জান্নাত বাইরে উঁকি দিয়ে দেখল, বিশাল একটা মাছ ওজন করা হচ্ছে। মাছটাকে ঘিরে বেশ লোক জমেছে। সে পান্থকে দেখতে পেল। তার বাবা- শওকত সাহেব ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আর ব্যস্ত ভঙ্গিতে কি কি যেন বলছে।
হঠাৎ সে শুনতে পেল, ‘মেয়েরা কই? ওদেরকে ডাকো। এদিকে মজার একটা ঘটনা ঘটছে আর ওরা কিছু টেরই পাচ্ছে না, এটা কেমন কথা?’
শুনতে পেয়ে জান্নাত চট করে ভেতরে ঢুকে গেল। তার হৃৎপিন্ড হালকা লাফাচ্ছে।
পান্থ দরজার কাছে এসে থেমে দাঁড়াল। ডাকল, ‘জান্নাত ,এই জান্নাত।’
একটু ইতস্তত করে ঘরে ঢুকল সে। ঢুকেই জান্নাতকে দেখতে পেল।
‘তোমরা দুই বোন কি বলো তো? বাইরে এত সাংঘাতিক একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে আর তোমরা ঘরে বসে রয়েছো?
জান্নাত কিছু একটা বলতে নিয়েও বলতে পারল না। ব্যাপারটা সে আগেও লক্ষ করেছে। পান্থ ভাইয়া সামনে এস দাঁড়ালেই তার কেমন-কেমন যেন লাগে। স্বাভাবিক একটা কথা বলতেও বিব্রত বোধ করে।
সে কোনমতে বলল, ‘বাইরে কি হচ্ছে?’
পান্থ দ্রুত বলল, ‘তোমরা তো দেখি কিছুই জানো না। ব্রেকিং নিউজ। চিতল মাছ ধরা পড়েছে। রাজ-চিতল।’
জান্নাত অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। মানুষটা কত সহজ ভঙ্গিতেই না কথা বলছে! সে কেন পারে না?
‘কারেন্টলি মাছটাকে ওজন করা হচ্ছে। দেখবে এসো। তোমার আপুকে ডাকো।’
‘আপু দেখবে না।’
‘দেখবে না কেন?’
‘আপুর এসব ভাল লাগে না।’
‘তাহলে চলো, তোমাকেই দেখাই।’
তারা যখন কাছাকাছি গেল, ওজন করা শেষ হয়ে গেছে। ইদরিস সাহেব হাসি-হাসি মুখে বললেন, ‘আন্দাজ মোটামুটি ঠিকই ছিল। রেঞ্জের মাঝামাঝি পড়েছে।’
শওকত সাহেব জান্নাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মাছটা দেখেছিস? বড় না?’
‘হুঁ।’
‘শাহানা কোথায়?’
‘ঘরে।’
‘ঘরে কি করে?’
‘কিছু না।’
‘ডেকে নিয়ে আয়, যা।’
‘আসবে না।’
‘আসবে না কেন?’
‘এসব ভাল লাগে না আপুর।’
‘অবশ্যই ভাল লাগবে।’
পান্থ বলল, ‘ডেকে নিয়ে আসো। দেখে যাক একবার। এইরকম মাছ তো আর প্রতিদিন দেখা যায় না।’
জান্নাত কিছু বলল না।
পান্থ কিছুক্ষণ পর বলল, ‘আচ্ছা, মাছটার ওজন কত হতে পারে বলো তো?’
সে বলল, ‘জানি না।’
‘গেস্ করো। দেখি তোমার প্রেডিকশন কেমন।’
জান্নাক একমুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, ‘বিশ কেজি?’
‘উঁহু। হয় নি। তেত্রিশ। তেত্রিশ সের। তোমার প্রেডিকশন তো দেখা যাচ্ছে মোটেও ভাল না। হা হা হা।’
পান্থ শব্দ করে হাসতে লাগল ।
***
আরিফ ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঠিক কিভাবে কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল নিজেও তা বুঝতে পারে নি। সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। জায়গাটা কোথায় তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
‘বাসটা কোন পর্যন্ত যাবে?’
প্রশ্নটা করল সে তার পাশে বসা ভদ্রলোককে। ভদ্রলোক সাথে অনেক বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে এসেছেন। দুই একটা বোঁচকা সিটের নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে রাখতে হয়েছে এবং তিনি সহজে পা রাখতে পারছেন না।
‘কিছু বললে?’
‘এই বাসটা কোন পর্যন্ত যাবে?’
‘যাবে তো তারাকান্দি পর্যন্ত। তুমি তো ভুয়াপুরে নেমে যাবে, ঠিক না?’
আরিফ কিছুটা বিরক্ত হল। সে কোথায় যাবে সেটা তার ব্যাপার। লোকটার কি? তারাকান্দি কি বেশি দূর? সেখানে নেমে ব্যাক করলে কেমন হয়? নতুন কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে। অচেনা কোথাও, যেখানে সে আগে যায় নি।
তার পকেটে রাখা সেলফোন বেজে উঠল। সে চট করে পাশের
ভদ্রলোককে বলল, ‘আমরা এখন কই?’
‘করোটিয়া ক্রস করছি। ভুয়াপুর খুব একটা দূরে না।’
বাসটা মৃদু একটা ঝাঁকি খেল। চশমাটা পড়ে যাচ্ছিল। আরিফ চশমাটা ঠিকমত সেটা করল। ভুয়াপুরের খবর কে জানতে চেয়েছে?
সে কলটা রিসিভ করল,‘হ্যালো, বাবা।’
‘হ্যালো, আরিফ?’
‘বলো।’
‘পৌঁছেছো?’
‘বাবা, বলেছি তো নেমে কল করব।’
‘এখন কোথায়?’
‘করোটিয়া।’
‘ভুয়াপুরে নেমে কিন্তু কল করবে।’
‘আচ্ছা।’
‘ফোন করেছিলাম আরেকবার- ধরো নি কেন?’
‘ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম; খেয়াল করি নি।’
‘বামপাশ দিয়ে যান... সোজা।’
‘কিছু বললে?’
‘না, না। তোমাকে না। তুমি ঠিকঠাক আছো তো?’
‘ঠিকই আছি। তুমি তখন ফোন করেছিলে কেন?’
‘এমনি...’
হাইসাহেব আরও কিছু হয়তো বলতে যাচ্ছিলেন আরিফ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাবা, এমনি-এমনি ঘনঘন ফোন করবে না।’
‘কেন? বিরক্ত লাগে?’
আরিফ একটা মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, ‘হ্যাঁ, বাবা।’
কয়েক মুহূর্তের জন্য ওপাশ থেকে কোন কথা শোনা গেল না। লাইনটা কি কেটে গেল?
‘হ্যালো, বাবা?’
‘হ্যাঁলো... হ্যাঁ, আচ্ছা। আর এমনি এমনি বিরক্ত করব না।’
আরিফ কি বলবে তা বুঝতে পারল না। এভাবে কথাটা বলা মনে হয় উচিত হয় নি।
‘আচ্ছা, এখন রাখি।’
সে লাইন কেটে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। বিকেল হয়ে গেছে। বাইরে চমৎকার সব দৃশ্য। বিকেলের আলোটা এত ভাল লাগছে!
পাশে বসে থাকা ভদ্রলোক দাঁত দিয়ে একটা আখ ছোলার চেষ্টা করছেন। এতক্ষণ তো আখ দেখা যাচ্ছিল না।
‘ছেলে, তুমি আখ খাবে?’
‘জ্বি না।’
‘একটা খাও। দাঁত শক্ত হবে। দাঁত শক্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে।’
‘আপনি খান। দাঁত শক্ত করুন।’
‘তুমি তো ভুয়াপুর নামবে, তাই না?’
আরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘জ্বি।’
কিছুক্ষণ পর সে কি মনে করে বলল, ‘ব্যাগটা আমার সাইডে রাখুন। আপনার পা রাখতে কষ্ট হচ্ছে।’
ভদ্রলোক কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন।
‘তুমি তো খেলে না। আখটা কিন্তু মিষ্টি ছিল।’
(চলবে...................................................)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




