সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে টাকার বিনিময়ে সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় দেখতে চায় বাংলাদেশ। এ জন্য অন্য পদ্ধতির পাশাপাশি আয়োজন করেছে এসএমএসের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ভোটদান কার্যক্রম। সুন্দরবনপ্রেমীদের পাঠানো প্রতি এসএমএস থেকে (চার্জ ২ টাকা) ৬৮ পয়সা নিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের আয়োজক প্রতিষ্ঠান নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। অথচ বিষয়টির প্রচারণা এমনভাবে চালানো হচ্ছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের ধারণা নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের দরদি আয়োজনে সুন্দরবন স্থান করে নেবে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের তালিকায়। ব্যাপক খোঁজখবর করে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের মানুষকে বিভিন্নভাবে আহ্বান জানানো হচ্ছে সুন্দরবনের পক্ষে এসএমএস করতে কিন্তু কোথাও একবারের জন্যও বলা হয়নি নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের টাকা নেওয়ার বিষয়টি। অন্যদিকে এসএমএস ভোটিংয়ের প্রচারণায় প্রায় আড়ালে চলে গেছে ওয়েবসাইট ও টেলিফোনের মাধ্যমে ভোটদান কার্যক্রম।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এটা নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের বড় ধরনের ব্যবসা ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা ওদের পাতা সেই ব্যবসায়িক ফাঁদে পা দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি। তিনি জানান, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভোট দিলে ওদের কোনও লাভ হয় না। টেলিফোনের মাধ্যমে ভোট দিলে ‘ওয়াই’ ক্যারিয়ারের (সংশ্লিষ্ট দেশে ফোন লাইন প্রবেশের গেটওয়ে) কাছ থেকে ওরা সামান্য কিছু পেত। টেলিফোনের মাধ্যমে ভোট দেওয়া গেলেও খরচ বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ ওতে তেমন আগ্রহী হয়নি। এ কারণে ওরা এসএমএস পদ্ধতিকে লুফে নিয়েছে। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে বলেন, আমাদের দেশ থেকেই অতি উৎসাহীরা এসএমএস পদ্ধতি চালুর জন্য ওদের কাছে প্রস্তাব করেছে। তার জানা মতে, আর কোনও দেশে এ পদ্ধতি চালু হয়নি বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, দেশের মানুষের আবেগকে পুঁজি করে এসএমএস নিয়ে বড় ধরনের একটা ‘গেম বাণিজ্য’ হচ্ছে যা সাধারণ মানুষ জানতেও পারছে না। এসএমএস ভোটিং উপলক্ষে গত ১৪ জুন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসির) সম্মেলন কক্ষে টেলিটক ও নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের মধ্যে ১টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিমতে আগামী ১০ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত ভোটদান কার্যক্রম চলবে। সাংবাদিকদের জানানো হয় টেলিটক এসএমএসের মাধ্যমে ভোটদান প্রক্রিয়ার গেটওয়ে হিসেবে কাজ করবে। অনুষ্ঠানে চুক্তির শর্তাবলী বা রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে কোনও তথ্য সাংবাদিকদের জানানো হয়নি।
চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব সুনীল কান্তি বোস, বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ, নিউওপেন ওয়ার্ল্ড করপোরেশনের (নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন) পরিচালক জন পল।
জানা গেছে, গেটওয়ে অপারেটর হিসেবে টেলিটক, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিআরসি এবং অপারেটরগুলো যৌক্তিকভাবে এসএমএস ক্যাম্পেইন থেকে অর্জিত রাজস্ব ভাগাভাগি করবে। কিন্তু নিউ ওপেন ওয়ার্ল্ড করপোরেশন এ ক্যাম্পেইন থেকে কোনও টাকা নেবে কিনা সে বিষয়টি একদম চেপে যাওয়া হয়। তবে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশই এসএমএস পদ্ধতি চালুর জন্য নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের কাছে আবেদন করে।
গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান টেলিটকের ব্যবস্থাপক ও ভাস এবং করপোরেট বিভাগের প্রধান মো. শামসুজ্জোহা বিষয়টি সম্পর্কে বলেন, আমরা কেবল গেটওয়ে হিসেবে কাজ করছি। চুক্তির বিষয়টি জানে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। তবে টেলিটক গেটওয়ে হিসেবে রাজস্বের একটা অংশ পাবে বলে তিনি জানান।
বিষয়টি সম্পর্কে উপ-প্রধান বন সংরক্ষক শেখ মিজানুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আমাদের চুক্তিই ছিল, সমঝোতা চুক্তির কোনও তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখির কারণে ওদের সঙ্গে আমাদের ঝামেলা হলেও এখন মিটমাট হয়ে গেছে। রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে অনেক টাকা খরচ হয়। সেই খরচের টাকা তারা বিভিন্নভাবে আয় করে থাকে। তিনি এ প্রতিবেদককে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, যেভাবেই হোক না কেন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে সুন্দরবনকে আনা গেলে তাতে দেশেরই লাভ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসএমএস ভোটিং চালুর আগে নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের বাণিজ্যিক বিভাগের কর্মকর্তা জোয়ানা ট্রবের সঙ্গে একাধিকবার ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন টেলিটকের ব্যবস্থাপক ও ভাস এবং করপোরেট বিভাগের প্রধান মো. শামসুজ্জোহা ও উপ-প্রধান বন সংরক্ষক শেখ মিজানুর রহমান। ওইসব মেইলে জোয়ানা ট্রবকে বিভিন্নভাবে এ ক্যাম্পেইন চালুর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এসএমএস ভোটিং ক্যাম্পেইনকে ‘মেগা ইভেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ ইভেন্টে কমপক্ষে ৮০ মিলিয়ন (৮ কোটি) এসএমএস পড়বে। এমনকি ওই মেইলে রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে প্রতি এসএমএসে ২০ পয়সা দিতে চাইলেও রাজি হয়নি নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। শেষপর্যন্ত ৬৮ পয়সায় চুক্তি পাকাপাকি হয়।
View this link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


