথা বলছে যেন আজ; লোকটার নিজেকে খুব সুখী মনে হলো। তারপরের বেশকিছুদিন লোকটার খুবই ভালো কাটল, আনন্দে আর আহলাদে। কিন্তু, দেখতে দেখতে একসময় ধারকরা সমস্ত টাকাই এল ফুরিয়ে; অথচ ব্যাবসার কিছুই করা হলোনা!
লোকটার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল যেন। এখন সে কি করবে? সে হাটে যাওয়া বন্ধ করে দিল, পাছে মহাজনের লোকজন তাকে দেখে ফেলে। আর মহাজনের বাড়ীর এক মাইলের মধ্যে তো কোনভাবেই ঢোকা যাবেনা। মনে মনে তার একটাই আশা, লম্বা সময় তাকে না দেখে যদি কোনভাবে দৈবক্রমে মহাজন টাকার কথা ভুলে যায়। কিন্তু মানুষের সব আশা তো আর পূরণ হয়না! বিশেষ করে আশাটা যদি হয় কোন মহাজনের টাকার কথা ভুলে যাওয়া সংক্রান্ত। অতএব, যথাসময়ে মহাজনের আগমন ঘটল লোকটার ঘরে। সবার মনে হতে পারে মহাজন লোকটা অত খারাপ না। কারণ, লোকটার দূরাবস্থা দেখে সে তাকে আরও একমাস সময় দিল। কিন্তু এর পেছনে অন্য এক কারণ তো অবশ্যই ছিল। আর সেটা হলো, লোকটার বিবাহযোগ্যা সুন্দরী মেয়েটি কিন্তু মহাজনের নজর মুবারাক এড়ায়নি। এমন নিষ্কর্মা লোককে যে আরও এক বছর সময় দিলেও সে কিছুই করতে পারবেনা এটা মহাজন ভালোই বুঝত। অতএব, যেটুকু ত্যাগ মহাজন ্বিীকার করল তা হলো মেয়েটিকে বিবাহ করার জন্য আরও একমাস অপেক্ষা করা।
একমাস পর লোকটার ঘরে মহাজনের আবার আগমন, এবং যথারীতি লোকটার কান্নাকাটি 'হুজুর আরও কিছুদিন সময় দিন' এসব ছাইপাশ বলে বলে। মহাজনই বা আর কত সহ্য করবে! সে তো আর শুধু জনসেবার জন্য ব্যাবসা করতে আসেনি। কাজেই মহাজনও অনড়, কারণ একবার তো লোকটাকে সে সময় দিয়েছেই। এমন সময় মহাজনের চামচাটা লোকটাকে মুখফুটে বলেই ফেলল মেয়েটাকে বুড়ো মহাজনের সাথে বিয়ে দেবার কথা। অসহায় লোকটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল - কিন্তু তার তো কিছু করারও নেই। অগত্যা সে রাজী হলো, এমন অসহায় অবস্থা দেখে লোকটার মুখরা বউটাও রাজী হয়ে গেল। কিন্তু বাঁধ সাদল লোকটার দু'পাতা ইংরেজী পড়া বড় মেয়ে, অর্থ্যাৎ বিয়ের পাত্রী। সে কিছুতেই এ বিয়ে করবেনা! মরে গেলেও না! সারাবাড়ী জুড়ে মেয়েটি মরাকান্না জুড়ে দিল। এমন অবস্থা দেখে বেচারা মহাজনেরও মান-ইজ্জত নিয়ে টানাটানি। যে মেয়েকে তার আজ নতুন বউ হিসেবে ঘরে তোলার কথা সে কিনা তাকে এভাবে অপমান করল! মহাজন তার নতুন প্রস্তাব পেশ করল সবার সামনে।
মহাজন বলল, আমি একটা থলেতে একটা কালো আর একটা সাদা পাথর রাখব। তারপর মেয়েটি সেখান থেকে একটি পাথর তুলবে। যদি সে কালো পাথর তোলে, তাহলে আমি নিঃশর্তে সব ঋণ মাফ করে দেব; আর যদি সে সাদা পাথর তোলে তাহলে আমার এই ছোট্ট দাবীটা মানতে হবে। উপস্থিত সবাই আসন্ন মজার আশায় সায় দিল মহাজনের প্রস্তাবে। মেয়েটি আর কি করবে? সেও রাজী হয়ে গেল, যদি কোনভাবে ভাগ্যদেবী তার হাতে কালোপাথর তুলে দেন - এই আশায়। তারপরও তার কান্না আর থামেনা; জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে একনাগাড়ে কেঁদেই চলছে।
হঠাৎ সে দেখতে পেল মহাজনের চামচা একটা থলেতে দু'টো পাথর ভরছে, কিন্তু দু'টোই সাদা!! মেয়েটার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তার মানে সে যেটাই তুলুক সেটাই সাদা হবে! ভয় পেয়ে গিয়ে মেয়েটি যেন সাহসী হয়ে উঠল; মনে মনে ঠিক করল যে সে সবার সামনে ব্যাপারটা সে ফাঁস করে দেবে। কিন্তুঠিক সেসময়ই সে দেখতে পেল আরেক কান্ড - মহাজনের চামচাটা আরেকটা থলেতে একটা সাদা একটা কালো পাথর ভরছে। তারমানে, লোকসমক্ষে যদি মেয়েটি বলেও দেয় যে মহাজন কারচুপি করছে, সেটাও সে প্রমাণ করতে পারবেনা! আসন্ন মহাবিপদের কথা চিন্তা করে মেয়েটির কান্না গেল আরও বেড়ে।
ধরুন, ঠিক এসময়েই আপনাকে পাঠানো হলো মেয়েটাকে রক্ষা করার জন্য, আপনি উপরের তথ্য সবকিছুই জানেন। আপনি কি করবেন? মেয়েটিকে বাঁচান!!!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ২:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



