বাইরে থেকে চোখ ফেরাতে মন চাইছিল না কিছুতেই। ইউক্যালিপটাসের ডালের দিকে চোখ মেলে দিয়ে আমি হারিয়ে যাই আমার স্বপ্নের সবুজ বনে, যেখানে এক ছন্নছাড়া শিল্পী রঙ তুলি নিয়ে আমার প্রতীক্ষা করে।
টেবিলের দিকে তাকাতে ভালো লাগে না। চারদিকে শুধু অর্থনীতির বই। জাগতিক জগৎে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনে। মনে পড়ে যায় কত কিছু করা হয় নি। স্বপ্ন উধাও হয়ে মন জুড়ে বসে নিয়মের জাল। এরকম তো আমি চাইনি।
আব্বার সাথে মাঝেমাঝেই ঝগড়া হয়। আব্বা বুঝতে চায় না। কিন্তু আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তুমি কি হতে চেয়েছিলে আসলে, আমি উত্তর দিতে পারি না। আমার চাওয়াটা বুঝে নেবার জিনিস, বোঝাবার না। বুঝতে না চাইলে তাকে কখনোই বোঝা যায় না। আমার স্বপ্নগুলিকে আমিই হাতড়ে খুঁজে পাই না মাঝে মাঝে, মনের এতই গভীরে লুকিয়ে থাকে তারা। তখন ভুল করে মনে করি আমিও বুঝি সাধারণ, একঘেয়ে..স্বার্থপর...
ফোনটা বেজেই চলেছে, ধরার নামগন্ধ নেই কারো। এ সময়ে আমার ফোন আসে না। আব্বা সাধারণত ফোন করে অফিস থেকে, দুপুরের দিকে। আর ইরা, ইলা বা আম্মা ফোন করতে করতে সাতটা আটটা বেজে যায়। তবুও ফোন আসলেই কেমন অস্থির লাগে। ...
- হ্যালো।
- হাই। সোফির সাথে একটু কথা বলতে পারি প্লিজ।
- একটু ধরেন। দেখি ও আছে কিনা।
সোফির দরজায় কড়া নেড়ে ফিরে এলাম। রান্নাঘরে এন্ড্রু আর বেকি বসে বসে চুমু খাচ্ছে। প্রথম প্রথম এ রকম অবস্থায় খুব অসস্তি লাগতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। ওদের যেহেতু লজ্জা লাগছে না, তাহলে নিশ্চয়ই এটা তেমন লজ্জার ব্যাপার না।
করিডোর থেকে সিমোন আমাকে ডাক দিল।
- কি ব্যাপার মুখটা এমন লম্বা করে রেখেছো কেন?
আমি একটু হেসে বললাম - এমনি। ভাবতে পারো আর দুই সপ্তাহ পরেই পরীক্ষা! আমি কিছুই পড়া শুরু করিনি। তোমার কি অবস্থা?
- এইতো হচ্ছে আস্তেধীরে।..ওঃ জানো, এই উইকেন্ডের বলের জন্য দারুন একটা জামা বানিয়েছি। দেখবে?
আমার যদিও ওর নতুন জামা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছিল না একটুও, তবু মুখের উপর না করে দেয়াটা অভদ্রতা। বললাম
- দেখাও।
ওর ঘরে গিয়ে দেখলাম জামাটা। বেগুনী জর্জেটের লঙ ড্রেস, ব্যাকলেস, লো কাট, কালো এমব্রয়ডারী করা। - বাহ, খুব সুন্দর।
- হঁ্যা, আমি আর মা মিলে বানিয়েছি, অবশ্য ডিজাইনটা খানিকটা ভ্যালেনটিনোর থেকে চুরি করা। তুমি বলে আসছো না?
- নাঃ । টাকা পয়সা নেই।
ডাহা মিথ্যা কথা বললাম। আসলে এইসব ভিড়ের মধ্যে যেতে আমার ভালো লাগে না। কারো সাথেই ঠিক ভাবে মিশতে পারি না। কেমন একলা একলা লাগে।
আব্বার ধারণা এখানে আমার লেখাপড়া খুব ভাল হয়। আসলে কিছুই হয় না। অন্যদিন ও সময়টা সাধারণত সুমনার ঘরে আড্ডা দিয়ে কাটাই। নয়তো ইন্টারনেটে থাকি। সময় কিভাবে চলে যায় বুঝতেও পারি না। আমি যেমন ছিলাম ঠিক তেমনই থেকে যাই। স্বপ্ন বড় মারাত্মক ব্যাপার।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



