আমাদের কলোনীর প্রতিটি কিশোরই তখন বড় হয়ে উঠত ঘুড়ি উড়ানো, লাট্টু ঘুরানো, ডাংগুলি, গুল্লি খেলা, বোম্বাস্টিং এগুলোর মধ্য দিয়ে।
কলোনীর প্রত্যেক বিলডিং- এর সামনেই একটি রাস্তা, আর রাস্তার পাশেই একটুকরো ছোট মাঠ।
বিকেল বেলা আসরের আযান পড়লেই সবগুলো মাঠ একসাথে ভরে উঠত হাজার হাজার কলরবে, যেন হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালা ডাক দিয়েছে।
ছোটবেলায় খুব ঘুড়ি উড়াতাম। বিরাট লম্বা সুতাকে দুটো ল্যাম্পপোস্টের সাহায্যে পেঁচিয়ে দেয়া হতো 'মাঞ্জা'। সাদা সুতা হয়ে যেত হালকা গোলাপী রঙের। সেই সুতা কে তারপর লাটাইয়ে পেঁচিয়ে ঘুড়ি উড়ানো। আমরা বলতাম 'ঘুড্ডি'।
খুব মনে পড়ে যখন কারও ঘুড়ি ছিঁড়ে যেত, সবাই মিলে 'হৈ হৈ' ... 'গেল গেল' ... 'ঐদিকে ঐদিকে' এসব চিৎকার করতে করতে ছুটে যেতাম সেই কাটা ঘুড়ি ধরতে; অলিখিত নিয়ম ছিল - কাটা ঘুড়ি যার হাতে পড়বে তারই হয়ে যাবে।
আরও একটা স্মৃতি আছে, সেটা হলো চিল।
ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে সবচেয়ে ভয় েপেতাম এই চিলকে; হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন উদয় হতো, ঘুড়ির বারোটা বাজিয়ে আবার কোথায় হারিয়ে যেত।
একসময় আস্তে আস্তে সেইসব ঘুড়িতে জড়ানো দিনগুলো হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল চিল নিয়ে ভয়, মাথাব্যাথা সব।
এর কিছুদিন পরের কথা। 1992 অথবা 93 সাল হবে। তখন কলেজে পড়ি। একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, মাও ছিল পাশে। বিকেলবেলায় ছোটছোট ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করছে এদিক ওদিক। কেউ কেউ ঘুড়িও ওড়াচ্ছে।
মাকে বললাম, একটা জিনিস দেখেছেন? ইদানিং আর তেমন চিল দেখা যায়না। আমরা যখন ঘুড়ি উড়াতাম তখন এই চিল কত ঝামেলা করত।
মা বলল, শুনেছি অত্যাচারী রাজার দেশে শকুন থাকেনা, কোথায় যেন চলে যায়! শকুন তো আমাদের দেশ অনেক আগেই ছেড়ে গেছে।
তাই নাকি? আমি আশ্চর্য হয়ে জিগ্গেস করি।
হুমম, মা বলতে থাকে, আমার মনে হয় অত্যাচারের মাত্রা যখন সবকিছু ছাড়িয়ে যায় তখন চিলও সেইদেশ ছেড়ে পালায়।
আমি অবাক হই, দেশছাড়া চিলগুলোর জন্য কেমন মায়া লাগে। আহারে! বেচারারা না জানি এখন কোথায় আছে!
সময় গড়ায়। দেশ ছাড়ি 1996 তে। তবে ভাগ্য ভাল, প্রতি বৎসর দেশে যাই, সবার সাথে দেখা হয়। কিন্তু আর চিল দেখিনা।
সময় আরও এগিয়ে চলে, অথবা পিছিয়ে পড়ে হয়ত। তখন 1999 সাল। বসন্তের ছুটিতে দেশে এসেছি। লম্বা ছুটি - এক মাসেরও বেশী হবে।
ঢাকার একঘেয়ে জীবন যখন আর ভাল লাগলনা, তখন নানীর বাড়ি চলে গেলাম।
অঁজ পাড়াগাঁ হয়ত বলা ঠিক হবেনা, তবে তখনও ইলেকট্রিসিটি আসেনি গ্রামে। গ্রামে সময় খুব ভাল কাটে আমার - মাছ ধরে, হাটের চায়ের দোকানে বসে পেয়ালার পর পেয়ালা চা খেয়ে আর লোকজনের সাথে লম্বালম্বা কথা বলে।
ঢাকা থেকে এসেছি বলে লোকজন কেমন অন্যচোখে দেখে, মনে হয় সমীহ করে। আমার আনন্দ হয়, নিজেকে কেমন যেন খুব বড় বড় লাগে, গ্রামকে ভাল লাগে।
তেমনি একরাতে বাড়ী ফিরছি হাট থেকে। অমাবশ্যার রাত, আকাশে মেঘ। চাঁদের তো থাকার প্রশ্নই নেই, কোন তারাও দেখা যাচ্ছেনা।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমি আলোর অভাব বোধ করি, কারন ভুল করে টর্চ লাইটটা রেখে এসেছি।
হঠাৎ আমার মনে হলো, ইশ এখন যদি অনেক অনেক জোনাকী এসে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত!
জোনাকীর কথা মনে হতে কেন যেন হঠাৎ করেই সেই অনেক আগের চিল-শকুনের কথা মনে পড়ে যায়। ততদিনে আমাদের, অর্থ্যাৎ আমাদের এই হতভাগা এই বাঙালীদের সব পাতিলের ভাত চাটা হয়ে গেছে। অন্ততঃ আমার জেনারেশনের সবার। আমাদের নেতাদের, রাজনীতিকদের আমরা চিনে গেছি।
কাজেই, আমি জানি চিল-শকুনেরা আর আসবেনা।
ঠিক সেই সময়েই এক অজানা ভয় আমাকে পেয়ে বসে, ঠিক মানুষের মনে মাঝেমধ্যে যে কুডাক দেয় অনেকটা সেরকম।
আমি ভেবে বসি, এখন কি তাহলে জোনাকীরাও আর আসবেনা!
ভয়ংকর অস্বস্তি লাগে; রাগে, দুঃখে, কস্টে হাত পা ছুঁড়ে চীৎকার করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা করে।
আমি বুঝতে পারি, আমাকে এখন কাঁদতে হবে; সব কষ্ট, হতাশা, অভিমান সবকিছুকে যাতে এক কান্নাতেই মুক্ত করে দিতে পারি সেরকম এক কান্না করতে হবে।
অন্ধকার অমানিশার রাতে গ্রামের আদরমাখা গন্ধের ধুলিধুসরিত পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি চীৎকার করে কেঁদে উঠি ...
'জোনাকীরা আর আলো জ্বালিবেনা -
বিদ্্রোহ করিতেছে ... '

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

