somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবিকথা 3: জোনাকীরা আর আলো জ্বালিবেনা

০৬ ই জুন, ২০০৬ সকাল ৯:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রায় বছর বিশেক আগের কথা।
আমাদের কলোনীর প্রতিটি কিশোরই তখন বড় হয়ে উঠত ঘুড়ি উড়ানো, লাট্টু ঘুরানো, ডাংগুলি, গুল্লি খেলা, বোম্বাস্টিং এগুলোর মধ্য দিয়ে।
কলোনীর প্রত্যেক বিলডিং- এর সামনেই একটি রাস্তা, আর রাস্তার পাশেই একটুকরো ছোট মাঠ।
বিকেল বেলা আসরের আযান পড়লেই সবগুলো মাঠ একসাথে ভরে উঠত হাজার হাজার কলরবে, যেন হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালা ডাক দিয়েছে।
ছোটবেলায় খুব ঘুড়ি উড়াতাম। বিরাট লম্বা সুতাকে দুটো ল্যাম্পপোস্টের সাহায্যে পেঁচিয়ে দেয়া হতো 'মাঞ্জা'। সাদা সুতা হয়ে যেত হালকা গোলাপী রঙের। সেই সুতা কে তারপর লাটাইয়ে পেঁচিয়ে ঘুড়ি উড়ানো। আমরা বলতাম 'ঘুড্ডি'।
খুব মনে পড়ে যখন কারও ঘুড়ি ছিঁড়ে যেত, সবাই মিলে 'হৈ হৈ' ... 'গেল গেল' ... 'ঐদিকে ঐদিকে' এসব চিৎকার করতে করতে ছুটে যেতাম সেই কাটা ঘুড়ি ধরতে; অলিখিত নিয়ম ছিল - কাটা ঘুড়ি যার হাতে পড়বে তারই হয়ে যাবে।
আরও একটা স্মৃতি আছে, সেটা হলো চিল।
ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে সবচেয়ে ভয় েপেতাম এই চিলকে; হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন উদয় হতো, ঘুড়ির বারোটা বাজিয়ে আবার কোথায় হারিয়ে যেত।

একসময় আস্তে আস্তে সেইসব ঘুড়িতে জড়ানো দিনগুলো হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল চিল নিয়ে ভয়, মাথাব্যাথা সব।

এর কিছুদিন পরের কথা। 1992 অথবা 93 সাল হবে। তখন কলেজে পড়ি। একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, মাও ছিল পাশে। বিকেলবেলায় ছোটছোট ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করছে এদিক ওদিক। কেউ কেউ ঘুড়িও ওড়াচ্ছে।
মাকে বললাম, একটা জিনিস দেখেছেন? ইদানিং আর তেমন চিল দেখা যায়না। আমরা যখন ঘুড়ি উড়াতাম তখন এই চিল কত ঝামেলা করত।
মা বলল, শুনেছি অত্যাচারী রাজার দেশে শকুন থাকেনা, কোথায় যেন চলে যায়! শকুন তো আমাদের দেশ অনেক আগেই ছেড়ে গেছে।
তাই নাকি? আমি আশ্চর্য হয়ে জিগ্গেস করি।
হুমম, মা বলতে থাকে, আমার মনে হয় অত্যাচারের মাত্রা যখন সবকিছু ছাড়িয়ে যায় তখন চিলও সেইদেশ ছেড়ে পালায়।
আমি অবাক হই, দেশছাড়া চিলগুলোর জন্য কেমন মায়া লাগে। আহারে! বেচারারা না জানি এখন কোথায় আছে!

সময় গড়ায়। দেশ ছাড়ি 1996 তে। তবে ভাগ্য ভাল, প্রতি বৎসর দেশে যাই, সবার সাথে দেখা হয়। কিন্তু আর চিল দেখিনা।
সময় আরও এগিয়ে চলে, অথবা পিছিয়ে পড়ে হয়ত। তখন 1999 সাল। বসন্তের ছুটিতে দেশে এসেছি। লম্বা ছুটি - এক মাসেরও বেশী হবে।
ঢাকার একঘেয়ে জীবন যখন আর ভাল লাগলনা, তখন নানীর বাড়ি চলে গেলাম।
অঁজ পাড়াগাঁ হয়ত বলা ঠিক হবেনা, তবে তখনও ইলেকট্রিসিটি আসেনি গ্রামে। গ্রামে সময় খুব ভাল কাটে আমার - মাছ ধরে, হাটের চায়ের দোকানে বসে পেয়ালার পর পেয়ালা চা খেয়ে আর লোকজনের সাথে লম্বালম্বা কথা বলে।
ঢাকা থেকে এসেছি বলে লোকজন কেমন অন্যচোখে দেখে, মনে হয় সমীহ করে। আমার আনন্দ হয়, নিজেকে কেমন যেন খুব বড় বড় লাগে, গ্রামকে ভাল লাগে।
তেমনি একরাতে বাড়ী ফিরছি হাট থেকে। অমাবশ্যার রাত, আকাশে মেঘ। চাঁদের তো থাকার প্রশ্নই নেই, কোন তারাও দেখা যাচ্ছেনা।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমি আলোর অভাব বোধ করি, কারন ভুল করে টর্চ লাইটটা রেখে এসেছি।
হঠাৎ আমার মনে হলো, ইশ এখন যদি অনেক অনেক জোনাকী এসে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত!

জোনাকীর কথা মনে হতে কেন যেন হঠাৎ করেই সেই অনেক আগের চিল-শকুনের কথা মনে পড়ে যায়। ততদিনে আমাদের, অর্থ্যাৎ আমাদের এই হতভাগা এই বাঙালীদের সব পাতিলের ভাত চাটা হয়ে গেছে। অন্ততঃ আমার জেনারেশনের সবার। আমাদের নেতাদের, রাজনীতিকদের আমরা চিনে গেছি।
কাজেই, আমি জানি চিল-শকুনেরা আর আসবেনা।
ঠিক সেই সময়েই এক অজানা ভয় আমাকে পেয়ে বসে, ঠিক মানুষের মনে মাঝেমধ্যে যে কুডাক দেয় অনেকটা সেরকম।
আমি ভেবে বসি, এখন কি তাহলে জোনাকীরাও আর আসবেনা!
ভয়ংকর অস্বস্তি লাগে; রাগে, দুঃখে, কস্টে হাত পা ছুঁড়ে চীৎকার করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা করে।
আমি বুঝতে পারি, আমাকে এখন কাঁদতে হবে; সব কষ্ট, হতাশা, অভিমান সবকিছুকে যাতে এক কান্নাতেই মুক্ত করে দিতে পারি সেরকম এক কান্না করতে হবে।
অন্ধকার অমানিশার রাতে গ্রামের আদরমাখা গন্ধের ধুলিধুসরিত পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি চীৎকার করে কেঁদে উঠি ...

'জোনাকীরা আর আলো জ্বালিবেনা -
বিদ্্রোহ করিতেছে ... '
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০০৭ রাত ২:০৪
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্বাচন ২০২৬

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:০৪

জুলাই বিপ্লবে হাজারো তরুন রাস্তায় নেমেছিল একটা বৈষম্যহীন রাস্ট্র গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। নির্বাচনের দাবীতে কোন মানুষই জুলাইতে রাস্তায় নামেনি। একঝাক তারুন্যের রক্তের বিনিময়ে সবার প্রত্যাশা ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আমায় তুমি বসন্ত দুপুর দিয়ো/বসন্তে ফুল ফুটবেই=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৬

তোমার কি ইচ্ছে হয় না, আমায় দাও একটি =আমায় তুমি বসন্ত দুপুর দিয়ো=
তোমার কি ইচ্ছে হয় না, আমায় দাও একটি বসন্ত দুপুর
ইচ্ছে হয় না আমায় নিয়ে পায়ে বাজাতে পাতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাতিয়ায় শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ায় তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণ করে বিএনপির কুলাঙ্গাররা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১০

এক আওয়ামী ব্লগার আমাকে প্রশ্ন করছে আপনি তো বিএনপি করেন তাহলে জামাতের পক্ষে পোস্ট দেন কেন। উত্তরা এই পোস্টের শিরোনামে আছে। আমার উত্তর হচ্ছে আমি জামাতও করি না।

আমার পরিবার,আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুইশো নয় আসন নিয়েও কেন অন্যদের বাসায় যেতে হচ্ছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:০৯


নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় একধরনের উৎসবের আমেজ ছিল। স্ট্যাটাস, পোস্ট, কমেন্ট—সবখানে একই সুর। বিএনপি দুইশো নয়টা আসন পেয়েছে, জামায়াত মাত্র সাতাত্তর, দেশ এবার ঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাতের নিশ্চিত ভূমিধ্বস পরাজয়ের কারন

লিখেছেন কিরকুট, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪

*** জামাত শিবিরের পচা মস্তিষ্কের কেউ এই পোষ্টে এসে ল্যাদাবেন না***


রাজনীতির ইতিহাসে কিছু পরাজয় থাকে তা কেবল নির্বাচনী ফলাফলের ভেতর সীমাবদ্ধ নয় সেগুলো হয়ে ওঠে নৈতিক রায়।

জামাতের সাম্প্রতিক নিশ্চিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×