লিখতে শুরম্ন করার সময় আমি ভেবেছিলাম, শুধু গল্পই লিখবো। কল্পনাশক্তির ওপর দাড়ানো লেখক হতে পারাটাই আমার কাছে মহত্তম ব্যাপার বলে গণ্য হতো। কিন্তু প্রথম কয়েকটি বইয়ের পর আমি দেখলাম, আমার মাথায় যে উপকরণগুলো আছে, পরিপ্রেক্ষিত থেকে যে উপকরণগুলো আমার কাছে এসেছে সেগুলো আমার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
আমার এ আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল উনিশ শতকের মহৎ ইওরোপিয়ান উপন্যাস সম্পর্কে আমার জ্ঞান থেকে অথবা সেগুলো সম্পর্কে আমার যে জ্ঞান আছে বলে আমি ভাবতাম সেখান থেকে। আমি সাবধানে কাজ করতাম কারণ সত্যি কথা বলতে, লেখা শুরু করার আগে আমি খুব বেশি পড়াশোনা করিনি। এখন আমি দেখি, যে বিষয়গুলো আমার ভেতরে অনুভূত হয়েছিল বলে মনে হয় সেগুলো কখনো আইডিয়া হিসেবে কাজ করেনি। ভাবিনি, আমি যে সমাজে নিজে খুজে পেয়েছি তার চেয়ে বেশি বিভক্ত, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সুসজ্জিত ও দোষাক্রানত সমাজ থেকে সেগুলো তৈরি হয়েছে। আমিও একটি পরিপূর্ণ ও নিয়মবদ্ধ সমাজ থেকে এসেছি এ পূর্বভাবনা লেখার কাজকে সহজতর করে দিতে পারে। যে নিয়মবদ্ধতার কথা আমি বলছি, তা সরল অর্থে নিয়মবদ্ধতাই, ঘেরাটোপের মধ্যকার অবস্থান যা টেলিভিশন সিচুয়েশন কমেডির মতোই আলম্ব। এ ঘেরাটোপের পৃথিবীর নীতি অল্প ও সহজবোধ্য। বাইরের বিশৃঙ্খল পৃথিবী ভেতরে ঢুকে এর যাদু উন্মোচিত করতে পারে না। আমি সেভাবেই হয়তো লিখতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারিনি। হতে পারে লেখক হিসেবে আমি যা দেখেছি তাকে অস্বীকার করার জন্যই এটা করেছি।
আমাকে নিজের পৃথিবীর প্রতি বিশ্বসত্দ হতে হবে। এটা অনেক বেশি তরল। উনিশ শতকের আদলে এটাকে তুলে আনা বা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা কঠিন। আমার নিজের বা আমার পরিবারের কিংবা আমার পরিপ্রেক্ষিতের সম্পর্কে যে কোনো সাধারণ কথাকেও বিশেষ ভঙ্গি পেতে হবে।
1932 সালে আটলান্টিকের অপর তীরের বৃটিশ কলোনি তৃনিদাদে আমার জন্ম। এটা ছিল ভেনিজুয়েলা ও দক্ষিণ আমেরিকার ছেড়া অংশ। খুব ছোট একটা দ্বীপ। আমার জন্মের সময় ছিল জরম্নরিভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। পরে ভেনিজুয়েলার মতো এখানেও তেল পাওয়া যায়, উন্নতিও ঘটতে থাকে। এখানে ছিল মিশ্র জাতিসত্তার এক লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ যার মধ্যকার পাচ লাখ এশিয়ান ইনডিয়ান কমিউনিটির। এরা নিজেদের ধর্ম, শিক্ষা, টাকা, বর্ণের প্রেক্ষাপট নিয়ে অন্যদের থেকে আলাদা থাকতো।
দেশটির জন্য আমার বিশেষ কোনো ভালোবাসা ছিল না। এর ঔপনিবেশিক ক্ষুদ্রত্বের প্রতি আমার কোনো টান ছিল না। আমি নিজেকে পৃথিবীর পুরনো সভ্যতাগুলোর হাল ভেঙে দিশা হারানো নাবিক হিসেবেই দেখেছি। ভেবেছি, যতো দ্রম্নত সম্ভব বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে যোগ দেবো। 18 বছর বয়সে 1950 সালে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তি আমাকে দেশত্যাগের সুযোগ দিল। আমি ইংল্যান্ডে পড়তে গেলাম, সঙ্গে থাকলো লেখক হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ফিরে যাওয়ার কোনো চিনতাই আমার ভেতর কাজ করেনি।
ফলে লেখক হিসেবে আমি ছিলাম উল্লম্ফন ও অপূর্ণ অভিজ্ঞতায় ভরা। বেজোড় অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। 1880 থেকে 1900 সাল পর্যনত্দ ইনডিয়া থেকে নিউ ওয়ার্ল্ডে আসা লোকদের সাংস্কৃতিক অবশেষ আর তারপর নিউ ওয়ার্ল্ড থেকে 1950-এ ইওরোপে আসার অভিজ্ঞতা কোনো সম্পূর্ণতা তৈরি করে না। শেকড় সংশিস্নষ্ট সমাজের স্থিরতা মতো আর কিছুই নেই যা উনিশ শতকের মতো মহৎ উপন্যাসগুলোর জন্ম দিতে পারে। যাতে একটি প্রকৃত সমাজ চিত্রায়িত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে যে কোনো কল্পকথা বা টলস্টয়ের যে কোনো অনুগল্পের উলেস্নখ করা যেতে পারে। আর শিগগিরই আমি নিজেকে খুজে পেলাম দ্বীপ থেকে বয়ে আনা বিশৃঙ্খল উপকরণগুলোর প্রানতে।
কিন্তু লেখাই ছিল আমার জীবিকা, কখনো আমি লেখক ছাড়া অন্য কিছু হওয়ার কথা ভাবিনি। লেখক হিসেবে আমার চর্চা নির্ভর করেছে মানুষের সঙ্গে ও ন্যারেটিভের সঙ্গে আমার বন্ধনের ওপর। আর এখন ক্রমবর্ধমানভাবে সেই পৃথিবীর সঙ্গে যাতে যোগ দিতে চাই আমি। এ বন্ধন ক্রমান্বয়ে ইতিহাসের নানা স্রোতকে অনুধাবনের একটি আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে। যে স্রোত তৈরি করেছে তারল্য, যার একটি আমি নিজেকেও খুজে পেয়েছি। লেখক হিসেবে বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া আমার জন্য ভীষণ জরম্নরি ছিল। আমি জানতাম না কিভাবে এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। আমার সামনে কোনো অনুসরণীয় উদাহরণ ছিল না।
ফিকশনের চর্চা আমাকে সাহায্য করতে পারেনি। মহৎ জ্ঞানের ভেতর ও বাইরে ফিকশনই সেরা কাজ। বৃহত্তর পৃথিবীতে আমি ছিলাম এক বহিরাগত। আমি খুব বেশি জানতাম না, কখনো খুব বেশি জানবোও না। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তার পর আমি দেখলাম_ এ পৃথিবীর সঙ্গে সোজাসাপ্টা পদ্ধতিতে লেনদেন করতে হবে আমাকে। ফিকশন লেখক হিসেবে আমার অনুশীলনের বাইরে যেতে হবে আমাকে। আমার অভিজ্ঞতার খতিয়ান রাখার স্বার্থে ও একে যথাসম্ভব সত্যবাদিতার সঙ্গে উপস্থাপন করতে অস্ত্রগুলোকে শানিত করতে হবে। ফলে আমার লেখায় একটা বিভাজন চলে এলো। মুক্ত বিন্যাসের ফিকশন ও বিবেকি নন-ফিকশন, যার একটি আরেকটিকে সমর্থন ও সমৃদ্ধ করছে। আমার পৃথিবী আয়ত্ত করার এটাই ছিল সচেতন উদ্যোগ। কল্পনা প্রতিভার লেখক হওয়ার মহৎ ইচ্ছার মাধ্যমে শুরম্ন করলেও এদের একটিকে আরেকটির ওপর স্থান দিই না আমি।
এ নতুন প্রক্রিয়ায় কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই আমাকে পিতৃপুরুষের ভূমি ইনডিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হলো। এখানে আমি ঘরের লোক ছিলাম না। যদিও অনেক মাসের ভ্রমণের পর নিজেকে বহিরাগতও ভাবতে পারছিলাম না। ইনডিয়া ও ইনডিয়ার ধারণা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছিল। আমি বরাবরই ইনডিয়া প্রসঙ্গে দ্বিধান্বিত ছিলাম, এ ব্যাপারে চূড়ানত্দ কথা বলা আমার জন্য কঠিন ছিল। ইনডিয়া নিয়ে লেখা তিনটি বইয়ে এসব কথাই আমি বলেছি। এগুলো যেভাবে লিখিত হওয়ার কথা সেভাবেই হয়েছে, এগুলো নন-ফিকশন। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো ব্যক্তিগত, গভীরভাবে অনুভূত যা ফিকশনের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। ইনডিয়া : এ মিলিয়ন মিউটিনিজ ছিল তৃতীয় বই। প্রথম বইটার 26 বছর পর এটা লিখিত হয়েছিল। সেই সরল ও সর্বাগ্র প্রশ্নটি অনুধাবন করতে এটা লেখককে সব সময় ব্যক্তিগত আবিষ্কার, বেদনা ও বিশেস্নষণের দিকে নিয়ে গেছে যা ইনডিয়ার সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয়। যার ভেতর দিকে যেতে যেতে তাকে অনুভব করতে হয়। বাইরে থেকে যাকে দেখা যায় না, সেই মানুষ।
এ বইটি ছিল আরো দূরবর্তী এক আইডিয়ার প্রতি উৎসর্গীকৃত। সরলতম উপায়ে এ চলমান বৃহৎ দেশটির সর্বত্র নারী ও পুরম্নষরা তাদের বাপ-দাদার চাহিদা ও সীমিত পথের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তাদের চাহিদা আরো বেশি কিছু। চারদিকে গেরিলা যুদ্ধ চলছে এটা বোঝানোর জন্য নয় বরং এই ছিল বইয়ের নামে মিলিয়ন মিউটিনিজ কথার তাৎপর্য। প্রায় প্রত্যেক ইংলিশ ভাষ্যকারের 1857 সালের ইনডিয়ান বিদ্রোহ বিষয়ে কিছু ধারণা আছে। তখন বৃটিশ ইস্ট ইনডিয়া কম্পানির কিছু সেনা বিভ্রানত্দি ও বিক্ষোভ থেকে বিদ্রোহ করেছিল। তাদের সামনে এমন কোনো ধারণা ছিল না যে, তারা শেষ পর্যনত বৃটিশদের বিরম্নদ্ধেই বিদ্রোহ করে বসেছে। আমার বইয়ের লক্ষ বিদ্রোহ বলছে, এখন যা ঘটছে তা অধিকতর সত্য এবং অধিকতর সাধারণ পদ্ধতিতে এগোচ্ছে।
এখন এ 2007 সালে ইনডিয়ান বুমের স্বীকৃতির সময় এটা অনেক বেশি সহজবোধ্য। 1988 সালে আমি যখন বইটি শুরম্ন করেছিলাম তখন এটা আরো অন্যরকম ছিল। ইনডিয়া ছিল ধর্মীয় গান্ধীবাদী আধো অন্ধকারে নিমজ্জিত। আত্মমুগ্ধ ও সুখী এ রকম আধো অন্ধকার ইনডিয়াকে প্রায়ই নিমগ্ন করেছে। শহরগুলোর আড্ডা আলোচনায় বক্তারা বলতো, পরম্পরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা। আগের কালের মূল্যবোধ থেকে পতনের কথা। রাজনীতি হয়ে পড়ছিল দুর্বৃত্তায়িত, দুর্নীতি ছিল সর্ববিসত্দারি। মূল্যবোধের ধারণা দেশ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট বা বাসত্দব জ্ঞানের ভিত্তিতে নির্ধারিত ছিল না, কিন্তু এটা সুড়ঙ্গ খুড়ে চলছিল। এটাই ছিল সেই প্রেক্ষাপট যার বিরম্নদ্ধে আমি আমার বিদ্রোহের আইডিয়াকে ব্যবহার করেছিলাম।
আইডিয়া আমি বাতাস থেকে পাইনি। বিগত 26 বছরে আমি ইনডিয়ায় বহু কষ্টসাধ্য ভ্রমণ করেছি। একজন লেখক হিসেবে, একজন মুক্ত মানুষ হিসেবে দেশটি সম্পর্কে আমি অনেক বেশি যথাযথ জ্ঞান অর্জন করেছি যা পরিবার ও চাকরির সঙ্গে জড়িত অধিকাংশ ইনডিয়ানের পক্ষে অসম্ভব। বড় শহর থেকে দূরের জেলাগুলোতে আমি অনেক সপ্তাহ কাটিয়েছি। ইনডিয়ান বন্ধু ও কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় আমি এক দুই সপ্তাহ অনেক জায়গায় ঢুকতে সমর্থ হয়েছি যেখানে জীবন অনেক রুক্ষ। এমনকি নিষিদ্ধ সীমানত্দ এলাকায়ও গিয়েছি। ছোট শহরের জীবন নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা জমেছে। কিন্তু তার সব কিছু লিখিনি। ফলে আমার অভিজ্ঞতা সত্দূপীকৃত হয়েছে। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরো বড় একটি বই লিখতে পারি। যা থাকবে মানুষে পরিপূর্ণ। থাকবে ইনডিয়ান দৃশ্যপট, যা ধারণ করবে বা ব্যাখ্যা করবে আগামী 20-30 বছরের ইনডিয়াকে। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান যথাযথভাবে আগামীকে নির্মাণ করে এবং তার কথাই বলে। এ কথাই আমি ইংলিশ প্রকাশকদের বলেছি। তারা আইডিয়াটা পছন্দ করেছেন। আক্ষরিকভাবে 10 মিনিটের মাথায় এটা কিনতে রাজি হয়েছেন। এর প্রায় পরপরই আমি নিজেকে আবিষ্কার করি বম্বের তাজমহল হোটেলে। নিজের আকাঙ্ক্ষাকে সাজিয়ে চলেছি। নিশ্চিত হতে পারছিলাম না কিভাবে এ বিপুলা শহরটিতে মানবিক অনুধাবনের মধ্যে আনা সম্ভব। বাইরে তখন এক অকল্পনীয় সান্ধ্য জটলা। ম্রিয়মাণ আরব সাগরের প্রেক্ষাপটে ইনডিয়ার গেটওয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর অবশ্যই এ শহরের বাইরে আছে এক দেশ, এখন আমার স্মৃতি আমাকে সজাগ করে দিচ্ছে সূর্যস্নাত অসংখ্য রাসত্দা আর রেলপথের সেই ভ্রমণ।
ওই গ্ল্যামারাস হোটেলে চারটি শূন্যসার ও ভয়ঙ্কর দিন কাটিয়েছি আমি। তখন আত্মচেতন অনর্থ প্রকাশ অযোগ্য জার্নাল ছাড়া আর কিছুই লিখতে পারিনি। আমি জার্নাল পদ্ধতি পছন্দ করি না। এটা দৃষ্টিসীমাকে অন্ধকার করে দেয়। আমি পছন্দ করি দূরত্ব ও স্মৃতির স্থানানত্দর। এখন মনে ইবসেনের তুলনাটাই আসছে, যিনি এখনো নাট্যকারের চাইতে অধিক কবি। মনে আসছে তিনি 1869 সালে সুয়েজ খালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার সফর বিষয়ে জার্নাল লেখার সংগ্রাম করে চলেছেন। কেউ ভাবতে পারেন স্মৃতিময় দিন আর মোহময় দৃশ্য জার্নালের জন্য যথার্থ। কিন্তু এটাই খুব সম্ভবত ইবসেনকে কানত্দ করে তুলেছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন এগুলো বহিরঙ্গের বিষয়। আর তৎক্ষণাত ক্ষানতি দিয়েছিলেন। এ রকমই একটা পথে আমি ভেঙে পড়েছিলাম একগুয়ে জার্নাল লেখা ছেড়ে চারদিকে চোখ মেলেছিলাম নতুন কোনো একটা প্রস্থান বিন্দুর খোজে।
হোটেলের লবিতে একটা বড় বোর্ডে ইন হোটেলে নিজস্ব গণকের করা রাশিফল টাঙানো হতো। আমি সেগুলো পড়ার জন্য প্রলুব্ধ হতাম। ভাবতাম, সেখানে যদি বই বিষয়ে কোনো কিছু থাকে! কিন্তু রাশিফল দেখতে হলো না। উদ্বেগের মধ্যে কেউ ভাবনার বাইরের অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। বইটি শুরম্ন হলো। 'বম্বে ইজ এ ক্রাউড' প্রথম এ লাইনটি দিয়ে শুরু হলো। তারপর অবিরাম গতিতে চলতে থাকলো।
আইডিয়া বিমূর্ত। মানুষ আর বর্ণনা দিয়ে যখন এগুলোকে মোড়ানো হয় তখনই তারা বইয়ে পরিণত হয়। পাঠক যখন বইয়ে প্রবেশ করে, প্রথম পাতার ভেতর দিয়ে যায় নিজেকে দ্বৈত ন্যারেটিভের মধ্যে খুজে পায়। যে লোকটির সঙ্গে আমাদের মাত্র পরিচয় হলো তার তাৎক্ষণিক ন্যারেটিভ ও এর বাইরের বৃহত্তর ন্যারেটিভ যার সঙ্গে বইয়ের পরীক্ষিত অংশগুলো গিয়ে জোড়া লাগবে। কোনো কিছু এলোমেলোভাবে করা যায় না। কোনো লেখার প্রত্যাশা না থাকলেও সিরিয়াস ট্রাভেল একটি শিল্প। আর এ বইয়ের বিশেষ শিল্প হলো, অনেক মানুষের মধ্যকার সেই একজন যার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, যিনি সবচেয়ে যৌক্তিক উপায়ে আমার কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কোথাও কোনো তদবির করতে হয়নি।
ভূমিকার জন্য আমাকে স্থানীয় লোকজনের ওপর নির্ভর করতে হতো। আমি কি খুজছি তা বোঝানো সব সময় সহজ হতো না। সাংবাদিকদের কাজের সঙ্গে পরিচিত অনেক লোক মনে করতো, আমি নানা সূত্রের জন্য একজন ভাষ্যকার খুজছি। প্রকৃতপক্ষে আমি আরো গভীর ও অর্থবহ কোনো কিছু সন্ধানে ছিলাম। বের করতে চাচ্ছিলাম একজনের জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা যা কিছু প্রসঙ্গের ওপর আলো ফেলবে, নতুন দিকে মোড় ঘোরাবে। নতুন চিনত্দা, রাজনীতি ও নতুন আইডিয়া ব্যবসার সঙ্গে পুরনো দেশটির অবিরাম সংঘর্ষের কথা বলবে। ফলে এ বইয়ে এক ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে আরেক ধরনের অভিজ্ঞতার জন্ম হয়। একটি থিম থেকে আরেকটি থিম জন্মায়।
অংশত আমার ভাগ্য জড়িত ছিল এ সিদ্ধানত্দের পেছনে। কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই একদিন বম্বের তাজমহল হোটেলে ইনডিয়ান ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অশুভ হলেও দেশটি ঘুরতে শুরম্ন করেছিলাম ঘড়ির কাটার উল্টো দিক অনুসরণ করে। উত্তর থেকে দিলিস্ন ও কলকাতা এবং পাঞ্জাব গেলে আমি হয়তো খুব দ্রম্নত বইয়ের মশলা সংগ্রহ করতে পারতাম। দেশের বাকি অংশটা থাকতো ঝুলনত্দ, যার সঙ্গে অ্যান্টি কাইমেক্সের তুলনা চলে। কিন্তু আমি প্রথমে দক্ষিণে গেলাম। এর মাধ্যমে আমি বিশুদ্ধ পথে কিছু গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম। যেমন ইনডিয়ান বিজ্ঞানের উন্মেষে বর্ণের ভূমিকা, খুব স্বল্পজ্ঞাত ও শতবর্ষব্যাপী দক্ষিণের বর্ণযুদ্ধ, ব্রাহ্মণদের বেদখল। বলা যেতে পারে, এটা হলো উত্তরের বিশৃঙ্খলা দেখার জন্য পাঠক ও লেখকের জন্য এক ধরনের প্রস্তুতি : কলকাতা, লক্ষ্নৌ, দিলি্লতে বৃটিশ প্রভাব গত শতকের ইতিহাস। বর্তমানের এক সতর নিচেই অবস্থান করছে।
আমাকে অনেক সময়ই ভ্রমণ করতে করতে যথাস্থানে নোট নেয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলেছেন কেউ কেউ। আমি কখনোই টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করিনি। ব্যবহার করেছি শুধু কাগজ আর কলম। আমার সামনের ব্যক্তিটি কাজে আসবে কি না তা বোঝা পর্যনত্দ আমি সূচনামূলক সাধারণ কথাবার্তা চালিয়ে যেতাম। নোটবুক দেখিয়ে কাউকে ভীত করতে চাইতাম না। যদি মনে হতো, আমার দরকারি কোনো কথা তিনি বলছেন, তবে তাকে বলতাম আমি পরে এ শোনা কথাগুলো লিখে রাখতে চাই। পরে আমি তাকে কথাটা আবার ব
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




