বইটি মূলত প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের সাথে লেখক সরদার ফজলুল করিমের বেশ কিছু আলাপচারিতার ক্ষুদ্র সংস্করন। এখানে আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আব্দুর রাজ্জাকের জানা অনেক বিষয়। যেগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তৎকালীন সমাজের দর্পন বা ইতিহাস বললেও ভূল হয় না।
১৯০৫ সালে দেশ শাসনের সুবিধার জন্য ইংরেজ শাসক কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ আবার ১৯১১ সালে তা বাতিল করার পর ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব করা হয়। এসময় মধ্যবিক্ত হিন্দু সমাজের সংকীর্ন চেতনা প্রকাশের বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনকে মুসলমানদের জন্য একটি উপহার হিসেবে উল্লেখ করে চমৎকার রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দেয় তৎকালীন ইংরেজ শাসকরা। পরে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১১০৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৭৮ জন মুসলিম হওয়ার পরেও ভিসি হার্টস বলেন, “ইসলামের ইতিহাস ও ঐত্যিহ্যের অনিয়মই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য”। ধর্মকে সামনে রেখে যে চমৎকার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিল তারা পরবর্তীকালে তা তাদের জন্যই বুমেরাং হয়ে যায়। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কারনে মুসলমান মধ্যবিত্ত ও নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারে উচ্চশিক্ষা এসেছে, (যদিও তা অনেক দেরিতে) তা অনস্বীকার্য। তবে শুধু ধর্মকে পুজি না করে দেশ বিভাগ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন সহ অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মুলভূমিতে পরিণত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের অবসরে যাবার পূর্ব পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের মধ্যে তৎকালীন পূর্ববাংলার অবহেলিত, পশ্চাদপদ মুসলিম, ও আর্থিকভাবে দূর্বল মুসলিম সমাজ ও হিন্দু-মুসলিম বৈষম্য, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য কিছুটা হলেও উঠে এসেছে এখানে। বাংলা ইংরেজী মিশ্রনের আলাপ হুবহু প্রকাশ করায় তা পাঠকের কাছে কিছুটা দুর্বোধ্য। ইতিহাসের প্রাঞ্জল প্রকাশের জন্য লেখক এটিকে “একটি পেট্রের্ট, একটি প্রতিকৃতি” বলে অভিহিত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটিকে নওয়াবদের অবদান, মুসলিম জাগরনে স্যার সৈয়দ আহমদ এর কিংবদন্তী গল্প প্রভূতি বিভিন্ন মিথ্যাকে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আলোচনায় আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বলেন, “এতে নওয়াব পরিবারের আদৌ কোন অবদান ছিলো না”। ইংরেজদের সাথে সহযোগীতার ব্যাপারে বলেন- “১০০% এর উপর যদি কোন কো-অপারেশন থাকে মুসলমানরা তাই দিয়েছে। আসলে স্যার সৈয়দ মারা যাওয়ার পর উই বিগ্যান টু বিল্ড আপ দি মিথ”। আর রামমোহন রায়ের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে বলেছেন তার বাংলা ব্যাকরন রচনা ও বাংলা চর্চাকে। বাঙালী মুসলমানদেরকে বাংলা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য খ্রিষ্টান পাদ্রীদের প্রচেষ্টা ও সুবিধা নিয়ে হিন্দুদের ধর্মত্যাগ প্রভৃতি বিষয়ের মধ্যে মুসলিম সমাজের নির্বোধ ও জাতীয় চেতনাবোধের শক্তিশালী দিকটি আলোচনায় উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দালান কোঠা সহ যাবতীয় নির্মান শৈলীতে সর্বাধিক যে মানুষটির অবদান তাকে আড়াল থেকে সামনে আনা হয়েছে। তিনি হলেন ড. মাহমুদ হোসেন। ইতিহাস বিভাগের এই শিক্ষক ষটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে প্রথম অনুধাবন করেন ১৯২১ সালে স্থপিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী সব বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু দালানকোঠা বৃদ্ধি পায়নি। বিভিন্ন ছড়িয়ে থাকা ইটের দালান দিয়ে সাজানো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছনো তার আদান অনস্বীকার্য। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পর হিন্দু শিক্ষার্থীর আধিক্য ও মুসলমানদের পশ্চাদপদতার মুলে উঠে এসেছে তৎকালীন সময়ে বাংলার মুসলমানদের আর্থিক অসংগতি। হলে থাকা ছেলেদের ব্যাপারেও একই অভিমত পাওয়া যায়। ঢাকার স্থানীয় গরীব মুসলমানদের আন্তরিকতা ও মুসলিম সমাজের আর্থিক উন্নতির সাথে সাথে ক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পায়। ১৯২১ সালে ১১০৫ জনার মধ্যে ১৭৮ থেকে ১৯৪৭-৪৮ সালে ১৬৯৩ জনার মধ্যে ৮৮৫ জন মুসলমান শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যানই একথা প্রমান করে। তবে বিশেষভাবে অনুদান প্রদান করে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করার মতো অবস্থাও তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিলো না। সেটা কলকতা প্রসিডেন্সি কলেজের বাজেটের সাথে তুলনা করে আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট যে অতি নগন্য তা উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর পর প্রথম দিকে বিভিন্ন নামকরা অধ্যাপকদের ইনভাইট করে আনাহয় এবং পরে স্যার অনুতোষকে নিয়ে কমিটি করে মরেম সেন, রমেজ মজুমদার, হর প্রসাদশাস্ত্রী ও এফ রহমানের মতো শিক্ষকদেরকে মেয়াদ ভিত্তিক চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়। এ সময় বেতন অনেক কম ছিল বলে শুধুমাত্র যারা আন্তরিকতা থেকে অধ্যাপনা করতেন তারাই শেষ পর্যন্ত থেকেছেন। এক্ষেত্রে সত্যেনবোস, অমিয়দাশগুপ্ত, আব্দু রাজ্জাক, কাজী মোতাহের হোসেন নাম উল্লেখযোগ্য। দেশ বিভাগের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে টিকিয়ে রাখার পিছনে উপচার্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের অনবদ্য অবদানও তার ব্যাক্তিগত আন্তরিক প্রচেষ্টা ও শ্রমের কথাও আলোচিত হয়েছে। তবে জাতীয় স্বার্থে ভাষা আন্দোলন মূলত হয়েছে ছাত্র সমাজের দূর্দান্ত সাহস ও জাতীয় চেতনার বর্হিপ্রকাশ হিসেবে। এসময় তৎকালীন শিক্ষক সমাজ শুধু প্রত্যক্ষ নয় পরোক্ষভাবেও কোন অবদান রাখেনি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক। এমনকি মুনীর চৌধুরী ও মোযাফফর আহমেদও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন নি। তবে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে কিছু সংখ্যক শিক্ষক সমবেদনা প্রকাশ করে। জাতীয় ঘটনার সাথে সাথে ভিসি ড. ওসমানগনি, ভিসি জেনকিনস, অধ্যাপক নিউম্যান এদের সাথে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের দ্বন্দ্ব, রেজিষ্টার গ্রাজুয়েট নির্বাচন নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কারসাজি ও শ্রম তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন রাজনীতিকেই ইংগিত করে। ১৯৫৫ সালে সংবিধান রচনার প্রস্তাবে বাঙালী নেতাদের রহভবৎরড়ৎরঃু পড়সঢ়ষবী ও জাতিকে অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। তৎকালীন গভর্নর জাকির হোসেনের সাথে অধ্যাপক রাজ্জাকের আলাপচারিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতি বিপ্লবী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার সন্দেহ প্রকাশ পায়। কমিউনিস্ট কিংবা বিপ্লব যাই হোক না কেন ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় ক্রমেই জাতীয় চেতনার ধারক হয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্বকীয়তা ও অধিকারবোধের বীজ ছড়িয়ে দিয়েছে তার জ্বলন্ত প্রমান গভর্নর ও পুলিশের গোপন বাহিনীর প্রধানের ঢাকা সফর ও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে মাথাব্যাথা। তাছাড়াও আঠার শতকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করার পর ঢাকার মুসলিম সমাজে বিপর্যয় নামে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আব্দুর রাজ্জাক মন্তব্য করেছেন। ১৮১৪ সালে ঢাকার বাড়ির সংখ্যা ২১০০ কিন্তু ১৮৩৬ এ তা হলো ১০,০০০। আবার ট্রাক্সের পরিমান ১৮১৪ সালে ছিলো ৩০,০০০ এবং ১৮৩৬ এসে তা হয় ৮০০০। এখানে রাজনীতিক পরিবর্তন পুরনো অবস্থাসম্পন্ন মুসলমান পরিবার গুলোর ধ্বংসপ্রাপ্ত চিত্র ফুটে উঠেছে। সামাজিক আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়ায় ইংরেজী শিক্ষা থেকেও মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে। যার ফলে ঢাকায় হিন্দুরা ভালো অবস্থানে চলে আসে এবং সামগ্রিকভাবে কিছুটা এগিয়ে যায়।
যদিও বইটিতে বৃহৎ পরিসরে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ব্যক্তিগত কর্মকান্ড ও অনুভূতির বর্হিপ্রকাশ ঘটেছে। এরপরও এর মাঝেই তিনি প্রাঞ্জলভাবে যেসব তথ্যনির্ভর ইতিহাস আলোচনা করেছেন অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে তা সকলের জানা উিচত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

