বাংলাদেশে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের নিয়ম আসলে কী? আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে কক্সবাজারে থাকি। সাধারণ জেলা শহরের তুলনায় এখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, কারণ এখানেই অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির — রোহিঙ্গা ক্যাম্প।
প্রায়ই দেখি, সন্ধ্যার পর হুটার বা হুইসেল বাজিয়ে সরকারি গাড়ি চলাচল করছে। প্রশ্ন জাগে — অফিস সময়ের পর ব্যস্ত শহরের রাস্তায় স্যারদের এমন কী জরুরি কাজ থাকতে পারে, যে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির মতো হুইসেল বাজিয়ে চলতে হবে? এমনকি ফাঁকা রাস্তাতেও এই দৃশ্য চোখে পড়ে।
অথচ আইন কিন্তু এ বিষয়ে স্পষ্ট। সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২-এর ৮১ নম্বর বিধি অনুযায়ী কেবল অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপক ও উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত মোটরযান এবং রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে নিয়োজিত অনুরূপ যানবাহন ছাড়া অন্য কোনো মোটরযানে বিভিন্ন সুরের বহুমুখী হর্ন কিংবা তীব্র, কর্কশ, আকস্মিক, বিকট বা ভীতিকর শব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন বা যন্ত্র স্থাপন, পুনঃস্থাপন কিংবা ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক গাড়িতে হুটার লাগানো বা বাজানোর কোনো আইনগত সুযোগই নেই।
বিষয়টা এখন নতুন করে আলোচনায়ও এসেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মূলত গত ২১ জুলাই (২০২৬) একটি মূল বিজ্ঞপ্তি জারি করে হাইড্রোলিক হর্ন, হুটার ও অন্যান্য অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধের নির্দেশনা দিয়েছিল। এরপর সোমবার, ৩ আগস্ট, সংস্থাটি সেই ২১ জুলাইয়ের বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে নতুন করে একটি বার্তার মাধ্যমে জনসাধারণকে ফের সতর্ক করে।
বিআরটিএ জানিয়েছে, এ ধরনের অননুমোদিত হর্ন জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং চালকদের বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করে — যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।
তাহলে বাস্তবতা হলো — যেসব গাড়ি সন্ধ্যার পর, এমনকি ফাঁকা রাস্তায় হুইসেল বাজিয়ে চলে, সেগুলো কোনো ব্যতিক্রমী বিশেষাধিকার প্রয়োগ করছে না; বরং সরাসরি আইন ও সাম্প্রতিক বিআরটিএ নির্দেশনা লঙ্ঘন করছে।
আর এই একই হুইসেল যখন তরুণে বোঝাই একটি গাড়িতে বেজে বেজে সৈকত এলাকায় ঘুরে বেড়ায়, তখন প্রশ্নটা আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। ধরে নিলাম তারা হয়তো কোনো সরকারি কর্মকর্তার পরিবারের সদস্য — কিন্তু আইনে তো পরিবারের সদস্যদের জন্যও কোনো ছাড় নেই; বিধি ৮১ অনুযায়ী এই সংকেত-ব্যবস্থা শুধু নির্দিষ্ট জরুরি সেবার জন্যই বরাদ্দ। সারা দেশ থেকে আসা পর্যটকদের সামনে সৈকত এলাকায় এ ধরনের "শো-অফ" শুধু দৃষ্টিকটুই নয়, স্পষ্ট আইনভঙ্গও বটে।
এমনিতেই সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কমতি নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ একটি জিনিস যখন প্রকাশ্যে, নির্বিঘ্নে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, তখন সেই ক্ষোভ আরও বাড়ে বৈ কমে না। প্রশ্ন হলো — ২১ জুলাইয়ের নির্দেশনা এবং ৩ আগস্টের পুনরাবৃত্ত সতর্কবার্তা সত্ত্বেও এই চর্চা কেন থামছে না, আর স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে বাস্তবে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




